প্রতিদান || ওয়েস্টার্ন গল্প

১.

হঠাৎ চলতে চলতে একটা যেনো কাতরানির আওয়াজ পেলো পল রিউগল।বেশ জোরালো কাতরানির শব্দ শুনে বুঝতে পারলো ট্রাকের আশেপাশেই কোথাও থেকে আসছে শব্দটা। নিজের কালো অ্যাপালুসাটা দাঁড় করিয়ে ভালো করে শব্দটা শোনার চেষ্টা করলো পল। বুঝতে পারলো বাঁ-দিক থেকে মেসার ধার ঘেঁষে পাইন বনটা থেকে আসছে আওয়াজ। ট্রাক ছেড়ে বাদিকে ঘোড়াটাকে আগে বাড়ালো পল। কিছুদূর গিয়ে দূরে একটা আগুন দেখতে পেলো। পাশেই একটা লোক কাতরাচ্ছে। কাধের সামান্য নিচে গুলি লেগেছে লোকটার। বলা ভালো যুবক। কত বয়স হতে পারে ছেলেটার? আন্দাজ করার চেষ্টা করলো পল। তেইশ চব্বিশ হবে। উরুর কাছে ঝোলানো হোলস্টার দেখে বুঝলো এই ছেলে বন্দুকবাজ নাহয়ে যায়ই না।

পশ্চিমে ত্রিশ বছর বাস করার সুবাদে পল ভালোই জানে পিস্তল ঝোলানোর এই কায়দাটা। জীবিকার দায়ে ঘুরতে ঘুরতে যখন প্রিস্টন রেজিন নামে ছোট্ট শহরটাতে এসে হাজির হয় ও তখন ওর বয়েস এই ছেলেটার মতই। দৃঢ় সংকল্প, সততা আর পরিশ্রম ওকে এই ত্রিশ বছরে যা দিয়েছে তা হলো এলাকার সবচেয়ে সমৃদ্ধ বাথানের মালিক পল রিউগল।

অ্যাপালুসাটাকে একটা পাইন গাছের সাথে বেধে আগুনের ধারে গিয়ে বসলো পল। ছেলেটার ক্ষত পরিষ্কার করলো। বেশ গভীর ক্ষত। পিছন থেকে গুলি করেছে কোন ব্লাডি কয়োট! ছেলেটার গায়ের তাপ দেখে বুঝলো বেশ জ্বরে ভুগছে ছেলেটা। স্যাডল ব্যাগ থেকে কিছু খাবার এনে খাওয়ালো ছেলেটাকে। তারপর পানি খাওয়ালো। শেষে নিজে কিছু খেয়ে একটু তফাতে গিয়ে বসলো।

বনের মধ্যে এরকম একটা গুহা কি করে খুঁজে পেলো জখম ছেলেটা তা ভেবে পেলো না পল। ভাগ্য ভালো ছেলেটার গায়ে গুলি রয়ে যায় নি। বেরিয়ে গেছে কিছুটা মাংস ভেদ করে। আরেকটু বামে গুলিটা লাগলেই আর দেখতে হতো না। কি করবে তা ভেবে পেলো না পল। শহরে যাবার জন্য নিজের র‍্যাঞ্চ থেকে বেরিয়েছিলো। প্রায় ত্রিশ মাইল এলাকা জুড়ে ওর র‍্যাঞ্চ। পুরো পশ্চিমেই এত বড় র‍্যাঞ্চ খুব কম আছে। ওর র‍্যাঞ্চের শেষ সীমানা থেকে থেকে তিন ক্রোশ পথ প্রিস্টন রেজিনের। শহরে ওর একটা হোটেল আছে। সেখানেই যাচ্ছিলো ও। বেশ কিছু দরকারি কাজ ছিলো শহরে।

‘ধুরর! নিকুচি করি কাজের। ছেলেটাকে বাঁচাতে হবে’ বিড় বিড় করে বললো পল রিউগল।

পরবর্তী দু দিনে ছেলেটা স্বজ্ঞানে থাকেইনি বলতে গেলে। জ্বরও কমে নি। পল যথাসাধ্য সেবা করেছে ছেলেটার। তিন দিনের দিন ছেলেটা কিছুটা সুস্থ হলো। চোখ মেলে তাকিয়ে পল রিউগলকে দেখলো ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে হাসিমুখে।

