ফুটবলাররা কী খান!

রাশিয়াতে ১৮ হাজার লিটার বিয়ার নিয়ে খেলতে এসেছিল জার্মান। সঙ্গে ৭০০ কেজি সস এবং ৩০০ কেজি আলুও নিয়ে এসেছিল। লাভ হয়নি, বিদায় নিতে হয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকেই।

লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দলের খাবার তারা রাশিয়া যাওয়ার আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। পরিমানটাও ছিল অস্বাভাবিক – তিন টন! গরু, শূকর, সেদ্ধ করা কনডেনসড দুধ ছিল সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে আসা খাবারের তালিকায়। বাবুর্চিও পৌঁছে গিয়েছিলেন আগেভাগেই।

আর্জেন্টাইনদের বিশ্বকাপ চলাকালে খাবারের কোনো অভাব হয়নি, অভাব হয়েছে মাঠের পারফরম্যান্সে। তাই তো, দ্বিতীয় পর্ব থেকেই বাড়ির বিমানে উঠতে বাধ্য হয়েছেন আলবিসেলেস্তেরা।

রাশিয়ায় খেলতে আসা প্রতিটি দলের নিজস্ব বাবুর্চির টিম ছিল। সেই শেফরাই খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি করেছেন খেলোয়াড়দের পছন্দের খাবার।  তবে, এখানে খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের চাহিদা।

কারণ, মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য অনুশীলনের সাথে সাথে যথোপযুক্ত ও মানসম্পন্ন খাবারটাও তো জরুরী। মূলত যেসব খাবার খেলোয়াড়দের পারফর্ম করতে পারে সেই সব খাবারের দিকে জোর দেয়া হয়।

ফুটবলারদের নিজেদের ব্যক্তিগত কিছু শেফও থাকেন। এমনই একজন শেফ জনি মার্শ। বিশ্বের বেশ কয়েক জন তারকা ফুটবলার তার হাতে তৈরি খাবারের ভক্ত। ঐ তারকা ফুটবলারদের মধ্যে রয়েছেন ইংল্যান্ড দলের ডিফেন্ডার কাইল ওয়াকার এবং গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড।

জনি মার্শের রান্নার ভক্তের তালিকায় রয়েছেন বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইন এবং মারওয়ান ফেলাইনি। এরা দু’জনেই ইংলিশ প্রিমিয়ারশিপেরও তারকা। রোনালদো এবং ফ্রান্সের পল পগবার জন্যও রাঁধতে চান ম্যানচেস্টারের এই ইংলিশ শেফ। তবে জনি মার্শের স্বপ্নের ক্লায়েন্ট অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

মার্শের ভাষায়, ‘আমার ক্লায়েন্টদের নিয়ে আমি অত্যন্ত খুশি, কারণ তারা খুঁতখুঁতে নন। তারা চান সাদাসিধে খাবার, কিন্তু তাতে থাকতে হবে পুষ্টি। কিন্তু আমি জানি মাঠে ফুটবলাররা কতটা পারফর্ম করবেন, তার পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ নির্ভর করে তারা ম্যাচের আগে কী খাচ্ছেন তার ওপর। একেক ফুটবলারের পছন্দ একেক-রকম, কিন্তু ইংলিশ ডিফেন্ডার কাইল ওয়াকার ম্যাচের আগে চান স্প্যাগেতি বোলোনেজ। এটি একটি ইটালিয়ান খাবার। গরুর কিমা এবং টম্যাটো দিয়ে সস বানিয়ে সিদ্ধ স্প্যাগেতি বা পাস্তার সাথে পরিবেশন করা হয়। তবে ওয়াকার একটু ভিন্নভাবে খাবারটি চান। তার পাস্তা সিদ্ধ করা হয় বিটরুটের রসে যাতে ঐ পাস্তা বিটরুটের আয়রন এবং নাইট্রেট শুষে নিতে পারে। এই দুই খনিজ দ্রব্য তাকে মাঠে বাড়তি শক্তি জোগায়। অন্যদিকে বেলজিয়াম এবং ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাবের তারকা কেভিন ডি ব্রাইনা চান ম্যাচের আগে তার খাবারে যেন যথেষ্ট শর্করা থাকে, তবে খুব ভারি যেন না হয়।’

মার্শ জানালেন, ইংল্যান্ড দলের গোলকিপার জর্ডান পিকপোর্ড ম্যাচের আগে খুব বেশি খেতে চান না। দরকারও নেই, কারণ অন্য ১০ জন খেলোয়াড়ের চেয়ে গোলকিপারকে ছুটতে হয় কম। ফলে তার শক্তি খরচও হয় কম।

তিনি বলেন, ‘মাঝে মধ্যে ফুটবলাররা রুটিনের বাইরে যেতে চান। ফাস্ট ফুড খেতেও চান। তারা যদি বার্গার এবং ফ্রাই চান, আমি তাদের জন্য মসলাদার টার্কি বার্গার করে দিই, খেয়াল রাখি বেশি যেন তেল-চর্বি ব্যবহার না হয়। মিষ্টি খাওয়ার ওপর অনেক বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু অনেকেই মিষ্টির পোকা। বিশেষ করে ম্যাচের পর তাঁরা পুডিং দাবি করেন। আমি আমার ক্লায়েন্টদের ‘অ্যাভোকাডো-চকলেট মুস’ তৈরি করে দিই, সাথে কিছু প্রোটিন যোগ করে দিই, যাতে দ্রুত তাদের ক্লান্তি কাটে।’

সময়, স্থান অনুযায়ী খেলোয়াড়দের দৈনন্দিন ডায়েট চার্টে পরিবর্তন আসে। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগের দিন, বা ম্যাচের দিন প্রচুর পানি খেতে হয় তাঁদের। ম্যাচের সময় ঘনিয়ে আসলে (চার ঘণ্টা আগ পর্যন্ত) ফুটবলাররা ৫ থেকে ৭ লিটার পানি খান। আর যদি কারো পানিশূণ্যতার সম্ভাবনা থাকলে প্রতি দুই ঘণ্টায় ৩ থেকে ৫ লিটার পানি খেতে হয়। পানির পরিমানটা নির্ভর করে শরীরের ওজনের ওপর। পেশাদার ফুটবলাররা সাধারণত ম্যাচ শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে থেকে অ্যালকোহল বন্ধ করে দেন।

ম্যাচের বিরতিতে হাল্কা নাশতা হিসেবে ফুটবলাররা ৩০ থেকে ৬০ গ্রাম কাকড়া। একটা প্রাকৃতিক পারফরম্যান্স বর্ধক হিসেবে কাজ করে। কেউ কেউ গ্লুকোজ, সুক্রোজ অথমা মাল্টোডেক্সট্রিনের মিলিয়ে বানানো একটা পানীয় পান করেন। এটা তাঁদের দক্ষতা বাড়ায়, ক্লান্তি মুক্ত রাখে।

ম্যাচের ফলাফল যাই হোক, ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্রই নতুন ম্যাচের জন্য অন্তত খাদ্যাভাসের দিক থেকে প্রস্তুত হয়ে যেতে হয় ফুটবলারদের। সেদিনে রাতের খাবারে ২৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম প্রোটিন খাওয়া বাধ্যতামূলক।

– বিবিসি, ডেইলি মেইল, ফোরফোরটু ও স্পোর্টস ইলাসট্রেটেড অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।