বাংলাদেশের বিগ থ্রি

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নতির গ্রাফ উর্ধ্বমুখী বেশ ক’বছর ধরেই। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে এলেই লেজেগোবরে পাকিয়ে যাচ্ছিলো এই যা। শেষ দু’বছরে এ উন্নতির ছাপ প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে টেস্ট ক্রিকেটেও। এ সময়ে বাংলাদেশ যে খুব বেশি টেস্টম্যাচ খেলেছে তাও কিন্তু নয়। গত দুবছরে বাংলাদেশ খেলেছে আটটি টেস্ট, চলমান চট্টগ্রাম টেস্টসহ নয়টি। এরমধ্যে জিতেছে তিনটি, যেখানে বাংলাদেশ টেস্ট জয়ই সাকুল্যে ১০ টি, জিম্বাবুয়ে আর খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জেতা সাতটি টেস্ট বাদে বাকি তিনটি টেস্ট জয় এসেছে এসময়ে।

হঠাৎ এই পালাবদলের হাওয়া কেন? এটাই কি আমাদের সোনালি প্রজন্ম? প্রত্যেকটা দলই এমন একটা সময় পার করে যখন সমবয়সী একদল অভিজ্ঞ, প্রতিভাবান, একে অপরের সাথে ভালো বোঝাপড়া আছে এমন খেলোয়াড়দের একটা ব্যাচ পেয়ে যায়। পুস্কাস, হিদেকুতি, ককসিসদের নিয়ে গড়া হাঙ্গেরির ম্যাজিক ম্যাগিয়ার্স, ’৮২ বিশ্বকাপে জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওদের ব্রাজিল, ‘০৮-’১২ পর্যন্ত গার্দিওলার সর্বজয়ী বার্সা, ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যানের ইনভিন্সিবল অজি, ক্যালিপসো কিংস, স্টিভ ওয়াহর আনটাচেবলস, শচীন-শেবাগ-সৌরভ-দ্রাবিড়-লক্ষ্মনদের নিয়ে গড়া ভারতের ফ্যাবিওলাস ফাইভ ছিলো এমন কিছু দল। এদের সবাই হয়তো বিশ্বজয়ী হতে পারেনি, কিন্তু একটা বড় সময় ধরে তারা এমন কিছু করেছেন যার কল্পনাই কেবল করতে পারতো বাকি দলগুলো। এবং অতি গুরুত্বপুর্নভাবে, দলটা কিছু তারকা খেলোয়াড়ের পারফরমেন্সের উপরে নির্ভর করতো।

 

তো, বাংলাদেশের এ তিন টেস্ট জয়ে তারকা কে ছিলেন?

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টিনেজার মেহেদি হাসান মিরাজ ১২ উইকেট নিয়েছিলেন। একে একপাশে রাখলে, এ জয়ের সিংহভাগ কৃতিত্ব দিতে হবে সাকিব, তামিম, মুশফিককে। দুই ইনিংসে ১৪৪ রান রান করেন তামিম, আর সাকিব করেন ৪১, দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের বাকি রাখা ৮ উইকেটের মধ্যে নেন ৫ উইকেট।

শ্রীলঙ্কা টেস্টে তামিম করেন ৪৯ আর ৮২। সাকিব করেন ১১৬ এবং দুই ইনিংস মিলিয়ে শিকার করেন ৬ উইকেট। আর মুশফিক প্রথম ইনিংসে করেন ৫২ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ২২ রানের একটি ছোট্ট অথচ মহাগুরুত্বপুর্ণ ইনিংস খেলেন যা বাংলাদেশের তরীকে জয়ের বন্দরে পৌছে দিয়েছিলো।

এরপর অজিদের বিপক্ষে তামিম করেন ৭১ ও ৭৮। সাকিবের ব্যাট থেকে আসে প্রথম ইনিংসে ৮৪ আর বল হাতে ১০ উইকেট। আর দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকের ব্যাট থেকে আসে গুরুত্বপূর্ণ ৪১ রান।

