বাংলাদেশের অাক্ষেপ, বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর

২০০৩ সাল। পাকিস্তানের সাথে টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। সেই ঐতিহাসিক মুলতান টেস্ট। অলক কাপালির একটা ক্যাচ ডাইভ দিয়ে ধরতে গিয়ে মাটিতে ফেলে দিলেন পাকিস্তানের অধিনায়ক উইকেটরক্ষক রশিদ লতিফ। তবে আম্পায়ারের দিকে পেছন ফিরে থাকায় কৌশলে মাটি থেকে বল তুলে আউটের আপিল করেন। আম্পায়ার টিভি রিপ্লের সাহায্য ছাড়াই আউট দিয়ে দিলেন।

ধারাভাষ্য কক্ষে প্রতিবাদ করে উঠলেন আতহার। বললেন এটা অবিচার হলো বাংলাদেশের সাথে। অন্য ধারাভাষ্যকর রমিজ রাজা বললেন, ‘টিপিক্যাল বাংলাদেশি কমেন্ট’। এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে আতহার বললেন ‘টিপিক্যাল পাকিস্তানি অ্যান্সার’। এই একটা মন্তব্য করে তিনি ঝড় তুলে ফেলেছিলেন মিডিয়াতে। রিপ্লে দেখার পর ম্যাচ রেফারির সিদ্ধান্তে রশিদ নিষিদ্ধ হয় পাঁচ ম্যাচের জন্য।

আতহার আলী খানকে তখন থেকেই ভালো করে চেনা আমার। এরপর তিনি বাংলাদেশের নির্বাচক হলেন। তখন বাংলাদেশ দলের অবস্থা ভালো না। কমেন্ট্রি বক্সে সবাই টিপ্পনী কাটে, সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে। নির্বাচক হওয়ায় আরো বেশি খোচা খেতে হয় তাকে। তিনি ধৈর্য্য নিয়ে উত্তর দিতেন। বলতেন আমাদের নতুন নতুন প্লেয়ার তৈরী হচ্ছে, আশার বাণী শোনাতেন।

সময় পাল্টেছে এখন, বাংলাদেশের সব বড় বড় জয়ের সাক্ষী তিনি। মনে পড়ে কার্ডিফে গিলেস্পিকে আফতাব ছয় মারার পর আতহারের সেই কন্ঠ, ‘হোয়াট অ্যা শট! দ্যাট টুক অস্ট্রেলিয়া ….আউট অব দিস গেম।’ প্রতিটা জয়ের আগে আগে কমেন্ট্রি বক্সে তার উচ্ছসিত কন্ঠ না শুনলে জয়ের মজাটাই পাইনা যেন! নিউজিল্যান্ড প্রথমবার হোয়াইটওয়াশ হবার পর আতহার প্রথম বলেছিলেন ‘বাংলাওয়াশ’। সেটা এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়া পর্যন্ত ব্যবহার করে।

খেলোয়াড় জীবনে আতহার ছিলেন অন্যতম সুদর্শন ক্রিকেটার। সেই সময়ে ‘ক্রাশ’ খাওয়ার প্রচলন থাকলে বহু তরুণীর ‘ক্রাশ’ হতেন আতহার। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার আতহার প্রথম নজরে আসেন ১৯৮৪ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসনের ছাত্র ছিলেন। খেলতেন ঢাবির ক্রিকেট দলে। সেই সময় মানে পেশাদার লীগ শুরুর আগে ঢাবি নিয়মিত জাতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগীতায় অংশ নিত। সেমি ফাইনালে তরিকুজ্জামান মুনির (৩০৮) এবং আতহার (১৫৫) মিলে রেকর্ড ৪৪৭ রানের জুটি গড়েন ঢাকা জেলার বিপক্ষে। এরপরেই আতহার জাতীয় দলে সুযোগ পান।

১৯৮৬, ১৯৯৪ এবং ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে খেলেছেন তিনি। ১৯৮৮ সালে উইলস এশিয়া কাপে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান করেন। তার ওয়ানডে অভিষেক তখনই, ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রামে। ১৯৯০ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ৫০ হাজার দর্শকের সামনে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ৭৮ করেন তিনটা বিশাল ছক্কার সাহায্য। বাংলাদেশ হারলেও ম্যাচ সেরা হন আতহার।

বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি হতে পারতো আতহারের। ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৮২ রানে বিতর্কিত স্ট্যাম্পিং এর সিদ্ধান্তে আউট হয়ে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়। রিপ্লেতে দেখা যায় লাইনের উপর পা থাকলেও তাকে থার্ড আম্পায়ার আউট ঘোষনা করেন। সেই সময় ‘অন দ্য লাইন’ ব্যাটসম্যানদের পক্ষে ছিলো।

