ফ্লোরেন্টিনো পেরেজ: ট্রান্সফার মার্কেটের মাস্টারমাইন্ড

খ্যাতনামা সব লিগের মৌসুম শেষ প্রায় মাসখানেক, শুরুর পথে নতুন মৌসুম। ফুটবলারেরা ছুটি কাটিয়ে ফিরছেন প্রাক মৌসুম প্রস্তুতিতে। তাই বলে কি এই কয়দিন ফুটবল দুনিয়া নিস্তরঙ্গ ছিল? মোটেও না। ফুটবলের মৌসুম শেষ হলেও নাটক কিন্তু শেষ হয় না, বরং দুই মৌসুমের মাঝের এই সময়েই জমে আসল নাটক, দলবদলের নাটক!

প্রতিদিনই আসছে নতুন সব গুজব, সমর্থকেরা থাকেন উৎকণ্ঠায়, কাঙ্ক্ষিত ফুটবলারটিকে পছন্দের ক্লাব দলে টানতে পারবে তো? নাকি ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে অন্য কোন ক্লাব! সাম্প্রতিক সময়ে দলবদলের বাজারে এই ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়ার ভয় যদি কাউকে নিয়ে পেয়ে থাকে বাকি ক্লাবগুলো, তবে তিনি আর কেউ নন, রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্টিনো পেরেজ।

ট্রান্সফার মার্কেটে ঠিকঠাক সক্রিয়তা দেখানোর উপরেই একটি ক্লাবের পুরো মৌসুমের সফলতার অনেকটা নির্ভর করে। মুদ্রাস্ফীতির বাই প্রোডাক্ট হিসেবে দলবদলের বাজার এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত। টাকার ঝনঝনানি যে ক্লাব যত বেশি শোনাতে পারবে, সেই ক্লাবের দলবলদের বাজারে দাও মারার সম্ভাবনাও তত বেড়ে যাবে, সাধারণ ধারণা এটাই।

রিয়াল মাদ্রিদের সৌভাগ্য, তারা এমন একজনকে পেয়েছে, যে শুধু ক্লাবের প্রেসিডেন্টের পদটাই সামলাচ্ছে না, বরং দলবদলের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে রাজার হালে। ক্লাবে তাঁর প্রথম মেয়াদ থেকেই তিনি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, বাকিদের চেয়ে এক কদম এগিয়ে থাকতেই এসেছেন তিনি।

মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট পদে প্রথমবারের মত লড়াই করেন ১৯৯৫ সালে। ক্লাবের দুর্বল আর্থিক অবস্থা ও বোর্ডের অব্যবস্থাপনাকে পুঁজি করে মূলত নির্বাচনী প্রচারণা চালান পেরেজ, কিন্তু শেষ পর্যন্ত র্যা মন মেন্ডোজার কাছে হেরে যান ৬৯৯ ভোটে।

প্রথম বার হারলেও দমে যাননি পেরেজ, ২০০০ সালে ঠিকই আবারো নির্বাচনী ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হাজির হন। এবারো নির্বাচনী ইশতেহার রাখলেন অপরিবর্তিত, ক্লাবের আর্থিক দুরবস্থা ও বোর্ডের অব্যবস্থাপনাকেই বানালেন প্রধান হাতিয়ার। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন লরেঞ্জো সাঞ্জ, যার মেয়াদে ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ঘরে তুলে মাদ্রিদ। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন মেয়াদে দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতিয়েছেন, সেটিকেই পরবর্তী মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার টিকেট ভেবে নিয়েছিলেন সাঞ্জ। কিন্তু হিসাবে গণ্ডগোল লাগিয়ে দেন পেরেজ, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা থেকে লুইস ফিগোকে মাদ্রিদে নিয়ে আসবেন, এমনটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে বাজিমাত করে দেন তিনি।

তারপরই শুরু রিয়ালে পেরেজের ‘গ্যালাকটিকো’ অধ্যায়। প্রতি বছর একজন করে সুপারস্টার নিয়ে আসাটাকে একপ্রকার নিয়ম বানিয়ে ফেললেন পেরেজ। ২০০১ সালে জুভেন্টাস থেকে জিনেদিন জিদানকে নিয়ে এলেন তৎকালীন দলবদলের বিশ্বরেকর্ড ৭৩.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। ২০০২ তে আনলেন রোনালদো লিমাকে, ২০০৩ এ বেকহাম, ২০০৪ এ মাইকেল ওয়েন, আর ২০০৫ এ আনলেন রবিনহোকে। রিয়াল তখন তারায় তারায় আলোকিত এক ক্লাব। এই পলিসিতে প্রথম তিন মৌসুমে দারুণ সফলও হন পেরেজ, দুইটি লা লিগা জয়ের পাশাপাশি জেতেন একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগও।