‘জ্ঞান ফিরলো তাহলে তোমার!’ ‘আমি তো ভাবছিলাম আর কতদিন না জানি তোমার সেবা করা লাগে’

‘ধন্যবাদ। কিভাবে যে তোমার ঋণ শোধ করবো!’ ফিসফিসে গলায় উঠতে উঠতে বললো ছেলেটা।

‘আহা! উঠো না বাছা। একটু রেস্ট নাও। কিছু খাবে এখন? নাও, একটু রুটি আর মাংস খাও।আমি বরং একটু কফি চড়াই’ বলে ছেলেটার দিকে চারটে রুটি আর বড় এক চাকা মাংস এগিয়ে দিয়ে কফি চড়াতে বসলো পল। তারপর কফি হয়ে গেলে কিছুটা কফি এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘আমি পল রিউগল। সার্কেল পি নামে একটা র‍্যাঞ্চ আছে আমার’

‘আমি বিল। নাম শুনেছি তোমার র‍্যাঞ্চের।’

‘কোত্থেকে এসেছো? গুলি লাগালে কিভাবে গায়ে?’

‘টেক্সাস থেকে। তোমাদের শহরে একটা সেল্যুনে কথা কাটাকাটি হলো এক লোকের সাথে। বের হয়ে উত্তরে কিছুদুর আসতেই একটা খোলা জায়গায় ছোট একটা পাহাড় থেকে অ্যামবুশ করলো কেউ!’

‘বলো কি! শেরিফকে জানানো দরকার।শহরে যাবে আমার সাথে?’

‘নাহ। গোলমালে জড়াতে চাই না আর। চলে যাবো ভাবছি’

‘তোমার যদি কাজের দরকার হয় তাহলে বলবো আমি কিছু কাউহ্যান্ড নিচ্ছি।যোগ দিতে পারো আমার র‍্যাঞ্চে। থাকা খাওয়া ফ্রি আর মাস গেলে চল্লিশ ডলার পাবে।’

‘ধন্যবাদ। কিন্তু আপাতত এখানে থাকার ইচ্ছে নেই। তবে ফিরে আসবো কোন একদিন। সেদিন ওই লোকটাকেও খুঁজে বের করবো।আর পারি তো তোমার ঋন জান দিয়ে হলেও শোধ করবো। কিন্তু এখন ফিরতেই হবে আমার।’

‘তাহলে আর কি।আমার র‍্যাঞ্চ অবধি চলো। একটা ভালো জাতের ঘোড়া বেছে নিয়ে যে দিক পারো যাও।তবে এবার মাথার পেছনেও একটা চোখ রেখো বাছা।’

২.

ক্যানিয়নটাকে পাশ কাটিয়ে একটা জুতসই জায়গা বাছলো লোকটা। রীজের ধারে পছন্দ সই একটা জায়গা পেয়ে স্ট্যালিয়নটাকে ঘন ঘাসের বনে ঘাস ছেড়ে দিলো। তারপর একটা আগুন জ্বেলে কিছুটা কফি বানিয়ে নিয়ে বসলো। স্ট্যালিয়নটার সাথে কথা শুরু করলো,

‘বুঝলি নিগ, আসতে একটু দেরীই হয়ে গেলো বোধহয়। শুনেছি পল রিউগল বিপদে পড়েছে। অবশেষে ঋণ শোধ করবার একটা সুযোগ পেলাম রে।’

ঘোড়াটা কি বুঝলো কে জানে। চিঁহিঁহিঁ করে ডেকে উঠলো। তারপর ভাবলো লোকটা এখানে নিশ্চই এখনো ওর নাম পৌঁছায়নি। বিল হিকক।নামটাই ওর সবথেকে বড় শত্রু। ওকে মেরে রাতারাতি বিখ্যাত হতে চায় এমন লোকের অভাব নেই দেশে। সব আউট ল’ এমনকি অনেক ল’ম্যানও প্রমাণ করতে চায় তারা হিককের চেয়ে ক্ষিপ্র বন্দুকবাজ। ক্যালিফোর্নিয়া তে থাকা অবস্থায় ওর কানে যায় ওর একদিনের সেভিয়র পল রিউগল বিপদে পড়েছে। সাথে সাথে বেরিয়ে পড়ে ও প্রিস্টন রেজিনের উদ্দেশ্যে। এখন শহর থেকে মোটামুটি চার ক্রোশ দূরে আছে, ভাবলো হিকক।