মমিনুল, সাব্বির, মোসাদ্দেক, তাইজুল, মিরাজের নাম আসতে পারে কিন্তু দিনশেষে আমরা সাকিব, তামিম, মুশফিক ত্রয়ীর কাছেই মুখাপেক্ষী।

গত আট টেস্ট আর তাদের পুরো ক্যারিয়ারের পার্ফরমেন্সের পরিসংখ্যান দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় ব্যাপারটা।

তামিম তার ক্যারিয়ারে ৪০.২৭ গড়ে ৮ সেঞ্চুরি আর ২৪ টা হাফ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৩৮২৬ রান আর গত আট টেস্টে ৪৪.২৫ গড়ে ১ সেঞ্চুরি আর ৬টা হাফ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৭০৫ রান। সাকিবের ক্যারিয়ার গড়৪১, সেঞ্চুরি ৫ আর হাফ সেঞ্চুরি ২২ টি মোট রান ৩৫৬৮। সেখানে গত আট টেস্টে তার গড় বেড়ে হয়েছে ৪৭ ছুঁই ছুঁই, সেঞ্চুরি ২টি আর হাফ সেঞ্চুরি ৩ টি। বলে রাখা ভালো সাকিবের ক্যারিয়ার সেরা ২১৭ রানের ইনিংসটিও এসেছে এ সময়ে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ক্যাপ্টেন মুশফিকের গড়ে।তার ক্যারিয়ার গড় যেখানে ৩৬ সেখানে গত আট টেস্টে তা বেড়ে হয়েছে ৫৬ এর একটু উপরে। এসময়ে তিনি ২টি সেঞ্চুরি আর ২ টি হাফ সেঞ্চুরি বাগিয়েছেন।

সাকিবের বোলিং আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এসময়ে। পুরো ক্যারিয়ারে ৩২ গড়ে ১৮৬ উইকেট নিয়েছেন তিনি, যেখানে গত আট টেস্টে ২৭ গড়ে নিয়েছেন ৩৯ উইকেট। তার পুরো ক্যারিয়ারে ম্যাচে দশ উইকেট নিয়েছেন দুইবার, যার মধ্যে একটি এই সময়ে করা।

এ পরিসংখ্যান দেখে একটা কথা বলা যায়, ঘরের মাঠে ধীরে ধীরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে বাংলাদেশ, বড় পরিসরের ক্রিকেটেও। বিদেশে হয়তো খুব বেশি জিতবে না তবে আমরা দেখতে পাবো লড়াকু এক বাংলাদেশকে। এবং এতে গুরুদায়িত্ব পালন করবেন আমাদের এই ‘বিগ থ্রি’। তারা ভালো করলেই দল ভালো করবে, যদি ব্যর্থ হন তাহলে দলও ভুগবে বেশ ভালোভাবেই।

এদের অবসরের পরের বাংলাদেশের দৃশ্যটা একটু চিন্তা করা যাক। যখনই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম মেনে সোনালী প্রজন্মটা বিদায় নেয় তখন উড়তে থাকা দলটার অবস্থা হয় তথৈবচ। বিশ্বমানের কিছু খেলোয়াড়ের একটা ব্যাচ যখন বিদায় নেয় তখন সে শুন্যস্থান পূরণ যে চাট্টিখানি কথা নয়!