কিন্তু সমস্যাটা ছিল, এইসব তারকাদের বেশিরভাগেরই বয়স তখন ত্রিশের কোটায়। ক্লাবের ভবিষ্যৎ খুব বেশি স্বস্তিদায়ক না, পেরেজকে সেটি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিতও মনে হল না। পেরেজ যে তখন মাঠের পাশাপাশি মাঠের বাইরের খেলার দিকেও সমান মনোযোগ দেয়া শুরু করেছেন! বিশ্বজুড়ে কদর আছে এমন ফুটবলারদের দলে ভিড়িয়ে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু ব্যবহার করে মাঠের বাইরের বাজার ধরাটাই মূল উদ্দেশ্য ছিল পেরেজের, আর নিজের উদ্দেশ্যে শতভাগ সফলও হন তিনি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টপকে এই ধরাধামের সবচেয়ে ধনী ক্লাবে পরিণত হয় কয়েক মৌসুম আগেই আর্থিক দুরবস্থায় থাকা ক্লাবটি।

তবে পেরেজের মধুচন্দ্রিমা শেষ হতে শুরু করে ২০০২-০৩ মৌসুমের পর থেকে। রিয়ালকে ২৯ তম লীগ শিরোপা এনে দিলেও ভিসেন্তে দেল বস্কের চুক্তি নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানান পেরেজ। ক্লাবে এতসব তারকার ইগো সমস্যাকে ভালোভাবে সামলে আসছিলেন যিনি, সেই বস্কের চুক্তি নবায়ন না করায় কিছুটা গুঞ্জন ওঠে পেরেজকে ঘিরে। ক্লাবে একটা বিভক্তিও সৃষ্টি হয়। দেল বস্কের পাশে এসে দাঁড়ান তাঁর ৪ শিষ্য ফার্নান্দো হিয়েরো, ফার্নান্দো মরিয়েন্তেস, স্টিভ ম্যাকম্যানাম্যান ও ক্লদ ম্যাকেলেলে। ফলস্বরূপ চারজনই ক্লাব ছাড়তে বাধ্য হন।

তবে এদের মধ্যে ম্যাকেলেলের বিদায়ের ঘটনা নিয়ে বেশ কড়া সমালোচনার মুখে পড়তে হয় পেরেজকে। পেরেজের অধীনে রিয়ালের সাফল্যের অন্যতম কারিগর ছিলেন সে সময়ের সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ম্যাকেলেলে। কিন্তু তারপরেও গ্যালাকটিকোসের অন্য সদস্যদের তুলনায় ম্যাকেলেলের পারিশ্রমিক ছিল বেশ কম। সতীর্থ জিদান, রাউল, ম্যাকম্যানামান ও মরিয়েন্তেসের সমর্থন নিয়ে নতুন চুক্তির দাবি জানান তিনি। কিন্তু পেরেজ তাতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। উন্নত চুক্তি তো করেনইনি, বরং ম্যাকেলেলেকে ছেড়ে দেন চেলসির কাছে। শুধু এতটুক হলেও নাহয় কথা ছিল, পেরেজ প্রশ্ন তুলে বসেন ম্যাকেলেলের খেলোয়াড়ি দক্ষতা নিয়েই! ম্যাকেলেলের টেকনিককে মাঝারি মানের বলে রিয়াল তাঁকে মিস করবে না বলে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে দেন পেরেজ।

কিন্তু সত্যটা হল, ম্যাকেলেলের অভাব আর পূরণ করতে পারেননি পেরেজ। ম্যাকেলেলে যাওয়ার পর ওয়েন, হুলিও বাপতিস্তা, রবিনহোদের মত তারকা স্ট্রাইকারদের নিয়ে আসলেও যোগ্য কোন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার খুঁজে আনতে পারেননি প্রেসিডেন্ট পেরেজ। আর্সেনাল থেকে প্যাট্রিক ভিয়েরাকে আনার গুজব উঠলেও তা হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে সময় লাগে না বেশি, কারণ ডিফেন্সের কোন প্লেয়ারের জন্য বেশি অর্থ খরচ করতেই রাজি ছিলেন না পেরেজ!

এর ফলও ভুগতে হয় রিয়ালকে। দেল বস্ক ও ম্যাকেলেলে চলে যাওয়ার পর বড় কোন শিরোপার দেখাও পায়না মাদ্রিদ। সেই দায় মাথায় নিয়ে ২০০৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন পেরেজ।

মাদ্রিদে পেরেজ অধ্যায় এখানেই শেষ হয়ে গেলে ইতিহাসে পেরেজের নাম লেখা থাকত অপরিণামদর্শী এক প্রেসিডেন্ট হিসেবে। কিন্তু পেরেজের নাম যে ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে অন্য অধ্যায়ে, সেটা তখন কে জানত!