পরক্ষনেই মনে পড়লো জুয়ানিতার কথা। মেয়েটাকে একপলক দেখতে প্রান বেরিয়ে যাচ্ছে ওর। সেই লাইভ ওক কান্ট্রি থেকে একসাথে আছে ওরা। হিকক প্রিস্টনে আসবে শুনে গোঁ ধরে বসলো সেও আসবে। শেষে বাধ্য হয়ে মেহলারের সাথে ওকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছে হিকক। প্রিস্টনে স্যেলুন খুলে বসেছে। অবশ্য বিপদের আশংকা করছে না হিকক। ক্রিস মেহলার নামের ইয়াকু ইন্ডিয়ান প্রয়োজনে নিজের জান দিয়ে রক্ষা করবে নিতাকে। বন্ধুর বিপদে সবসময় অকস্মাৎ হাজির হয়েছে হিকক। আবার কেউ কিছু বোঝবার আগেই চোখের পলকে সব সমাধান করে মিলিয়ে যায় তল্পিতল্পা গুটিয়ে। শেষে এসব ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেলো হিককের।

৩.

‘বাবা, আমাদের দু হাজার গরু স্ট্যাম্পিড করেছে কেউ!’ ঘোড়া থেকে নেমেই বললো নেইল রিউগল।

‘কেউ বলছো কেনো! বলো ওই ইবলিশ টা করেছে এই জঘন্য কাজ।’ দাত খিঁচিয়ে বললো বুড়ো রিউগল।

‘আমি বলি কি, বাবা ও যা বলছে তা মেনে নাও। বেচে দাও র‍্যাঞ্চ টা। আমাদের তিনজন কাউহ্যান্ড মারা পড়েছে। এত লস করিয়ে দিচ্ছে। এখন গরু স্ট্যাম্পিড করেছে। আর কত বাবা! আমরা অন্য কোথাও র‍্যাঞ্চ কিনবো। রাজি হয়ে যাও বাবা’

‘কাপুরুষের মত কথা বলো না নেইল। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তিলে তিলে সার্কেল পি কে গড়ে তুলেছি আমি। এক ছটাক জায়গাও আমি ছাড়বো না’

‘আমাদের সব কাউহ্যান্ড নিরীহ বাবা। ওরা হাওয়ার্ডের ওই ভাড়াটে খুনিগুলোর সামনে দাড়াতেই পারবে না।এখন আমাদের দরকার হিকক,থর্প,সাডেনের মত কাউকে। বন্দুকবাজ’

‘দরকার হলে তাই আনবো আমি। কিন্তু র‍্যাঞ্চ ছাড়বো না।’

কিছুক্ষণ গোয়াড় বাপের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কোরালে গিয়ে ঘোড়াটা বেধে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেলো নেইল।

৪.

আর থাকতে না পেরে শহরে চলে এলো হিকক।নিতাকে না দেখে আর থাকতে পারছে না ও। শহরে এসেই নিতার স্যেলুনে ঢুকে দেখলো মেহলার বারের ওপাশে বসে আছে। হিকক ঢুকতেই মেহলার ছোট করে একটা নড করলো ওকে।বারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো হিকক।

‘ও কোথায়?’

‘ভিতরে সিনর। ওর মন বলছিলো তুমি নাকি আজ আসবে। এখনও ওর রুম থেকে বের হয়নি।’

‘ওকে একটু পরে খবর দিয়ো। এখন বলো এদিকের কি খবর?’

‘আমরা আসার পর যতটুকু জানতে পেরেছি তা হল। টম হাওয়ার্ড নামে এক লোক বছর তিনেক আগে এখানে এসে হাজির হয়েছে। ছোটখাটো সব র‍্যাঞ্চ কিনে নিয়েছে। এখন ওর নজর পড়েছে সার্কেল পির উপর। রিউগলের র‍্যাঞ্চ কিনে নিতে চায়। সার্কেল পির তিনজন কাউহ্যান্ড মারা পড়েছে বক্স এইচ এর ভাড়াটে পিস্তলবাজদের হাতে। গতকাল সার্কেলপির বিশাল গরুর পাল স্ট্যাম্পিড করেছে বক্স এইচ। ’

