ফিজেট স্পিনার নিয়ে এত হইচই কেন?

ছেলেবেলায় খেলনার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিলো না, এমন মানুষ পাওয়াও শক্ত। কিন্তু বড় হয়ে যাওয়ার পর সেই আগ্রহের জায়গাটা নিয়ে নেয় বই, টেলিভিশন কিংবা মুঠোফোনটিই। প্রযুক্তির প্রবলতার মাঝেও হঠাৎ করেই চারিদিকে হইচই এক নতুন ধরণের খেলনা নিয়ে, নাম ‘ফিজেট স্পিনার’।

ঠিক কতটা হইচই যদি বুঝাতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়েও এই খেলনাটির অনলাইন জনপ্রিয়তা বেশি। মাপকাঠি দেখে হাস্যকর মনে হলেও গুগলের সার্চলিস্ট তেমনই সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, এই ‘ফিজেট স্পিনার’ আসলে ঠিক কী বস্তু? কিছুদিন আগে আড্ডায় বসে জিজ্ঞেসও করে ফেলেছিলাম, এই বস্তুটা কি খায়, পরে, নাকি মাথায় দেয়? অগত্যা কিছুটা জানতে গুগলের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় রইলো না।

ফিজেট স্পিনার কি?  

‘ফিজেট স্পিনার’ হচ্ছে প্লাস্টিক ও মেটালের সমন্বয়ে তৈরি সহজে বহনযোগ্য একটি ডিভাইস, যার মাঝখানে একটি বিয়ারিং থাকে। ব্রাস, স্টেইনলেস স্টীল, টাইটেনিয়াম, তামা, প্লাস্টিকসহ আরও বিভিন্ন উপাদান দিয়েই তৈরি হয় ফিজেট স্পিনার। স্পিনারটিকে ধরার সুবিধার্থে সেন্ট্রাল বিয়ারিং পয়েন্টের ঠিক মধ্যবিন্দুতে একটা গ্রিপ থাকে যাতে দুই আঙ্গুলের মাধ্যমে স্পিনারটিকে ধরে রাখা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা দিয়ে আসলে কি করে?

ফিজেট স্পিনারের কাজ

প্রাথমিকভাবে (অর্থাৎ, সেই ১৯৯০ সালে) ফিজেট স্পিনার অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্বেগ বা স্নায়বিক অস্থিরতা কমানোর প্রকরণ হিসেবে বাজারে ছাড়া হয়েছিল। অর্থাৎ হাইপারটেন্সিবিলিটি ডিজঅর্ডার ও অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণের সম্ভাব্য খেলনা হিসেবে বাজারে এসেছিল ফিজেট স্পিনার।

আচ্ছা, এটা তো বোঝা গেলো। কিন্তু গত দুই দশকে সেভাবে এর নামটা কেন শোনা যায়নি, এখন কেন এত হইচই? বিশেষত্ব কি এটার?

ফিজেট স্পিনারের বিশেষত্ব

নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের বরাবরই দারুণ আকর্ষণ। ছোটবেলায় চকোলেট-আইসক্রিমের মতো ট্যাবু জিনিসগুলোর প্রতি যেমন আমরা অমোঘ এক আকর্ষণ অনুভব করি, ঠিক তেমনটাই হয় বড়বেলাতেও। কোনো একটা কিছুর কাটতি বাড়ানোর উপায় যেন এটাই, কোনো একটা কিছুকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া। এ ব্যাপারটাই মূলত ‘ফিজেট স্পিনার’ ট্রেন্ডটা শুরু করতে সবচেয়ে বেশি কাজে লেগে গেছে।

২০১৭ সালের শুরুর দিকেও এই খেলনাটির নাম অনেকেই জানতো না, হঠাৎ করেই এটি হয়ে গেছে বেস্ট সেলার খেলনা। কারণ একটাই, যুক্তরাজ্যের সকল স্কুলে ‘ফিজেট স্পিনার’কে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে। ব্যস, ওমনি সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, এটা কি বস্তু সেটা বোঝার জন্য। এরপর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো এর নাম, অতঃপর ট্রেন্ডে পরিণত হতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি আর।

কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, একটা খেলনাকে কেন গোটা একটা দেশে নিষিদ্ধ করে দিতে হবে? আসলে কারণটাও আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা শিশুসুলভই বটে। এই খেলনাটি চালাতে একই সঙ্গে দুই হাতেরই প্রয়োজন, আর এ কারণে ক্লাস চলাকালীন ফিজেট ঘোরাতে গিয়ে গিয়ে ক্লাসে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তো। ফলে ‘পড়াশুনার জন্য ক্ষতিকর’ খেলনা হিসেবে চিহ্নিত করে শুরুতে যুক্তরাজ্যের একটি স্কুল ফিজেট স্পিনারকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করে। পরে ধীরে ধীরে সমগ্র যুক্তরাজ্যেই সমস্ত স্কুলে এই খেলনাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। আর এই নিষিদ্ধ ঘোষণার পরই শুরু হয় যত খামখেয়ালি এবং পাগলামি।

ফিজেট স্পিনারের উদ্ভাবন এবং উপকারিতা

‘দ্য গার্ডিয়ান’ এবং ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’সহ আরও বেশ কিছু সূত্র মারফত জানা গেছে যে ক্যাথেরিন হেটিঙ্গার নামের অরল্যান্ডোনিবাসী একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারই এই খেলনার উদ্ভাবক। তিনি কোনো বিশেষ কোম্পানির সাথে যুক্ত ছিলেন না, যার মাধ্যমে এই খেলনাটিকে এত জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব, আদতে বরং তাঁর বেশ সমস্যাতেই পড়তে হয়েছে এই খেলনা নিয়ে।

তাঁর নামে এই খেলনাটি যখন তিনি প্যাটেন্ট করাতে যান, তিনি এমন একটি যন্ত্র নিয়ে গিয়েছিলেন, যেটা মূলত প্লাস্টিক মোল্ডের তৈরি একটি গোলাকার ডিভাইস, যেটাকে হাত দিয়ে আলতো চাপ দিলেই সেটা ঘুরতে শুরু করে। ডিভাইসটি দেখতে নাকি অনেকটা খেলনা ‘ইউএফও’ কিংবা উদ্ভট ফ্রিজবি (Weird Frisbee)-র মতো ছিলো। নিজের প্যাটেন্ট অ্যাপ্লিকেশনে তিনি এই খেলনার নাম দেন ‘স্পিনিং টয়’।

প্যাটেন্ট করানোর পর তিনি নিজের লন্ড্রী রুমেই এই খেলনা বানাতে শুরু করলেন, তবে সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি। যতদিনে সেটা অবশেষে জনপ্রিয়তার মুখ দেখলো, ততদিনে সেই প্যাটেন্টের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ফলে এই আলোড়ন সৃষ্টিকারী খেলনাটির উদ্ভাবক শেষ পর্যন্ত আর নিজের প্রাপ্য সম্মানটুকু পাচ্ছিলেন না।

তবে সৌভাগ্যক্রমে কতিপয় সাংবাদিক কোনো না কোনোভাবে হেটিঙ্গারের খোঁজ পেয়ে যান এবং সংবাদ করেন, “যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন না ফিজেট স্পিনারের উদ্ভাবক’। সেখানেই জানা যায়, হেটিঙ্গার তাঁর বোনের সাথে দুই দশক আগে ইসরায়েলে ঘুরতে যান। তখনই তিনি খেয়াল করেন, ছোট্ট ছেলেমেয়েরা একে অপরের দিকে পাথর নিক্ষেপ খেলা খেলছে। তখনই তাঁর মাথায় আসে এমন কোনো খেলনার কথা, যা ওই ছোট্ট ছেলেমেয়েগুলোকে এত ভয়াবহ খেলাটি থেকে দূরে রাখবে। এছাড়াও হেটিঙ্গারের কন্যা ম্যাস্টেনিয়া গ্র্যাভিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন, আর তাঁকে অবসাদ থেকে বের করে আনার জন্য প্রয়োজন ছিলো এমন কিছু, যা তাঁকে অন্য কিছুতে ফোকাস করতে সাহায্য করে। ফলে তিনি ডিজাইন করলেন এই ‘স্পিনিং টয়’, যাকে আমরা আজ ‘ফিজেট স্পিনার’ হিসেবে চিনি।

সময় যত অতিক্রান্ত হয়েছে, ফিজেট স্পিনার হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। এর ব্যবহার ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে সার্বজনীন, আরও রোমাঞ্চকর।