২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে এলেন। তবে এই পেরেজ আর আগের মত অপরিণামদর্শী নন, বরং দেখা দেবেন সময়ের অন্যতম সেরা ট্রান্সফার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে। প্রথম মেয়াদে বয়সী খেলোয়াড় কিনে কেবল ক্লাবের ব্র্যান্ড তৈরির দিকেই মনোযোগী ছিলেন পেরেজ, দ্বিতীয় মেয়াদে এসে নজর দিলেন ক্লাবের ভবিষ্যতের দিকে। মিলান থেকে কাকাকে আনলেন প্রায় ৬০ মিলিয়ন পাউন্ডে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে বিশ্বরেকর্ড ভেঙ্গে ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে নিয়ে এলেন ভবিষ্যতের সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে। অলিম্পিক লিও থেকে আনলেন করিম বেনজেমাকে, লিভারপুল থেকে করলেন জোড়া সাইনিং- জাবি আলোনসো ও আলভারো আরবেলোয়া। টাকা ঠিকই খরচ করছিলেন পেরেজ, কিন্তু এবার মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় কিনে ক্লাবের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করা। একে একে ক্লাবে নিয়ে আসেন মেসুত ওজিল, অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া, গঞ্জালো হিগুয়েইন, টনি ক্রুস, লুকা মড্রিচদের মত দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়।

আস্তে আস্তে ফল পেতে শুরু করে মাদ্রিদ। ২০১২ তে শতাধিক পয়েন্ট নিয়ে লীগ জেতাটা ছিল আরও বড় কিছুর ইঙ্গিত। ২০১৩ ট্রান্সফার উইন্ডোতে সমর্থকদের উপহার দিলেন গ্যারেথ বেল ও ইসকোর মত দুইজন অসাধারণ প্রতিভাবান ফুটবলার, সেই মৌসুমেই মাদ্রিদ জিতল লা ডেসিমা।

পরবর্তী ৩ বছরে পেরেজ হলেন আরও পরিণত। একদিকে বার্সার ট্রেবল জয়, আরেকদিকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর লোভনীয় টেলিভিশন চুক্তি, সব মিলিয়ে পেরেজ নজর দিলেন কম দামে আরও তরুণ খেলোয়াড় আনার উপর। একে একে ক্লাবে নিয়ে এলেন দানিলো, ক্যাসেমিরো ও অ্যাসেন্সিওদের মত উঠতি প্রতিভাদের, ধার থেকে ফিরিয়ে আনলেন লুকাস ভাস্কুয়েজকেও।

এদের কারোর মূল্যই ৩০ মিলিয়নের বেশি ছিল না, কিন্তু এদের প্রত্যেকেই ক্লাবের সাফল্যে দুর্দান্ত অবদান রেখেছেন। আলভারো মোরাতাও যোগ দিলে এই মৌসুমে রিয়াল হয়ে ওঠে দুর্দমনীয়, জিতে নেয় টানা চ্যাম্পিয়ন লিগ শিরোপা।

এই মৌসুমেও এখনো পর্যন্ত খুব সাফল্যের সাথেই এই ধারা বজায় রেখেছেন পেরেজ। মার্কোস লরেন্তে, হেসুস ভ্যালেহোর মত প্রতিভাধর ফুটবলারদের যেমন লোন থেকে ফিরিয়ে এনেছেন, তেমনি কিনে এনেছেন দানি সেবায়োস, ভিনিসিয়াস জুনিয়র, থিও হার্নান্দেজের মত আগামীর তারকাদের।

এভাবে তরুণ খেলোয়াড়দের দলে ভিড়িয়ে পেরেজ মূলত ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর সাথেই টেক্কা দিলেন। একজন খেলোয়াড় ২৪ এ পা দিলেই তাঁর দাম হয়ে যায় গগণচুম্বী, সাথে থাকে একাধিক ক্লাবের সাথে লড়াই করার ঝামেলা। পেরেজ সেই ঝামেলায় না গিয়ে বরং হেঁটেছেন সহজ, কিন্তু নিশ্চিত লাভের পথে। পেরেজের দারুণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির বলেই মাত্র ৫১ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ভ্যালেহো, সেবায়োস, থিও ও অ্যাসেন্সিওর মত চারজন অমিত প্রতিভাধর খেলোয়াড় পেয়েছে মাদ্রিদ, যারা কিনা হবেন ক্লাবের ভবিষ্যতের মূল কাণ্ডারী।

টাকা অনেক ক্লাবেরই থাকে, কিন্তু সেই টাকা কোথায় কিভাবে কার পেছনে খরচ করতে হবে, সেই ব্যবসায়িক বুদ্ধি সবার থাকে না। ফ্লোরেন্টিনো পেরেজের সেটা আছে, এবং আছে বলেই তিনি পরিণত হয়েছেন সময়ের সেরা ট্রান্সফার মাস্টারমাইন্ডে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।