বলিউডের প্রথম সুপার হিরোইন

দুই অসুর বধের উদ্দেশ্যে দেবতা ব্রহ্মার নির্দেশে বিশ্বকর্মা ত্রিভুবনের সমস্ত উত্তম জিনিস থেকে তিল তিল করে সব সৌন্দর্য আহরণপূর্বক এক অপ্সরার সৃষ্টি করেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন ‘তিলোত্তমা’। ভারতবর্ষেও তেমনি এক তিলোত্তমার আবির্ভাব ঘটেছিল, না কাউকে বধ করার জন্য নয়, আপামর দর্শকদের হৃদয় হরণ করার জন্য।

এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তাঁর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন নি,হয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সৌন্দর্যের প্রতীক।তিনি কখনো আবির্ভূত হয়েছেন স্নিগ্ধ ‘নেহালতা’ হয়ে, আবার কখনো তেজী ‘রজনী’ হয়ে, শ্বেতশুভ্র ‘চাঁদনী’ হয়ে নিজেকে বিমূর্ত করেছিলেন। তিনি ভারতীয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে বানিজ্য লক্ষ্মী হিসেবে খ্যাত প্রথম নারী সুপারস্টার ‘শ্রীদেবী’।

মাত্র চার বছর বয়সেই তামিল ছবি ‘থুনাইভান’ এ অভিনয় করেন। এরপর বহু দক্ষিণী ছবিতে তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করে বেশ আলোচিত হন, খেতাব পান ‘বেবি ডল’। এরপর দক্ষিণী ছবিতে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করে বাজিমাৎ করেন, দক্ষিনী ছবির ইন্ডাস্ট্রিগুলিতে হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় নায়িকা, সেখানে তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবি মিনদাম কোকিলা, মুনদ্রাম পিলাই, মুমপাত্তা, গায়ত্রী, গুরু, প্রিয়া, গোবিন্দ গোবিন্দ।

সত্তর দশকের শেষে বলিউডে অভিষেক জনপ্রিয় ছবি ‘জুলি’ তে শিশুশিল্পী রুপে। এরপর ‘সোলভা সাওয়ান’ দিয়ে প্রথম নায়িকা রুপে আবির্ভূত হন তিনি। আশির দশকে ‘হিম্মতওয়ালা’ দিয়ে শুরু হয় ক্যারিয়ারের জয়যাত্রা, ‘সাদমা’ তাকে এনে দিয়েছিল তাকে ভিন্নমাত্রা। এর পরের এক দশক তিনি কাটান সুবর্ণ সময়।

দর্শকদের উপহার দেন ইনকিলাব, মাস্টারজী, তোহফা, মাকসুদ, জাগ উঠা ইনসান, নাগিনা, মি.ইন্ডিয়া, চালবাজ, চাঁদনীর মত বাণিজ্যিক সফল ছবি, তারকাবহুল ছবি ‘কর্মা’ ও ‘জাঁবাজ’ এও নিজেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আশির দশকে যে ধারার ছবি প্রচলিত ছিল সেখানেও নিজের অতুলনীয় রুপ আর অভিনয়ের দক্ষতায় নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বলিউডে এর আগে বহু নায়িকাই ভীষন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তবে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন বলেই পেয়েছিলেন প্রথম নারী সুপারস্টারের খেতাব।

নব্বই দশকে শ্রীদেবী ছিলেন আরো বিচক্ষণ। ‘লামহে’ ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে নিজেকে করেছেন মোহনীয়, খুদা গাওয়ার আফগান নারী,গুমরাহ পর লাডলার অহংকারী মেয়ে জুদাই এ উচ্চাকাঙ্ক্ষী গৃহবধূ,একের পর এক বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয়ে সমৃদ্ধ করে গেছেন। নব্বইয়ের শেষে তিনি সিনেমা থেকে অনিয়মিত হয়ে পড়েন, এক যুগের ও বেশি সময় বিরতি দিয়ে সফল প্রত্যাবর্তন করেছিলেন ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ ছবিতে। এরপর সম্প্রতি ছবি মুক্তি পেয়েছে ‘মম’ ছবিতে, এটা তাঁর ৩০০ তম ছবি। মাঝে অবশ্য দক্ষিনী ছবি ‘পুলি’ তে খল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

