ফিরে দেখা ২০১৭: সেরা ১০ নাটক

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতে অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে নাটক। টিভি চ্যানেল গুলোও বিভিন্ন উৎসব বা  উৎসব না থাকলেও প্রচার করে অজস্র নাটক। প্রতি বছরের ন্যায় এই বছরেও প্রচারিত হয়েছে অগনিত নাটক,দর্শকদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রচার হয়েছিল আলোচিত সিরিজ। বর্তমান নাটক নিয়ে দর্শকদের কিছুটা হতাশা থাকলেও এই বছর নির্মাতারা চেষ্টা করেছেন ভালো কিছু দেয়ার। সেই চেষ্টায় তাঁরা বেশ সফল, বছর শেষে বেরিয়ে এসেছে বেশ সংখ্যাক প্রশংসিত ও আলোচিত নাটক।

এই বছরভর প্রচারিত অন্যতম সেরা দশ আলোচিত নাটক নিয়ে এই আয়োজন।

কথা হবে তো

ঈদের অন্যতম আলোচিত সিরিজ ‘অস্থির সময় স্বস্তির গল্প’ এ প্রচার হওয়া নাটক ‘কথা হবে তো’। আহসান হাবিবের কবিতার অনুপ্রেরনায় এই নাটকটির কাহিনী লিখেছেন গাওসুল আলম শাওন, আর পরিচালনা করেছেন প্রজন্ম টকিজের প্রতিভাবান নির্মাতা সৈয়দ আহমেদ শাওকি। মনোজ কুমার, নাবিলার অভিনয় সমৃদ্ধ এই নাটকে ফুটে উঠেছে অব্যক্ত ভালোবাসার পরিপূর্নতা। এটি বছরের অন্যতম সেরা কাজ, গত কয়েক দশকে ভালোবাসার নাটক প্রচার হওয়ার মধ্যে এটি সেরা। সুবীর সেনের গাওয়া জনপ্রিয় গানটি এই নাটকটি আরো পরিপূর্নতা পেয়েছে।

নাটকটি দেখুন এখানে ক্লিক করে

বিকেল বেলার পাখি

দর্শকদের কাছে নাটককে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পিছনে অন্যতম অবদান প্রযোজনা সংস্থা ‘ছবিয়াল’ এর। বেশ কয়েক পর বিরতি দিয়ে এই ঈদে তাঁরা আবার এসেছে রি- ইউনিয়ন করতে। ছবিয়ালের অন্যতম মেধাবী নির্মাতা আদনান আল রাজীবের নাটক ‘বিকেল বেলার পাখি’। মধ্যবিত্ত জীবনে সুখ,দু:খ জীবনযাত্রা অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে। পরিবারের বাবা চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু ছিলেন অনবদ্য, এছাড়া মা চরিত্রে ইলোরা গহর ও মেয়েদের চরিত্রে অভিনয় করা দুই অভিনয় শিল্পী দারুন অভিনয় করেছে, তবে তাদের চরিত্রগুলো অতটা বিকশিত হয়নি। তবে এই নাটকে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন ছেলে চরিত্রে অভিনয় করা এলেন শুভ্র। এই প্রজন্মের তরুণ তুর্কীদের মধ্যে ও সবচেয়ে মেধাবী অভিনেতা। এই গল্পকে দারুণ ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য নির্মাতা রাজীবকে অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য।

মার্চ মাসে শুটিং

ঈদের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজ। এই সিরিজে প্রথমদিন থেকে প্রচারিত নাটকই দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছিল না। অবশেষে আয়নাবাজির আসল রুপকার অমিতাভ রেজার হাত ধরে প্রত্যাশার পারদটা পূর্ণ হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ, নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’ কবিতা, মানসিক টানাপোড়ন সব মিলিয়ে এই ঈদের অন্যতম সেরা নাটক ‘মার্চ মাসে শুটিং’।গুণী অভিনেতা গাজী রাকায়েত নতুনভাবে আলোচিত হয়েছেন, পাশাপাশি অপূর্বের অভিনয় ও চোখ জুড়োবে। এই নাটকে অন্যতম চরিত্র রুপদানকারী নাবিলার অভিনয়ে নিয়মিত হওয়া বেশ প্রয়োজন।

বড় ছেলে

এই বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক ‘বড় ছেলে’, মিজানুর রহমান আরিয়ানের পরিচালনায় এই নাটকে মূল চরিত্রে আছেন অপূর্ব ও মেহজাবীন, অভিনয়ে দু’জনেই সেরাটা দিয়েছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলের ত্যাগ, ভালোবাসা, সংগ্রাম সব কিছুই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিছু ভুল- ভ্রান্তি থাকলেও নির্মাতা হিসেবে আরিয়ান চমক দেখিয়েছেন। নাটকটি দর্শকদের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। আবহ সংগীতও ছিল যথাযথ, গান টাও বছরের অন্যতম জনপ্রিয় গান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

