পেটেন্ট ছিনিয়ে নেওয়ার ওস্তাদ

টমাস আলভা এডিসনকে আমরা চিনি বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক হিসেবে৷ বৈদ্যতিক ব্যবস্থা উন্নতিকরণের কারণেও তিনি বিখ্যাত৷ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আবিষ্কারের পেটেন্টধারী বিজ্ঞানী তিনি৷ তাঁর পেটেন্টের সংখ্যা প্রায় ১০০০৷ আমরা সবাই তাকে খুবই সম্মানের সাথে স্মরণ করি৷ কিন্তু এডিসন ছিলেন পুরোদস্তুর একজন চালাক ব্যাবসায়ী৷ বিশাল এক কর্পোরেশন ব্যবসার মালিক ছিলেন আর ছিল তার প্রচুর টাকা৷ তার মতো চতুর ব্যবসায়ী বিজ্ঞানী ইতিহাসের পাতায় কেউ ছিলেন কিনা সন্দেহ৷

তিনি দুস্থ গরিব বিজ্ঞানীদের দারিদ্রতার সুযোগে তার কোম্পানিতে চাকরি করার সুযোগ দিতেন এবং তাদের আবিষ্কার গুলোকে টাকা দিয়ে কিনে নিজের নামে চালিয়ে দিতেন৷  যদি কেউ রাজি না হতো তবে তিনি তার নিজের গুন্ডাবাহিনী দিয়ে তাদের সাইজ করে তবেই তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতেন৷ তাঁর ১০০০ পেটেন্টের সবগুলোই কোন না কোন ভাবে অন্যের কাছ থেকে কেনা অথবা জোর করে ছিনিয়ে নেয়া৷ নিকোলাস টেসলার সাথে একবার তাঁর দ্বন্ধ লেগে গিয়েছিল৷ সেই কাহিনী জানার আগে নিকোলাস টেসলা সম্পর্কে একটু জেনে নেই৷

নিকোলাস টেসলাকে হয়তো অনেকেই চিনি না৷ একাদশ শ্রেণীতে চৌম্বকক্ষেত্রের একক পড়ার সময় হয়তো সবাই টেসলা নামটার সাথে পরিচিত হয়েছিলেন৷ টেসলা ছিল এমন একজন বিজ্ঞানী যাকে বলা হয় ‘অসময়ে জন্ম গ্রহণ করা’। সময়ের অনেক আগেই তিনি জন্মেছিলেন বলে তাঁর আবিষ্কার গুলোর তাৎপর্য ঐসময়ের মানুষেরা বুঝতে পারে নি৷ বর্তমান যুগ অনেকটাই অচল তাঁর আবিষ্কার ছাড়া৷ কয়েকটা উদাহরন দিলে বুঝবেন৷

টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, রোবট, রিমোট, জলবিদ্যুত, জেনারেটর, স্পার্গ প্লাগ আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে তাঁর অবদান৷ টেসলা এমন একজন বিজ্ঞানী যিনি তাঁর আবিষ্কারের জন্য কোন কৃতিত্ব পাননি৷ অন্য বিজ্ঞানীরা তাঁর মৌলিক তত্ত্বগুলো একটু এদিক ওদিক করে, একটু বর্ধিত করে ইতিহাসের পাতায় আবিষ্কারকের নাম নিয়ে সম্মানিত হয়ে আছেন৷

১৮৮৪ সালে টেসলা এডিসনের কোম্পানিতে চাকরি করা শুরু করেন৷ এডিসন তখন ফ্লুরোসেন্ট বাতি নিয়ে কাজ করছিলেন৷ কিন্তু আশানুরুপ ফল পাচ্ছিলেন না৷ সেই সময়ে টেসলা বলেন যে আরো অল্পসময়ে ও আরো কার্যকর ভাবে তিনি ফ্লুরোসেন্ট বাতির কাজ শেষ করতে পারবেন৷ এডিসন বলেন যদি টেসলা কাজটি করতে পারে তবে তিনি তাকে ৫০০০০ ডলার পুরষ্কার দেবেন৷ টেসলা কাজে নেমে পড়েন৷

কিছু দিন পর তিনি সফল হন৷ যখন এডিসনের কাছে যান টাকার জন্য৷ এডিসন তো টাকা দেন নি বরং সে পেটেন্টটি নিজের নামে করে ফেলেছিলেন৷ আজকের দিনে আমরা ফ্লুরোসেন্ট বাতির জনক হিসেবে এডিসনকেই চিনি৷ সেই দুঃখে টেসলা এডিসনের কোম্পানী ছেড়ে চলে যান৷ আরেকটি কোম্পানিতে গিয়ে যোগ দেন৷ এরপরই টেসলা আবিষ্কার করেন আমাদের বাসাবাড়িতে বহুল ব্যবহৃত এসি কারেন্ট৷ তখন বাজারে চলছিল এডিসনের ডিসি কারেন্ট৷

এই নিয়ে আবার দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়েন এডিসন টেসলা৷ কার্যকরীভাবে এখন আমরা জানি ডিসি কারেন্টের চেয়ে এসি কারেন্টই আমাদের জন্য সুবিধা কারন ডিসি কারেন্টে দরকার হয় আলাদা আলাদা পাওয়ার প্ল্যান্ট৷কিন্তু এসি কারেন্টে এক পাওয়ার প্ল্যান্ট দিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়৷ সোজা কথায়  এসি কারেন্টের কল্যাণেই বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে৷ ডিসি কারেন্ট যদি এখনো প্রচলিত থাকতো তবে প্রতিটি বাসাতেই একটি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থাকা লাগত৷

যাই হোক, এই এসি কারেন্ট যাতে বাজারে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য এডিসন কুটিল ব্যবসায়িক চাল চালা শুরু করেন৷ তিনি মানুষকে বুঝাতে লাগলেন এসি কারেন্ট বিপদজ্জক৷ তিনি এসি কারেন্টের নাম দিলেন ‘ডেথ কারেন্ট’৷ লোকাল ছেলেদের জনপ্রতি ২৫ সেন্ট দিয়ে কুকুর আর বেড়াল জোগার করতে বললেন৷ সেই কুকুর বেড়াল এমনকি হাতিসহ জনসম্মুখে টেসলার এসি কারেন্ট দিয়ে মারতে শুরু করলেন৷

মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইলেন৷ কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, ডিসি কারেন্টের চেয়ে এসি কারেন্টের জনপ্রিয়তা বাড়তেই লাগলো৷দুঃখের ব্যাপার হলো টেসলা এসি কারেন্টের পেটেন্টের ভাগিদারও হতে পারলেন না৷ তাঁর এই পেটেন্টও ছিনিয়ে নিয়েছিল কোম্পানি প্রধান৷

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।