ভারতবর্ষের মধ্যে শুধু তিনিই পাঁচটি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে জনপ্রিয় হয়েছিলেন, তাই আজো কোনো দক্ষিনী নায়িকার বলিউডে অভিষেক ঘটলে স্মরণ করা হয় তাকে। সাধারণ পরিবারের মেয়ে থেকে উচ্চবিত্ত কন্যা, মারদাঙ্গা, কমেডি, ভালোবাসায় পূর্ণ সব চরিত্রেই তিনি নিজেকে ফুটিয়ে তুলেছেন,সম্ভবত দ্বৈত চরিত্রেই উনিই সবচেয়ে বেশি সফল। শুধু রুপ, অভিনয়ে নয় নৃত্যকলায় ও তিনি অনন্য, ছবিগুলোতে তাঁর অপরুপ নৃত্যশৈলীতে মুগ্ধ করেছিলেন। তাঁর চিতায়নে ধারণ হয়েছিল ‘ন্যায়নো মে স্বপ্না, মে তেরি দুশমন, হাওয়াই হাওয়াই থেকে ‘আই লাভ ইউ’ সহ বহু জনপ্রিয় গান।

অনিল কাপুরের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে সফল নায়িকা তিনি, মিঠুন চক্রবর্তী প্রেমে পড়েছিলেন এই তিলোত্তমার, জিতেন্দ্র ক্যারিয়ারে তিনি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ঋষি কাপুর, সঞ্জয় দত্ত থেকে কমল হাসান, রজনীকান্ত সবার সাথেই তিনি ছিলেন সমুজ্জ্বল। জুনিয়র শাহরুখ খান, অক্ষয় কুমারের ও সাথেও অভিনয় করেছিলেন।

তিনিই একমাত্র নায়িকা, যিনি অমিতাভ বচ্চনের সাথে অভিনয় করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, পরে অবশ্য একসাথে দেখা মিললেও পারিশ্রমিক বেশি নিয়েছিলেন শ্রীদেবী। হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের ছবিতে অভিনয় করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, ইতিহাস সৃষ্টিকারী ছবি ‘বাহুবলী’র প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

বর্ণিল ক্যারিয়ারে পেয়েছেন পদ্মশ্রী, দুবার বলিউড ফিল্মফেয়ার, দক্ষিনী ফিল্মফেয়ারসহ আরো বহু পুরস্কার, তবে পাওয়া হয়নি কাঙ্ক্ষিত জাতীয় পুরস্কার। অধরা এই পুরস্কারটি হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর হাতে ধরা দেবে – এমন প্রত্যাশা যখন করছিল সবাই, তখন তিনিই সকল মায়ার বাঁধন ছিন্ন করলেন।

চলে গেলেন জীবন নদীর ওপারে। দুবাইয়ে ২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মোটে ৫৪ বছর বয়সে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে বিদায় জানালেন বলিউডকে, বিদায় জানালেন এই পৃথিবীকেও।  একটি পারিবারিক বিয়ে খেতে গিয়েছিলেন সেখানে। আর ফেরাই হল না তাঁর।

ব্যক্তিজীবনে ১৯৮৫ সালে বিয়ে করেন অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে। সেই বিয়ে তিন বছরের বেশি টিকেনি। এরপর বিয়ে করেছেন স্বনামধন্য প্রযোজক বনি কাপুরকে, সংসারে রয়েছে দু’টি কন্যা সন্তান। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে মুক্তি পায় মেয়ে জাহ্নবি কাপুরের প্রথম সিনেমা ‘ধাড়াক’। এখনো সেই সিনেমার সাফল্যেই বুঁদ হয়ে থাকার কথা ছিল তাঁর। তবে, সৃষ্টিকর্তা তাঁর জন্য অন্য কিছু একটা ভেবে রেখেছিলেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।