পাগল না হলে কেউ লেখালেখি করে না: রাজীব হাসান

রাজীব হাসান‚ একাধারে একজন লেখক এবং সাংবাদিক। বর্তমানে বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। তবে সাংবাদিকতার পাশাপাশি ইতোমধ্যে একজন লেখক হিসেবেও সবার কাছে সমাদৃত হয়েছেন তিনি। কিছুদিন আগেই তার প্রথম উপন্যাস ‘হরিপদ ও গেলিয়েন’-এর জন্য কালি ও কলম পুরুষ্কার পেয়েছেন এই তরুণ লেখক।

এবারের বইমেলায় প্রথমা প্রকাশনী থেকে তাঁর নতুন উপন্যাস ‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল’ উপন্যাসটি আজ প্রকাশি হল। নতুন এ উপন্যাস নিয়েই লেখক রাজীব হাসানের মুখোমুখি হয়েছে অলিগলি.কম।

কেমন আছেন?

– প্রশ্নটার স্বাভাবিক উত্তর হলো ‘ভালো আছি’। তবে আমি নিজে স্বাভাবিক অবস্থায় নাই। কয়েকটা পরস্পর বিপরীতমুখী অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে একই সময়ে যেতে হচ্ছে। পেশাগত জীবনে ক্রীড়া সাংবাদিক। ভয়ংকর ব্যস্ততা চলছে বাংলাদেশের খেলা নিয়ে। আবার নেশাগত জীবনে লেখক। নেশাগত এই জন্য বললাম, পাগল না হলে কেউ লেখালেখি করে না। এই জন্য দেখবেন প্রত্যেক লেখকের মধ্যে এক ধরনের পাগলামি আছে। এই পাগলদের জন্য বইমেলা হলো ‘নদে আসা’। আবার পাঠকেরাও এক ধরনের পাগল। তাই ‘তোরা কেউ যাস নে ও পাগলের কাছে’র বারণ শুনিয়ে লাভ নেই।

এই সময়ে পাঠকেরা কাছাকাছি আসে, খোঁজখবর নেয়। ভালো লাগে। ব্যস্ততা, ভালো লাগার পাশাপাশি আরেকটা অনুভূতি হলো ঘোর। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের জন্য কালি ও কলম পুরস্কার পেয়েছি। এটা তরুণদের জন্য বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। মাত্রই সেটা হাতে পেলাম, ঘোরটা কাটেনি। আর বইমেলায় নতুন বই নিয়ে রোমাঞ্চ হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে টেনশন। ভালো আছি, টেনশনে আছি, ঘোরের মধ্যে আছি, আবার ভয়ের মধ্যেও।

টেনশন কেন? একজন লেখকের কাছে আরও মানসম্মত লেখা লেখার জন্য এ ধরনের পুরস্কার তো অনুপ্রেরণা জোগায়?

– একজন খুব কাছের ছোট ভাই আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, বাহ ভাই, প্রথম উপন্যাস লিখেই প্রথম পুরস্কার পেয়ে গেলেন! ওকে বলেছিলাম, হরিপদ ও গেলিয়েনের জন্য এটা আমার দ্বিতীয় পুরস্কার। প্রথম পুরস্কার তো অবশ্যই পাঠকেরা আমাকে যেভাবে গ্রহণ করেছে। বিনয় বা ভাব দেখানো নয়; আমি সত্যি বলছি, হরিপদ ও গেলিয়েনের চারটা সংস্করণ বের হবে, কল্পনাও করিনি। এরপর কালি ও কলম পুরস্কার! এই দুই মিলিয়ে আমাকে একটা ভয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কেউ যেন প্রত্যাশা না করে আমি অনেক বড় মাপের বা অনেক প্রতিশ্রুতিশীল লেখক। আমি খুবই সাধারণ গদ্য লিখি। আমার গদ্যটা আমার মায়ের আটপৌরে শাড়ির মতো, যার আঁচলে হয়তো একটু হলুদের গন্ধ, একটুখানি ঘাম, আড়ালের কান্না। আমার ভয়টা তাই ‘পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক’ তকমাটার জন্য কেউ কেউ না আবার আমার কাছ থেকে মহৎ সাহিত্য প্রত্যাশা করে বসে।

 

হরিপদ ও গেলিয়েন লিখবার সময় কখনো কি মনে হয়েছিল উপন্যাসটি আপনাকে পাঠকদের এই বিপুল ভালোবাসা এনে দিতে সক্ষম?