আমরা ফিরবো কবে

নির্মাতা হিসেবে শাফায়েত মনসুর রানা এই বছর বেশ আলোচিত হয়েছেন। যান্ত্রিক জীবনে কর্মব্যস্ততায় বৃদ্ধ বাবা- মায়ের সঙ্গে সন্তানদের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তাই দেখানো হয়েছে, সাথে কিছু পারিবারিক নাটকের গল্প। অভিনয়ে সৈয়দ হাসান ইমাম ও দিলারা জামান অনবদ্য, পাশাপাশি জন কবির, অপর্না, স্বাগতা, অনিরা যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন।

উচ্চতর হিসাববিজ্ঞান

নবীন নির্মাতা ময়ুখ বারী দিন দিন নিজেকে পরীক্ষিত করছেন, তাঁরই অন্যতম প্রয়াস ‘উচ্চতর হিসাববিজ্ঞান’। কর্মক্ষেত্রে নিজেকে সৎ রাখার টানাপোড়ন, পাশাপাশি নিজের মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প সবটাই তিনি তুলে ধরেছেন অনবদ্য ভাবে। অভিনয়ে আজাদ আবুল কালাম ও নিশো পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন, নাদিয়া নদীও প্রানবন্ত ছিলেন।

গোল্ডেন এ প্লাস

জালালের গল্প খ্যাত পরিচালক আবু শাহেদ ইমন নির্মান করেন বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা উপজীব্য করে নাটক ‘গোল্ডেন এ প্লাস’। অভিনয়শিল্পীরা বেশ ভালো করেছেন, এই ঈদে বেশ ভালো একটি নাটক। তবে সেভাবে আলোচিত হয়নি। বলা যায় দারুণ কিন্তু ‘আন্ডাররেটেড’ একটা নাটক।

২৬ দিন মাত্র

ছবিয়াল রি-ইউনিয়নের নাটক ‘২৬ দিন মাত্র’। নির্মাতা হিসেবে মুস্তফা কামাল রাজের প্রতি দর্শকদের অভিযোগ বেশি। এবার সেই অভিযোগ ভেঙেছেন এই নাটকের মাধ্যমে। বৃদ্ধাশ্রমে এক প্রাক্তন দম্পতির হঠাৎ দেখা, সম্পর্কের টানাপোড়ন অনবদ্য ফুটে উঠেছিল প্রথিতযশা আমজাদ হোসেন ও দিলারা জামানের অভিনয়ে। গুরুর সাহচর্য ও নিজের চেষ্টা থাকলে রাজ ও ভালো নির্মান করতে পারেন, এই নাটকটি তাঁর উদাহরণ।

মি. জনি

ছবিয়াল রি-ইউনিয়নের ঈদের আয়োজনে রেদোয়ান রনির নাটক ‘মি. জনি’। নির্মাতা হিসেবে রনি মেধাবী হিসেবেই পরিচিত। এই নাটকেও সেটার প্রতিফলন দেখাতে চেষ্টা করেছেন। এক ভ্যান চালক ও তাঁর পালিত পশুর গভীর সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে যার শেষে ফুটে উঠেছে করুণ পরিনতি, সাথে ধর্মীয় কুসংস্কার। অভিনয়ে মুস্তফা মনোয়ার, আব্দুস সামাদ খোকন, জয়িতা নিজেদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তবে নাম ভূমিকায় অভিনয় করা মি. জনি এককথায় অনবদ্য। তবে গল্পের দিকে আরেকটু মনোযোগ দেয়া যেত।

দ্য জেন্টলম্যান

গত প্রায় এক দশক ধরেই টেলিভিশন জগতে শীর্ষ অভিনেতা মোশাররফ করিম। দারুণ অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি তাঁর নাটক যেন দর্শকদের প্রত্যাশা পূর করতে পারছে না। এই ঈদেও তাই। তবে একটা ব্যতিক্রম, পরিচালক হাসান মোরশেদ ওনাকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করেছেন। একজন অসফল রিপ্রেজেন্টিভের গল্প নিয়ে নির্মিত এই নাটকটি মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। নাটকের নাম ‘দ্য জেন্টলম্যান’, মোশাররফ করিমের দারুণ অভিনয়, সাথে ছিলেন অপর্ণা, হুমায়ূন সাধু। পরিচালক হাসান মোরশেদকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাতেই হয়, এই ঈদের অন্যতম সেরা কাজ, পাশাপাশি এই বছর এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত ভাবে দেখা মোশাররফ করিমের সেরা কাজ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।