জিততে ভুলে যাওয়া, চাপে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে যাওয়া, দলে একটা ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

তামিমের বয়স এখন ২৮ বছর, মুশফিকের ২৯, সাকিবের ৩০, মাহমুদুল্লাহর বয়স ৩১। যদিও গত কদিন ধরে মাহমুদুল্লাহ টেস্ট দলের বলয় থেকে খানিকটা দূরে, তারপরও শর্টার ভার্সনে তিনিই আমাদের বিপদের বন্ধু। বাংলাদেশ খুব সম্ভবত আর ৭-৮ বছরের মতো সার্ভিস পাবে তাদের থেকে। এরপরেই বাজবে বিদায় ঘন্টা। বাংলাদেশ মুখোমুখি হবে মুদ্রার উল্টোপিঠের। বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা প্রায়ই দলের পাইপলাইন, একাডেমী, জুনিয়র ক্রিকেট সিস্টেমের গভীরতা নিয়ে গর্ব করে কথা বলেন। এ সময়টা হবে এসবের জন্য এসিড টেস্ট।

এরও বেশ আগে, আগামী দুয়েক বছরই বলে দেবে দলের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি ভাবা সাব্বির, মমিনুল, সৌম্যরা কি সত্যিই লম্বা রেসের ঘোড়া কিনা। লিটন দাসের উচিত ভালো পারফর্ম করে দলে উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের জায়গা পোক্ত করা। দলের পেস ব্যাটারির কাণ্ডারি হয়ে উঠার সুবর্ণ সুযোগ তাসকিনের সামনে, তার কাঁধে গুরুদায়িত্ব থাকবে এ কথাটা বুঝানোর যে, বাংলাদেশ বোলিং এটাক নিছকই স্পিনসর্বস্ব বোলিং এটাক নয়। দুই প্রডিজি, মুস্তাফিজ আর মিরাজেরও উচিত নিজেদের খেলাটাকে আরো শাণিত করা যাতে করে সিনিয়রদের উপর থেকে চাপটা কিছুটা হলেও হালকা হয়।

বাংলাদেশের এ পরিবর্তনকে কেবলই সাকিব তামিম মুশফিকের অবদান বলা হলে মিরাজ-মুস্তাফিজের কৃতিত্বকে ছোট করে দেখা হয়। টেস্টে মিরাজ আর ওয়ানডেতে মুস্তাফিজ বাংলাদেশের এ বদলে যাওয়ার অন্যতম কারিগর। যখন থেকে বাংলাদেশের পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে তখন থেকে একবার পারফর্মেন্সে চোখ বোলালেই সত্যটা চোখের সামনে চলে আসে।

বিশ্ব ক্রিকেটের অবস্থা খুব ভালো অবস্থানে নেই এখন, কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটের এখন একাদশে বৃহস্পতি।

 

এর পেছনে কোচিং স্টাফদের কথা না বলেই নয়। চণ্ডিকা হাথুরুসিংহে, কোর্টনী ওয়ালশ, থিলান সামারাভীরা, সুনীল জোশী, রিচার্ড হ্যালসলরা দলকে ঠিক পথে চালানোর নেপথ্যে আছেন।

সাকিব যখন সিরিজ শুরুর আগে ২-০ এর কথা বললেন টা স্মিথকে খানিকটা বিস্মিতই করেছিলো। তিনি কারণ হিসেবে ৯ শতাংশ জয়ের হারকে দাঁড় করান। সাকিব তার ভবিষ্যতবাণীকে অর্ধেক সত্য করতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছেন প্রথম টেস্টে, পুরোটা সত্য করতে গেলেও বাংলাদেশ তারই পারফর্মেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল আর ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিতে খেলা থেকে শুরু ধরে ঘরে-বাইরে বাংলাদেশের বদলে যাওয়াকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং দেবেন সাকিব-তামিম-মুশফিকই। যাবার সময়ে ব্যাটনটা ভবিষ্যৎ রাং রানার, স্প্রিন্টার, ম্যারাথনারদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে যেতে হবে। উত্তরাধিকারীদের যোগ্যতা কিংবা অযোগ্যতাই ঠিক করে দেবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভাগ্য।

__________

Succession plan key for continued Bangladesh success শিরোনামে উইজডেন ইন্ডিয়ায় লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। লিখেছেন শাম্য দাশগুপ্ত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।