– গত মেলায় হরিপদ ও গেলিয়েন আসার কথাই ছিল না। আমি আসলে দুই কি তিন বছর আগে আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল শিরোনামে একটা উপন্যাস লিখে ফেলি। প্রকাশক আদর্শ সেটার প্রথম দুই অধ্যায় ছাপিয়ে বুকলেটও বের করেছিল প্রচারের জন্য। বইমেলার ঠিক আগমুহূর্তে আমার মনে হলো, যা বলতে চেয়েছিলাম বলা হয়নি। বইটা তখন করাই হয়নি।

গত বছর প্রথমার প্রধান নির্বাহী রাশেদ ভাই আমার কাছে কিশোর উপন্যাস চাইলেন। আমি ভাবলাম বাঘটাই দিয়ে দিই একটু ঘঁষেমেজে কিশোর উপযোগী করে। পাণ্ডুলিপি নিয়ে কয়েক দিন যুদ্ধ করার পর বুঝলাম, একবার লিখে ফেললে গল্পের ধরনটা এত কম সময়ে বদলানো কঠিন। তখন তাড়াহুড়ো করে হরিপদ ও গেলিয়েন লিখেছি। মাত্র ৫ দিনে।

তখন লিখে তৃপ্তি পাইনি মোটেও। আমার লেখা পরে রাশেদ ভাই নিজে সম্পাদনা করেন। উনি আমাকে আমার কৈশোর থেকে চেনেন। প্রত্যাশামতো না লিখলে বকাঝকা করেন। হরিপদ সম্পাদনা করার সময় বেশ প্রশংসা করেছিলেন, তবে তাঁর কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। আমি সেগুলো নিয়ে আবার ভাবলাম। কিছু অদল-বদল আনলাম। তারপর লেখাটা নিয়ে তৃপ্তি এসেছিল। মনে হয়েছিল, কিছু একটা হয়েছে। তবে বইটা এত বিপুল জনপ্রিয়তা পাবে, বুঝিনি।

সাহিত্য অঙ্গনে আমার যাঁরা সিনিয়র তাঁদের একজন বলেছেন, ‘একই বই দিয়ে পাঠক আর সমালোচকের মন জেতা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমি সেটা পেরেছি।’ সাধারণত দেখবেন জনপ্রিয় উপন্যাসগুলো পুরস্কৃত হয় না, খুবই রেয়ার। আসলে সবাই সাহস দিচ্ছেন, অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন বুঝতে পারছি।

এবারের আপনার নতুন উপন্যাস ‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল’। যদি জিজ্ঞেস করি হরিপদ ও গেলিয়েন এবং এবারের উপন্যাসটির মাঝে কোনটিকে এগিয়ে রাখবেন?

– সাহিত্য তো আসলে নিক্তি মেপে হয় না। সাহিত্য একই সঙ্গে রেস আবার রেস নয়। রেস নয় কেন আগে বলি। এখানে ফার্স্ট সেকেন্ড হওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। দুই লেখক তো দূরের কথা, একজন লেখকেরই একটি সৃষ্টির সঙ্গে আরেকটির তুলনা করা যাবেই না। আবার সাহিত্য রেসও, তবে সেটা ১০০ মিটার স্প্রিন্ট নয়; লম্বা ম্যারাথন। আজ আমার একটা বই চার মুদ্রণ হলেই আমি সেরা লেখক হয়ে গেলাম, বা ওই বইটা সেরা হয়ে গেল না।

তবে আপনি যেটা জানতে চাইছেন, আমি আসলে নিজের লেখা নিয়ে সব সময় কনফিউজড থাকি। যখন কোনো গল্পের আইডিয়া মাথায় আসে, মনে হয়, আরেহ এটা তো বাংলা সাহিত্যের সেরা গল্প। এমনভাবে তো কেউ কখনো ভাবেনি। গল্পটা শেষ করলে ভাবি, নাহ, বাংলা সাহিত্য নয়; বিশ্ব সাহিত্যেরই সেরা গল্পগুলোর একটি হয়ে গেল মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর লেখাটা যখন কাউকে পড়তে দিই, তখনই বুঝতে শুরু করি, এর চেয়ে ভয়াবহ বাজে গল্প জীবনে কেউ কখনো লেখেনি, লিখবেও না। অনুশোচনা হয় কেন আবেগের বশে একজনকে পড়তে দিলাম। কী লজ্জার ব্যাপার!

আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল যখন দুই তিন বছর আগে লিখে শেষ করি, খুব রোমাঞ্চ হচ্ছিল। তখন ২২ হাজার শব্দের মতো লিখেছিলাম। তার ১৮ হাজার শব্দ আমি নির্দয়ের মতো ফেলে দিয়ে নতুন করে ৪৫ হাজার শব্দ লিখেছি।

তার মানে এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আপনাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল…

– আসলে অনেক কিছু শিখছি। আমি উপন্যাসের প্রতিটা পর্বের গল্প বলি একটা চরিত্রকে ধরে। শুরুটা দিয়েই উদাহরণ দেই। গল্পটা শুরু হয়েছে শাওন আর রনি দুই ভাইকে দিয়ে। শাওন ছোট, ফাইভে পড়ে। রনি বছর তিনেকের বড়। কিন্তু রনির পড়াশোনা বন্ধ। এই পরিবারে একজন পড়তে পারত। রনি ঠিক করল, শাওনই পড়ুক। ও ব্রিলিয়ান্ট। রনি যে এই বয়সে স্কুলে যায় না, এ নিয়ে তার তেমন আক্ষেপও নেই।

দুই ভাই একেবারে আলাদা। কিন্তু দারুণ দোস্তি। তো ব্রিলিয়ান্ট শাওন একদিন রনিকে প্রশ্ন করল, বিজ্ঞানীরা যে খুব বোকা, সেটা রনি জানে কি না। প্রশ্ন শুনে রনি তো ভ্যাবাচ্যাকা। বলে কী, বিজ্ঞানীরা জ্ঞানী বলেই তো বিজ্ঞানী। তারা আবার বোকা হয় কী করে। শাওন তখন ব্যাখ্যা করল ব্যাপারটা।

আসলে তাদের বাসায় একটা টিভি আর একটা মোটরসাইকেল আছে। দুটোতেই পড়ে পড়ে ধুলো জমছে। তাদের বাসায় কারেন্টের লাইন কেটে দিয়ে গেছে, বিদ্যুৎ বিল দেওয়া হয়নি বলে। আর তেল কেনার টাকাও তাদের বাবার নেই। শাওনের পর্যবেক্ষণ হলো, টিভি বা মোটরসাইকেল কোনোই আবিষ্কার করা সহজ কাজ না। বিজ্ঞানীরা এত মাথা খেটে এসব যখন বানালই, তখন এমন মোটরসাইকেল কেন বানাল না যেটা তেলের বদলে পানিতে চলে। বা এমন টিভি কেন বানানো হলো না, যেটা কারেন্ট ছাড়াই চলতে পারে।

এই জন্য গল্পের শুরুটা বললাম, যখন আমি শাওনের চোখ দিয়ে গল্পটা বলছি, আমার দেখার চোখটা শাওনের মতো বলে বর্ণনা ভঙ্গিটা তখন তেমন হয়েছে। আবার শের খান যখন ভ্যাট সিক্সটি নাইনের বোতলের ভেতর দিয়ে পৃথিবীটা দেখে, তার দেখার চোখ আলাদা। যখন প্রণব দারোগা মাথায় পুলিশের গোল টুপিটা চাপিয়ে পৃথিবীকে দেখে, সেটা আবার অন্য রকম। সারা দিনমান ভিক্ষে করা বু যখন স্বপ্ন দেখে, তার স্বপ্ন কিন্তু অতটা কাব্যিক না। সাধারণ স্বপ্ন, তার নাতির একটা ঘর হবে, ফুলবানুর সঙ্গে বিয়ে হবে। কিন্তু চিত্রা যখন স্বপ্ন দেখে, তার স্বপ্ন কবিতা হয়ে ওঠে। এ কারণেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আজিজ স্যার বাংলা পড়াতেন বলে তিনি পৃথিবীটাকে দেখেন কাঠখোট্টা ভাবসম্প্রসারণ দিয়ে।

ফলে প্রতিটা পর্বের ভাষার ধরনের ব্যাপারে আমি সচেতনভাবে সতর্ক ছিলাম। বর্ণনা রীতিতে ব্যতিক্রম কেবল ফুলবানু। সে গ্রামের পড়াশোনা না-জানা একটা মেয়ে হলেও তার পর্বগুলো বর্ণনা করার সময় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যকল্প আর রূপক নির্মাণ করার চেষ্টা করেছি। কারণ ফুলবানু এই উপন্যাসে আমার অণুবীক্ষণ যন্ত্র। সে এই বয়সে যা দেখে, আমরা অনেকে তা দেখতে পাই না।

এগুলো যে সব সার্থকভাবে করতে পেরেছি তা নয়। যতবার নতুন করে পড়ছি, ততবার মনে হচ্ছে এখানে ওখানে বদলাই। এখন যেমন মনে হচ্ছে বাবা হিসেবে এনামুলের নির্লিপ্ততা তথ্য হিসেবে উপন্যাসে এসেছে, গল্প হিসেবে আসেনি। কিছু ঘটনা নির্মাণ করে বলে দিলেই হতো, বাবা হিসেবে তিনি কতটা নির্লিপ্ত। দেখি পরের এডিশনে ঠিক করতে পারি কি না। পরের এডিশনে যেমন উৎসর্গপত্রেও একটা সংশোধন করতে হবে।

