বলিউডের গ্রিক দেবতা

২০০০ সাল। পরিচালক রাকেশ রোশান রোমান্টিক ধারার সিনেমা ‘কাহো না প্যায়ার হ্যাঁয়’ বানাবেন। নায়ক হিসেবে পছন্দ করলেন রোমান্স কিং শাহরুখ খান কে। কিন্তু খান সাহেবের চরিত্রটি পছন্দ হলো না। ফিরিয়ে দিলেন । পরে রাকেশ সাহেব সে জায়গায় অভিষেক করান নিজের ছেলেকে।

নায়ক হিসেবে ছেলের এটা প্রথম ছবি হলেও এর আগে বেশ কয়েকটি ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। পাশাপাশি বাবার ছবিতেও মাঝে মাঝে ক্যামেরার পিছনে কাজ করতেন। তাই ফিল্মী দুনিয়া সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা ছিল। রাকেশ পুত্রের নায়ক হিসেবে প্রথম সিনেমা, জনপ্রিয় সব গান, সাথে ছেলেটির অনবদ্য নাচ ও অভিনয় – সবমিলিয়ে ছবিটি হয়ে পড়ে দারুন আলোচিত।

মুক্তির পর বক্স অফিসে ব্যাপক সাড়া ফেলে, বলিউডবাসী এই নবীন নায়ককে সাদরে গ্রহন করে নেয়। প্রথম সিনেমায় এমন সাফল্য, তাই ফিল্মফেয়ারে সেরা নবাগত অভিনেতার পুরস্কারটি প্রায় নিশ্চিত ছিল, সেটা পেয়েছেনও। তবে বিস্ময়কর হচ্ছে, ফিল্মফেয়ারে অভিষেক ছবি দিয়েই সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাওয়ার ঘটনা সেবারই প্রথম ঘটে। পাশাপাশি রাকেশ রোশান, রাজেশ রোশান দুইভাই’ই ফিল্মফেয়ারে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রথম পুরস্কার পান।

২০০১ সাল। জনপ্রিয় পরিচালক করন জোহর নির্মান করেন পারিবারিক ও রোমান্টিক ধারার সিনেমা ‘কাভি খুশি কাভি গাম’। এই সিনেমায় অভিনয় করলেন অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খানের মত বড় তারকারা, সাথে ছিলেন জয়া বচ্চন, কাজলদের মত জনপ্রিয় নায়িকা। এদের মাঝেও এক নবীন নায়কের উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল এই ছবিতে। বড় তারকাদের মাঝে মোটেই ওর চরিত্র মলিন হয়ে যায়নি। বরং তাঁর চরিত্রটিই সিনেমাটিকে প্রানবন্ত করে। বলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে তারকাবহুল এই সিনেমাটি বক্স অফিসে দারুন ব্যবসা করে। পাশাপাশি অর্জন করে ফিল্মফেয়ারসহ বেশ কিছু পুরস্কার।

২০০৩। রাকেশ রোশান বানালেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নির্ভর সিনেমা ‘কোয়ি… মিল গ্যায়া’। এই সিনেমা ও তিনি নায়ক হিসেবে নিলেন নিজের ছেলেকেই। তবে ততদিনে তাঁর ছেলে বলিউডে একটা আলাদা স্থান করে নিয়েছেন। নায়করূপী সেই ছেলে এবার আসলেন বলিউডের প্রথম সুপারহিরো হিসেবে। দর্শকরাও এই সুপারহিরোকে সাদরে গ্রহন করে নেয়।

বক্স অফিসে সিনেমাটি নাম লিখায় বছরের অন্যতম বানিজ্যিক সফল ছবি হিসেবে। সেবছর ফিল্মফেয়ারে বাঘা বাঘা অভিনেতাদের হারিয়ে জনপ্রিয় ও সমালোচক দুই শাখায়ই সেরা অভিনেতার পুরস্কার লাভ করেন,যা বলিউডের ইতিহাসে বিরল। প্রথম ছবির সাফল্যে পরবর্তীতে আরো দু’টি সিক্যুয়েল বের হয়, সেগুলো ও বক্স অফিসে সফল ছিল।

২০০৮ সাল। সম্রাট আকবরের জীবনী নিয়ে আশুতোষ গোয়াড়িকর নির্মান করেন ‘যোধা আকবর’। ঐতিহাসিক এই চরিত্রে দর্শকদের বাজিমাৎ করেন সেই সুপার হিরো। বক্স অফিস, সমালোচক সব জায়গায় জয়ী হল এই ছবি, পাশাপাশি সুপার হিরো এই নতুন রুপে ভূয়সী প্রশংসা পান। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভাগ্য সহায় না হলেও, ফিল্মফেয়ারে অর্জন করে নেন, সেরা অভিনেতার পুরস্কার।