‘রেঞ্জ ও’অর শুরু হয়ে গেছে তাহলে?’ প্রশ্ন করলো হিকক।

‘তা বলতে পারো। অবশ্য এক পাক্ষিক। কারণ রিউগলের পক্ষ থেকে কোন আক্রমন বা প্রতিরোধ গড়া সম্ভব না। ওর কাউহ্যান্ডরা কেউ বন্দুকবাজ না’ উত্তর দিলো ইন্ডিয়ান।

‘শেরিফ কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেনো?’ পালটা প্রশ্ন করলো হিকক।

‘বিক্রি হয়ে গেছে শেরিফ পিট রিডল। আর তাছাড়া লোকটা মেরুদণ্ডহীন কয়োট একটা।’

‘এই তাহলে পরিস্থিতি।আচ্ছা এত জমি কিনছে কেনো হঠাৎ করে লোকটা? তাও জবরদস্তি করে?’

‘কেউ ঠিক করে বলতে পারে না। তবে কানাঘুষো সোনা যায় এই অঞ্চলে সোনার খনির একটা মাদার ফেজ আছে। সেটা হাত করতে চায় হাওয়ার্ড।’

‘এতক্ষণে ব্যাপারটা তাহলে বোঝা গেলো।’

‘হাওয়ার্রডের লোকবল কেমন?’ আবার প্রশ্ন করলো হিকক।

‘পনেরো-ষোলো জন গান হ্যান্ড ভাড়া করেছে। সবথেকে বিপজ্জনক ওর ফোরম্যান নিক হাওয়ার্ড। ওর একমাত্র ছেলে। ওই মূলত ব্যবসাটা দেখে। সিনোরিটার উপর নজর আছে লোকটার’

এই একটা কথাই জানি ধপ করে জ্বলে উঠলো হিককের বুকে! নিতার প্রতি নজর দিয়ে লোকটা!

এমন সময়ে স্যেলুনে প্রবেশ করলো স্বয়ং নিক হাওয়ার্ড।সাথে চারজন কাউহ্যান্ড আর মার্শাল জেরেমি সিস্টো।

‘কনর, রাস্টি, এরিকসন, ডীন। চারজনই পিস্তলে চালু সিনর।’ সাবধান করলো মাঝবয়েসী ইয়াকু ইন্ডিয়ান।

হিকক খেয়াল করলো বারের কাছেই একটা টেবিলে সাঙ্গপাঙ্গ দের নিয়ে বসলো নিক হাওয়ার্ড।এমন সময়ে দরজা খুলে নিজের ঘর থেকে বেরোলো জুয়ানিতা। হিককের উপর চোখ পড়তেই আনন্দ আর বিষ্ময়ের ঝিলিক খেলে গেলো মেয়েটার মুখে। এমন সময় নিকের টেবিল থেকে অর্ডার এলো,

‘আমাদের পাঁচটা হুইস্কি দিয়ো মিস. জুয়ারেজ’ কন্ঠটা নিক হাওয়ার্ডের।

‘আজকে ক্রিস তোমাদের পরিবেশন করবে’ উত্তর দিলো মেয়েটা।

‘তোমার ওই সুন্দর হাতে পরিবেশন করলে স্বাদটাই বেড়ে যায় মিস। আমরা তোমার হাত থেকেই চাই।’

‘আচ্ছা দিচ্ছি’

হুইস্কির বোতল আর গ্লাস এগিয়ে দিলো জুয়ানিতা টেবিলের দিকে। তখনই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব এলো,

‘আজকে তুমি আমাদের সাথে পান করো না?’ আকুতি বক্স এইচ ফোরম্যানের।

‘দু:খিত। খদ্দেরদের সাথে পান করি না আমি।’ বলেই ঘুরে চলে আসতে চাইলো। কিন্তু হাত ধরে ফেললো নিক।

‘আজকে তুমি আমাদের সাথেই পান করবে মিস জুয়ারেজ’

জুয়ানিতা আড়চোখে দেখলো হিকক এগিয়ে আসছে। হঠাৎ গমগমে কন্ঠস্বরে বলে উঠলো, ‘এই লেডি তোমার সাথে পান করতে চাইছে না। ওর হাতটা ছাড়ো’ স্পষ্টই কর্তৃত্বের আভাস!