ক্যারিয়ারের শুরুতে পাঁচ নম্বরে ব্যাটিং এবং মিডিয়াম পেসার ছিলেন। পরে বাংলাদেশের তৎকালীন কোচ ভারতের মহিন্দর অমরনাথের পরামর্শে ওপেন করা শুরু করেন। উচ্চতার সুবিধা নিয়ে ডাউন দ্যা উইকেটে গিয়ে বিগ হিট নেয়া শুরু করেন তৎকালীন ১৫ ওভারের ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশনের ফায়দা নিতে।

১৯৯৭ সালে ভারতের হায়াদ্রাবাদে কেনিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ জেতে, সেই ম্যাচে ওপেনিং জুটিতে মোহাম্মদ রফিক এবং আতহার আলি খান বিধ্বংসী ব্যাটিং শুরু করে। ১৩৭ রানের ওপেনিং জুটিতে রফিক ৭৭ এবং আতহার ৪৭ রান করেন। ১৯৯৭ সালে সেই ইতিহাস বদলে দেয়া আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের হয়ে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৭০ রান করেন আতহার।

১৯৮৮ সালে সাউথ ইস্ট এশিয়া কাপে হংকংকে হারিয়ে ফাইনালে শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। ফাইনালে আতহার দলীয় সর্বোচ্চ ৬৪ রান করেন। এর আগে গ্রুপ পর্বে সিঙ্গাপুরের সাথে ৬৯* এবং হংকং এর সাথে ৯২ রান করেন।

১৯৯৪ সালে ঢাকায় সার্ক ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপে চান্দিকা হাতুরুসিংহের শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলকে হারায় বাংলাদেশ। আতহার সেই ম্যাচে ৫২ রান করেন।

 

শুরুর মতো শেষ ম্যাচটাও ভারতের বিপক্ষে। ১৯৯৭ সালে মোহালিতে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচেই ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেন আতহার আলী খান। ১০ ওভারে ৩৩ রানে ২ উইকেট নেন। উইকেট দুটি ছিলো সৌরভ গাঙ্গুলী এবং রাহুল দ্রাবিড়ের।

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে যখন ঘরোয়া চার দিনের ম্যাচ শুরু হয় (তখনো প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায়নি ম্যাচগুলা) আতহারের ক্যারিয়ার তখন শেষ প্রায়। এজন্য মাত্র ৩ টি প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ খেলেছেন ক্যারিয়ারে।

বাংলাদেশের হয়ে ১৯ টি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন আতহার। প্রায় ৩০ গড়ে ৫৩২ রান এবং ৬ টি উইকেট নিয়েছেন। ওই আমলে এই পরিসংখ্যান কোনো মুখের কথা নয়। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তাঁর না খেলাটা বড় এক বিস্ময়। আতহার ও মিনহাজুল আবেদিন নান্নু – দু’জনকে দলে ফেরানোর জন্যই ওই সময় গণমাধ্যমে অনেক লেখালিখি হয়। নান্নু ফিরেছিলেন, ফেরা হয়নি আতহারের!

অনেকে মনে করেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার উপর আতহার আলী খানের প্রভাব আছে। দুইজনই পেস বোলিং অলরাউন্ডার ছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে মাশরাফির ব্যাটিং আতহারের মতো ছিলো। উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে বিগ হিট খেলা।

বর্তমানে আতহার আলী খান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একমাত্র প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশী ধারাভাষ্যকর। কমেন্ট্রি বক্সে বাংলাদেশের হয়ে কথা বলা একজন নিঃসঙ্গ যোদ্ধা। ব্যাট ছাড়ার পর যেন মাইক্রোফোন হাতে এখনো নট আউট! এছাড়া বাংলাদেশে ‘রিবুক’-এর অরিজিনাল শো রুমের কর্ণধার তিনি। আতহার আলী খানের শখের ভেতর আছে সানগ্লাস এবং টাই (গলাবন্ধনী) সংগ্রহ করা। বিভিন্ন ম্যাচে তিনি ভিন্ন ভিন্ন টাই পরে কমেন্ট্রি করেন।

১৯৬২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন কমেন্ট্রি বক্সে বাংলাদেশের ‘লোন স্টার’ আমাদের আতহার আলী খান।

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব আতহারের জন্য জন্মদিনে শ্রদ্ধা এবং শুভকামনা জানাই। মাইক্রোফোন হাতে আরো অনেক বছর বাংলাদেশের হয়ে লড়ে যাবেন তিনি এই আশাকরি। কখনো খেলা না দেখা ক্রিকেটারদের ভেতর আতহার আলী খানের অনেক বড় একজন ফ্যান আমি।

স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপের ফাইনাল জিতবে আর কমেন্ট্রি বক্সে থাকবেন প্রিয় আতহার আলি খান।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।