উপরোক্ত চার সিনেমাতে উল্লেখ করা নায়ক একজনই। তিনি তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি দিয়ে সিনেমাগুলোকে প্রানবন্ত করেছেন, হয়েছেন দর্শকপ্রিয়। পেয়েছেন সুপারস্টারের খেতাব। তিনি আর কেউ নন সুপারহিরো খ্যাত বলিউড হার্টথ্রুব হৃতিক রোশন।

১৯৮৬ সালে ‘ভগবান দাদা’ নামক একটি সিনেমায় শিশু শিল্পী হিসেবে আত্বপ্রকাশ করেন। পরবর্তীতে বাবার পরিচালিত করন অর্জুন, কয়লা সিনেমায় ক্যামেরার পিছনে কাজ করেন। বলিউডে নাচের জগতে নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য স্থানে। কাজ করেছেন বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে। উপরের ছবিগুলো ছাড়াও কাজ করেছেন ফিজা, মিশন কাশ্মীর, জিন্দেগি মিলেগি না দোবারা, গুজারিশ, অগ্নিপথ থেকে পুরোপুরি মশলাদার ছবি ধুম ২, ব্যাং ব্যাং এর মত সিনেমাতে।

যদিও তাঁর বেশ আলোচিত সিনেমা ‘মাহেঞ্জদারো’ দর্শকদের হতাশ করেছে। গত বছর মুক্তি পেয়েছে ‘কাবিল’। ছবিটি সেভাবে সাড়া না জাগালেও হৃতিকের অভিনয় দর্শক জয় করেছে। সামনে কাজ করবেন বায়োপিক ‘সুপার ৩০’। প্রত্যাশা রইলো এই সিনেমা দিয়ে আবার তিনি সমুজ্জ্বল হবেন।

বর্ণিল এই ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত বহু পুরস্কার পেয়েছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পেলেও ফিল্মফেয়ারে পুরস্কার পেয়েছেন মোট ছ’বার। এর মধ্যে সেরা অভিনেতার পুরস্কার চারটি। ব্রিটেনের বিখ্যাত মাদাম তুসো জাদুঘরে স্থান পেয়েছেন। পৃথিবীর সেরা দশ আবেদনময়ী পুরুষ হিসেবে টম ক্রুজের পরই আছে তাঁর নাম।

পরিশ্রম, মেধা, দর্শকদের ভালোবাসায় কুমার, বচ্চন, কাপুর, খানদের পাশে নিজের নামটি বলিউডের আকাশে শুকতারার মত উজ্জ্বল করিয়েছেন – একজন তারকার জীবনে এটাই তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বলিউডে গত দুই যুগে যত নায়কের আবির্ভাব ঘটেছে, তাদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে সফল।

ব্যক্তিজীবনে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সুজানা খানকে। তবে দীর্ঘ এই সংসারে এসেছে বিচ্ছেদ। তাঁদের রয়েছে দুটি সন্তান। চলচ্চিত্র জগত ও ব্যক্তিজীবন দুই জায়গাতেই নিজেকে আরো বর্ণিল করে তুলবেন – জীবনের ৪৪ টি বসন্ত কাটিয়ে ফেলা হৃতিকের প্রতি এমনটাই রইলো প্রত্যাশা।

অভিষেকের সময় তিনি ছিলেন কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের ‘ক্রাশ’, আজ ১৭ টি বছর বলিউডে কাটিয়ে ফেললেও এই পরিচয়টা মুছে যায়নি। হৃতিক হলেন সেই অভিনেতা যিনি প্রথম ভাগ বসিয়েছিলেন তিন খান – সালমান, শাহরুখ, আমিরের সাফল্যে। তিনি সিনেমায় নিজের চরিত্র নিয়ে হাজারো এক্সপেরিমেন্ট করেছেন ও সফল হয়েছেন। তিনিই বলিউডকে প্রথম ভাবতে শিখিয়েছেন, নায়কদের ভাল নাচ জানাটা বাধ্যতামূলক, একই ভাবে বুঝিয়েছেন নায়কদের শরীর নিয়েও সচেতন হতে হয়। তিনিই তো বলিউডের সত্যিকারের ‘গ্রিক দেবতা’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।