বাংলাদেশের প্রথম নারী বাস কন্ডাক্টর

বাংলাদেশের প্রথম নারী বাস কন্ডাক্টর কে আপনারা কেউ জানেন ?

জানেন না? কিভাবে জানবেন, খেটে খাওয়া মানুষের কথা সেভাবে কখনও ইতিহাসে লেখা হয় না। তিনি শুধু প্রথম বাস কন্ডাক্টর ছিলেন না। ছিলেন পত্রিকার হকার। ট্রাক ড্রাইভার। রিকশা চালক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাবলিক বাস চালনার অনুমতি চেয়ে চিঠিও লিখেছিলেন। তবে সব কিছুর ওপরে তিনি কবি, একজন অদ্বিতীয় বাঙালি, বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর, তিনি হারলেমের নিগ্রো, তিনি পৃথিবীর সমস্ত সংগ্রামী মানুষের প্রেরণা, তিনি কবি আলেয়া চৌধুরী।

কুমিল্লার চর্থা নামে এক গ্রাম থেকে তাঁর যাত্রা আরম্ভ হয়েছিল সেই ষাটের দশকে। গ্রাম্য সালিশে ফতোয়াবাজদের মুখে আগুন লাগানো পাটখড়ি ছুড়ে দিয়েছিল যে নয় বছরের মেয়েটি, তাঁর লড়াই তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। ঝাড়ু দিয়ে সেদিন তাকে শুধু পেটানো হয়নি। ক্ষতস্থানে লেবুর রস আর লবণ লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। বেধে রাখা হয়েছিল বাড়ির বাইরে। রাতের অন্ধকারে আড়াই টাকা হাতে দিয়ে স্নেহময়ী মা স্বামীর অগোচরে কন্যাকে বলেছিল, জীবন বাঁচাতে শহরে পালিয়ে যেতে।

আলেয়া চৌধুরীর সাথে লেখক মনিজা রহমান

কমলাপুর স্টেশনে শুরু হল এরপর সেই শিশুটির কুলি-মজুর আর কিছু দ্বিপদ জন্তুর সঙ্গে ছন্নছাড়া জীবন। এক বাস ড্রাইভারের মায়া হল মেয়েটির প্রতি। উনি শিশু আলেয়াকে পালক নিলেন। কিন্তু নিয়তি আবারও খেলল মেয়েটিকে নিয়ে। এক সড়ক দুর্ঘটনায় পালিত বাস ড্রাইভার পিতার মৃত্যু হলে মেয়েটির আশ্রয় হল এতিমখানায়।

বাস কন্ডাক্টরের ভূমিকায় যার জীবিকার শুরু, সে ইরান, জার্মানি, বাহামা পৃথিবীর নানা বন্দর ঘুরে এক সময় থিতু হল আমেরিকায়। আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে স্কুলে পড়ার সুযোগ না পেলেও আলেয়া চৌধুরী স্বশিক্ষিত একজন মানুষ। তাঁর কবিতার প্রত্যেকটি শব্দ, প্রত্যেকটি উপমা যেন প্রখর সূর্যালোকের মতো দেদীপ্যমান। শুধু বাংলা নয়, ইংরেজীতেও কবিতা লিখেছেন আলেয়া চৌধুরী।

নিয়তি নির্ধারিত দৈববানীর মতো জীবন তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছে বারবার। নয় বছর বছর বয়সে শুরু হওয়া লড়াই সাতান্ন বছরে এসেও শেষ হয়নি, হয়ত কোনদিনই হবেনা। কিন্তু চার ফুট এগারো ইঞ্চি উচ্চতা নিয়েও আলেয়া চৌধুরী গ্রীক বীর হারকিউলিসের মতো নিরন্তর লড়াই করে চলেছেন নিয়তির বিরুদ্ধে। তাইতো এখনও ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করেও তিনি আর্শ্চয্য সজীব, প্রাণবন্ত একজন মানুষ।

রবিবার সকালে কবি আলেয়া চৌধুরীকে ঘিরে নিউইয়র্কের সুধী সমাজের অন্তরঙ্গ আড্ডায় সবার সরব উপস্থিতি বলে দিয়েছে, তিনি কিভাবে আমাদের অন্তরে আছেন, থাকবেন, তিনি কতখানি অনুপ্রাণিত করেন আমাদের।

আলেয়া আপা, আপনার জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।