গা জ্বলে গেলো নিকের। একটা মামুলি পাঞ্চার আমাকে আদেশ দেয়! বক্স এইচ ফোরম্যান কে? যে কিনা ভবিষ্যতে বক্স এইচের মালিক হতে চাইছে! আশেপাশে গুঞ্জন উঠলো। পশ্চিমের বাঁধাধরা জীবনে খুব বেশী উত্তেজনাকর মূহুর্ত আসে না। কেউ একজন বললো

‘আজকে কপালে খারাবি আছে স্ট্রেঞ্জারের’

পাশ থেকে বুড়ো কার্টার বললো, ‘আমার তো মনে হয় ভুল জায়গাতে হাত দিয়েছে এবার নিক হাওয়ার্ড’

কথাটা কানে গেলো বক্সএইচ ফোরম্যানের। ও বলে উঠলো, ‘তোমাকে এর মধ্যে নাক গলাতে বলেছে কে কার্টার? নিজের বুকে বুলেটের গর্ত দেখতে চাও নাকি?’

চুপ হয়ে গেলো কার্টার। যে জায়গায় জমে গেলো।

‘আর তুমি, হেই স্ট্রেঞ্জার। আমার ব্যাপারে নাক গলাবার শাস্তি তুমি পাবে!’ আবার বলে উঠলো নিক হাওয়ার্ড। ঠিক তখনই পাশ থেকে একজন বলে উঠলো, ‘সাবধান নিক, এই লোকের নাম বিল হিকক!’

জায়গাতে আড়ষ্ট হয়ে গেলো নিক হাওয়ার্ড। সাবধান করা লোকটার দিকে চাইলো হিকক। চিনতে পারলো পরক্ষনেই!অজ্ঞাত অ্যামবুশকারীকে চিনতে পেরেছে হিকক। এরিকসন তাহলে সেই লোক!

এদিকে নিকের মনে চিন্তার ঝড় বইছে। লোকে যা বলে পিস্তলে কি অতটাও চালু ও? ওকে খুন করতে পারলে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাবে নিক। সেই তাড়নাতেই কিনা সব ভয় দূরে ঠেলে হোলস্টারের দিকে হাত বাড়ালো নিক। কেবল পিস্তলের বাটে হাত ঠেকিয়েছে এমন সময় দেখলো অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় হিককের হাতে পিস্তল উঠে এসেছে। কেউ বুঝতেই পারলো না কখন পিস্তল তুলে নিয়েছে হিকক। বুকে পরপর দুবার ধাক্কা অনুভব করলো নিক হাওয়ার্ড।দুবার গুলি ছুড়েছে হিকক কিন্তু এতই দ্রুত যে মনে হলো আদতে একটাই গুলি ছুড়েছে।

এবার এরিকসনের দিকে ফিরলো হিকক।

‘আমাকে পিছন থেকে গুলি করেছিলে তুমি, এরিকসন!’

‘মিথ্যে কথা। হাতে পিস্তল নিয়ে অমন কথা অনেকেই বলতে পারে বিল। আসলে পিস্তল ছাড়া তোমার কানাকড়িও মূল্য নেই।’

‘তাই? হাতাহাতির আমন্ত্রণ জানাচ্ছো?’

পরবর্তী দশমিনিটে যা ঘটলো তা অবিশ্বাস্য। বিল হিকক খালি হাতেই পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে দিলো এরিকসনকে। পরে চোরাগোপ্তা গুলি ছুড়তে যেয়ে মেহলারের গুলিতে মারা পড়লো।

ইয়াকু ইন্ডিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে নড করলো হিকক।চোখে রাজ্যের কৃতজ্ঞতা। এবার ফিরলো উৎসুক জনতার দিকে।

‘এই যে মার্শাল’, সিস্টোর দিকে ফিরলো হিকক।

‘তুমি নিজের চোখে দেখেছো দুজনকেই ন্যায্যর থেকে অনেক বেশী সুযোগ দিয়েছি আমি। আর ওই নিক, এখানে হুট করে এসে ত্রাস কায়েম করে ফেলেছিলো। আমার তো মনে হয় ও মরে যাওয়াতে এখানে সবাই খুশীই হবে। আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আছে তোমার?’

‘নাহ! সবাই দেখেছে ওটা ফেয়ার ফাইট ছিলো।’ হিককে সমর্থন দিয়ে বস্তুত নিজের টলে যাওয়া চেয়ার রক্ষা করলো মার্শাল উপস্থিত জনতার সামনে।’

৫.

