বাংলাদেশিদের ‘ইউনিক’ সমস্যা

আমি ঠিক করেছি ভিক্ষা করবো।

এমন না হঠাৎ করে ঠিক করেছি। অনেক দিন ধরেই মনে হচ্ছে ভিক্ষা করলে মন্দ হয় না।

ইউরোপে এরা যাদেরকে ভিক্ষুক বলে- এরা সাধারণত রাস্তায় দাঁড়িয়ে হয়ত পিয়ানো বাজায়, গিটার বাজায়, কিংবা বাঁশি বাজিয়ে নিজদের সামনে একটা বক্স খুলে রাখে, যেখানে মানুষজন খুশি হয়ে পয়সা দিয়ে যায়। এরা সাধারণত সরাসরি হাত পাতে না!

অনেকে আবার নানান সং সেজে মানুষ জনকে খুশি করার চেষ্টা করে। এটাও এদের হিসেব অনুযায়ী এক অর্থে ভিক্ষা করার মতোই।

আমার আসলে অনেক দিনের ইচ্ছে- আমি পৃথিবীর নানান শহর ঘুরে বেড়াবো, আর এদের মতো করে ভিক্ষা করে ঘুরার খরচ তুলে ফেলব। সমস্যা হচ্ছে- আমি এদের মতো যে কোন একটা কিছুতে ভালো না!

আপনি যদি রাস্তায় গান গেয়ে ভিক্ষা করতে চান, তাহলে তো গানটা অন্তত ভালো জানতে হবে। আপনি যদি পিয়ানো বাজিয়ে ভিক্ষা করতে চান, তাহলে সেটা তো ভালো বাজাতে হবে কিংবা ধরুন আপনি সং সেজে অভিনয় করে যদি ভিক্ষা করতে চান, সেটাও মোটামুটি ভালো জানতে হবে; নইলে তো কেউ আপনাকে ভিক্ষা দিবে না।

আমার সমস্যা হচ্ছে- আমি খেয়াল করে দেখেছি, আমি আসলে কোন কিছুই খুব একটা ভালো জানি না!

এখানেই আমাদের সমস্যা। ইউরোপ-আমেরিকায় একটা ছেলে যখন স্কুলে পড়াশুনা করা শুরু করে, তারা জানে তারা কি করতে চায়, তাদের কি ভালো লাগে, কোন বিষয়ে তারা এক্সপার্ট কিংবা স্পেশালিষ্ট হতে চায়। আপনারা আবার ভেবে বসেন না, এইসব ভিক্ষুকরা পড়াশুনা জানে না। গিয়ে দেখা যাবে সবাই স্কুল পাশ করেছে। এমন কি অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ও পাশ করেছে!

এরা সবাই স্কুল পাশ করার পর ইউনিভার্সিটিতে যেতে চায় না। অনেকেই যার যার ইচ্ছে অনুযায়ী পেশা বেছে নেয়, আবার অনেকে নিজেদের ইচ্ছে অনুযায়ী যা ভালো লাগে সেই বিষয়টা নিয়ে লেগে থাকে। যার কারনে দেখা যায় এদের সবাই কোন না কোন একটা বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখে, ভালো জানে, ভালো করতে পারে।

এই সব সমাজে ডিভিশন অব লেবারের ব্যাপারটা খুব প্রবল। অর্থাৎ যার যে কাজ, সেই কাজে সে পুরোপুরি এক্সপার্ট। আপনি যদি মোবাইল মেকানিক হন, তাহলে এই বিষয়ে আপনি আসলে সব কিছুই কম বেশি জানেন। সে হয়ত অন্য আর কোন বিষয়ে কিছুই জানে না। আবার আপনি যদি গবেষক হন, তাহলে আপনি হয়ত গবেষণার বিষয়ে অনেক কিছুই জানেন, কিন্তু অন্য সব বিষয়ে কিছুই হয়ত জানেন না। তেমনি যেই ছেলেটা ভিক্ষা করছে পিয়ানো বাজিয়ে, সে নিশ্চিত ভাবে চমৎকার পিয়ানো বাজাতে পারে।

আমাদের বাংলাদেশিদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের জগতের সকল বিষয় নিয়ে আগ্রহ। বাংলাদেশি কোন নায়িকা বিদেশি ব্র্যান্ড ছাড়া কিছু পড়ে না সেটা যেমন মনের আনন্দে জানার চেষ্টা করি, তেমনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকায় বসে নারীদের ভোগের বস্তু ছাড়া কিছু ভাবে না, সেটাও আমরা জানি। আবার বিরাট কোহলি কবে বিয়ে করছে, কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কবে কোন দিন কাকে কত হাজার ডলার দান করে দিয়েছে সেই খবরও আমরা রাখি।

অথচ এতো সব কিছুর খবর না রেখে কোন একটা বিষয়ের উপর যদি নজর রাখা যায়, তাহলে হয়ত সেই বিষয়টা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যেত। কিংবা যেই মানুষ গুলর নাম বললাম, তাদের যদি সঠিক বিষয় গুলো জানা যেত, তাও চলত। যেমন ওই নায়িকা কেমন অভিনয় করে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাবনা গুলো কি, বিরাট কোহলির খেলার ধরন কেমন কিংবা রোনালদোই বা কতটা ভালো খেলছে ইদানিং। এইসবের খবর না রেখে আমরা মনের আনন্দে উল্টো যেসব খবর না রাখলেো চলবে সেই বিষয়ে ক্রমাগত জ্ঞান অর্জন করতে থাকি!

যার কারণে আমরা কোন কিছুতেই শেষ পর্যন্ত এক্সপার্ট হতে পারি না!

না আমরা স্কুল- কলেজ থেকে তেমন কিছু শিখতে পারি; না পারি পড়ালেখার বাইরে সমাজ জীবনে আশপাশ থেকে কিছু শিখতে। আমার ধারনা এটা আমাদের বাংলাদেশিদের ইউনিক সমস্যা!

এই যেমন আমি আবিষ্কার করেছি, আমার আসলে এখানে ভিক্ষা করার যোগ্যতা টুকুও নেই! এই নিয়ে মহা চিন্তায় আছি আপাতত। তবে ঠিক করেছি ভিক্ষা করার একটা উপায় বের করবো। উপায়টা আর কিছুই না- কোন একটা বিষয়ে এক্সপার্ট হতে হবে। যেটা অতি অবশ্যই স্কুল থেকেই সবার মাথায় থাকা উচিত এবং সেভাবে নিজেকে গড়ে তোলা উচিত।

স্কুল গুলো কেবল পড়াশোনা শেখায় কেন, আমি বুঝতে পারি না। পড়াশুনা বাইরের ব্যাপার গুলোও তো স্কুল থেকে জেনে বুঝে আসার কথা। তাও যদি পড়াশুনাটা ঠিক ভাবে শেখাত! সেটাও তো শেখায় না। বিদেশে এসে বুঝা যায় আমাদের শিক্ষার মান কেমন! তো একাডেমিক পড়াশোনা যখন শেখাতে পারছেনই না, অন্তত এক্সট্রা কারিকুলা তো কিছু শেখাবেন? সেটাও আপনারা সেখান না!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।