  • এটি মানুষের যেকোনো সাধারণ ‘স্ট্রেস’ দূরীকরণে সক্ষম, অন্তত উদ্ভাবক এমন কিছুই দাবি করেছেন।
  • কাজের চাপ কমিয়ে মনকে স্থিতধী রাখাতে ফিজেট স্পিনারের জুড়ি নেই।
  • একঘেয়েমি দূর করতেও এর জুড়ি নেই।
  • মানসিক অস্থিরতাসম্পন্ন এবং বদমেজাজী বাচ্চাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা ও অস্থিরতা কমাতে এটি বেশ কার্যকর।
  • অনবরত পা নাচানো বা দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানোর মতো বাজে অভ্যাস দূর করতেও এটি কার্যকর।
  • যাদের চোখে সমস্যা নেই কিন্তু ফোকাসে সমস্যা আছে, তাদের জন্য ফিজেট স্পিনার একাগ্রতাবর্ধক হিসেবে কাজ করে।

শুধু কি তাই? ফিজেট স্পিনার কে কত জোরে চালাতে পারেন, কতভাবে ফিজেট স্পিনার বানিয়ে ফেলা যায়, কত দ্রুত বানানো যায়, সেসব নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে। একটি ক্রেজ কীভাবে ম্যানিয়াতে পরিণত হতে পারে, তাঁর যোগ্য উদাহরণ হিসেবে ফিজেট স্পিনারকে অনায়াসেই দেখিয়ে দেওয়া চলে।

সতর্কতা

ফিজেট স্পিনার একটি বাচ্চাদের খেলনা, এতে ভয়াবহ কোনো বাজে প্রভাব থাকাটা কিছুটা অস্বাভাবিকই বটে। তবে একেবারেই কোনো বাজে দিক নেই, সেটাও সর্বৈব সত্য নয়। এর ভয়াবহ একটি দিক হলো এর দ্রুতগতি। যেহেতু এই স্পিনার অনেক দ্রুত গতিতে ঘোরে, তাই যেকোনো সময়ে মারাত্মক আহত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফিজেট স্পিনার ব্যবহারের সময় বিভিন্ন শিশুর হাত-পা, এমনকি গলায় মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। ফলে এই স্পিনার ঘুরানোর সময় সাবধান থাকাটা বাঞ্ছনীয়।

এছাড়া এর কিছু প্রোডাক্টে বিষাক্ত সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা বেশ ক্ষতিকর (এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও বটে)। তাছাড়া এতে কখনও কখনও ‘এলইডি’ বাতি ব্যবহার করা হয়, যা ক্ষেত্রবিশেষে অভ্যন্তরীন রক্তক্ষরণের কারণও হতে পারে। এ ব্যাপারে সাবধান থাকা আবশ্যক।

করণীয়

১. বয়সের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। নির্দিষ্ট একটি বয়সসীমার মধ্যে কোনো শিশুর হাতে এই স্পিনার দেওয়া উচিত নয়।

২. কেনাকাটা করা উচিত নির্ভরযোগ্য রিটেইলারদের কাছ থেকে।

৩. নিয়মিতভাবে ফিজেট স্পিনারটিকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, যাতে কোনওমতেই সামান্য ক্ষতিগ্রস্থ বা ভাঙা ফিজেট স্পিনার যেন শিশুর হাতে না পড়ে।

৪. এই স্পিনারের সাথে সংযুক্ত এলইডি বাতির প্রভাব যেন তুলনামূলকভাবে কম পড়ে, সেজন্য যথাসম্ভব ‘লাইট-আপ’ স্পিনারকে এড়িয়ে চলা উচিত।

ওহ হ্যা, আইফোন ব্যবহারকারীরা ‘ফিজেট স্পিনার’ অ্যাপটি ব্যবহার করেছেন কি? সাম্প্রতিক জরিপ থেকে কিন্তু দেখা গেছে, টপ আইফোন অ্যাপ হিসেবে সবার উপরে অবস্থান করছে এই ফিজেট স্পিনার অ্যাপটি। একবার ট্রাই করে দেখাই যায়!

আর যারা নিজেরাই কিনে ফেলতে চান, আর দেরি কিসে? কিনে ফেলুন এক্ষুনি, আর শুরু করে দিন ‘ফিজেট-ক্রেজিনেস’!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।