পরবর্তী একসপ্তাহে বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেলো প্রিস্টন রেজিনে। হিককের ভয়ে শহর ছেড়ে ভেগেছে হাওয়ার্ডের পোষা পিস্তলবাজেরা। আর বুড়ো হাওয়ার্ড পুত্রশোকে মৃত্যুশয্যা নিয়েছে। প্রিস্টন রেজিন এখন শান্ত, নীরব। শান্তি ফিরে এসেছে আবার। স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যও দেখা যাচ্ছে। এমনই একদিন সার্কেল পির রাঞ্চ হাউজের উঠোনে পা রাখলো বিখ্যাত একটা ব্লাক স্ট্যালিয়ন।মালিকের কল্যানে নিজেও বিখ্যাত হয়ে গেছে ঘোড়াটা।

‘বুঝলি নিগ,অনেক দিন পর বুড়োর সাথে দেখা।চিনতে পারবে আমাদের?’ ঘোড়াটার পিঠ থেকে নামতে নামতে বললো হিকক।

র‍্যাঞ্চ হাউজের উঠানে তখন দেখা গেলো বুড়ো রিউগল আর তার ছেলেকে।

‘আরে বিল যে! কত্তদিন পরে দেখা! হঠাৎ এদিকে?’

‘কেনো খুশী হওনি নাকি!’

‘কি যে বলো! আরে আমার দেয়া ঘোড়াটা এখনো রেখেছো দেখছি’

‘শুনলাম বিপদে পড়েছো?’ কৌতুকের আভাস দীর্ঘদেহি গানম্যানের মুখে।

‘তা ঠিকই শুনেছো। তবে কি জানো বাছা, আমাদের এই অখ্যাত শহরে বিখ্যাত বিল হিকক এসে সব ঠান্ডা করে দিলো। এখন ভেতরে এসো দেখি।লাঞ্চ করবে আমাদের সাথে’ সাদর আমন্ত্রন বুড়ো র‍্যাঞ্চারের।

‘বুঝলে নেইল, তোমার বাবা আমাকে প্রাণে বাঁচালো, খাবার দিলো, ঘোড়া দিলো, এখন আবার খাওয়াতে চাইছে। এই বুড়ো আমাকে ঋণের ভারে চ্যাপ্টা করে ফেলবে দেখছি!’ আবারো কৌতুকের আভাস হিককের।

‘আসলে আমার বাবা এমনই।’ সহাস্য উত্তর নেইল রিউগলের।

এমন সময় সার্কেলপি ফোরম্যান ঢুকলো র‍্যাঞ্চ হাউজে। কেনেডির সাথে দীর্ঘ দিনের পরিচয় হিককের। হিককে দেখেই বলে উঠলো, ‘মাই গড! হিকক! তুমি!’

সাথে সাথে হাসি মিলিয়ে বিষ্ময় দেখা দিলো রিউগল পিতাপুত্রের মুখে।

‘তুমিই সেই বিল হিকক!’ প্রশ্ন র‍্যাঞ্চারের।

‘হ্যা, ওটাই আমার নাম’ হেসে উত্তর দিলো হিকক।

‘প্রতিদান দেবার জন্য ছুটে এসছিলে তুমি। না?’

‘প্রতিদান? আমি তো বলি বন্ধুত্ব। বন্ধুর বিপদে হিকক বসে থাকে না এতো সবাই জানে’

‘হিককের বন্ধু! সেদিনের সেই পাইনবনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকা ছেলেটা বিল হিকক!’ বিড় বিড় করে বললো বুড়ো রিউগল। তার সারা জীবনের পরিশ্রমের ফসল রক্ষা করেছে হিকক। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে। শুধু বন্ধুত্বের প্রতিদানে! অবশ্য পশ্চিমে আসার পর রিউগল জেনেছে এ দেশের মানুষ মুখে ধন্যবাদ দেবার থেকে জান দিয়ে প্রতিদান দিতেই অভ্যস্ত। আপাত কঠিন লোকগুলোর কাছে বন্ধুত্বের মর্যাদার গুরুত্ব সবথেকে বেশী। একটা শীতল শান্তির আবেশ বয়ে গেলো র‍্যাঞ্চারের দেহে। সাথে চোখ বেয়ে গড়ালো একফোঁটা অশ্রু।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।