আপনি যে বারবার অনেক কিছু পরিবর্তন আনছেন বুঝতে পারছি। আমাকে যে পাণ্ডুলিপি পড়তে দিয়েছিলেন সেখানে ফুলবানু ছিল প্রথম চ্যাপ্টার, শাওন-রনি ছিল দ্বিতীয়।

– আসলে তিন বছর আগে যখন প্রথম লিখি, তখন প্রথম পর্ব যেটা ছিল, ওটা এখন চলে গেছে দশে। তার মানে গল্পটা ভেঙেছি, নতুন চরিত্র এনেছি। গল্পটাই নতুন করে বলেছি। একবার বলে ফেলা গল্পটা নতুন করে বলা অনেক কঠিন কাজ। দুই বছর আগে লেখা একটা উপন্যাস নতুন করে ভেঙে গড়েছি। আরও একটা কঠিন ব্যাপার ছিল। এখানে ক্যানভাস যেহেতু হরিপদর চেয়ে তিনগুণ বড়, কন্টিনিউয়েশন ধরে রাখা যে কত কঠিন ছিল, তা বুঝেছি। দ্বিতীয় অধ্যায়ে যে চরিত্রটা ছিল, ১১তম অধ্যায়ে আর ১৯তম অধ্যায়ে তার ম্যানারিজম, তার ধরন সব ঠিক রাখা আসলে কঠিন কাজ। হরিপদতে মূল চরিত্র ছিল তিন-চারটি। ফলে ওদের নিয়ে ভাবলেই হচ্ছিল। এখানে চরিত্র ও ঘটনা দুটোই বেশি। আবার প্রত্যেকে একটি অভিন্ন ঘটনায় কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন, সেটাও দেখাতে হবে। প্রথমবারের লেখায় সার্কাসের বাঘের একটা বড় অংশ ছিল। এবার যেটা পুরোটাই বাদ দিয়েছি।

এই উপন্যাস তাই শিক্ষাসফরের মতো ছিল। যেমন এখানে ঘটনার টাইমফ্রেমটাও আমাকে মাথায় রাখতে হচ্ছিল। প্রতিটা উপন্যাস লিখতে গিয়েই অনেক কিছু শিখব, এটা বুঝতে পারছি। একটা লেখা লিখেই সেটা লেখকের ম্যাগনাম ওপাস তো আর হয় না। রবীন্দ্রনাথ নিজে একটা সময় তাঁর এক-তৃতীয়াংশ লেখার বাহুল্য নিয়ে আফসোস করেছেন। আমিও হয়তো পরে করব। শিল্প মানে তো যত কমে যত বেশি বলা যায়।

বিশেষ করে রাশেদ ভাই যেমন বলেন, আমার চরিত্রগুলোর এত এত জ্ঞানী কথা ভাবার দরকারটাই বা কী! আমার লেখায় এপিগ্রাম অনেক চলে আসে। আবার আমি ভেবে দেখলাম, এটা আমার লেখার ধরনই। এমন নয়, আরোপিত। সহজাতভাবেই আসে। আমি বোধ হয় একটু বেশি ভাবুক।

‘আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল’র পুরোটা জুড়ে যে বাঘের কথা বলে যেতে চেয়েছেন সেই বাঘ কি এখনো আমাদের শহরে রয়ে গেছে?

– এই গল্পটা আসলে নব্বই দশকের রংপুর শহরের। শহরে হঠাৎ করে গুজব রটে এক বহুরূপী বাঘ নেমেছে। সেই বাঘ যাঁকে আঁচড় দেয়, শরীরে থেকে যায় তিনটা দাগ। সে কী আতঙ্ক শহরজুড়ে! সন্ধ্যা হলেই পথঘাট ফাঁকা। গুজবের ডালপালা প্রতিদিনই বাড়ে। স্টেশন রোডের এক গলিতে বেওয়ারিশ পড়ে থাকা এক লাশ থেকে গুজবের শুরু। কে যেন মুখটা থাবা দিয়ে খুলে খুবলে নিয়েছে। বের হয়ে আছে মাথার খুলি, থেঁতলে আছে থিকথিকে মগজ। ভনভন করে উড়ছে মাছি। কী বীভৎস দেখাচ্ছে! সেই রাতেই রংপুর শহরে ঘটে যায় একটা আত্মহত্যার ঘটনাও!

তবে আমার গল্পটা হরর গল্প বা পিশাচকাহিনি নয়। রহস্য উপন্যাসও না। কিন্তু এখন আমি যখন পেছন ফিরে তাকাই, অনেকের শরীরে তিনটা আঁচড়ের দাগ পাই। শনাক্তকরণ চিহ্নের মতো। এই দাগগুলো তাহলে কে দিল, কোত্থেকে এল। সেটা খোঁজার গল্পই হলো আমাদের শহরে বাঘ এসেছিল। বাকিটা পাঠক আবিষ্কার করে নিক।

কষ্টের শৈশব থেকে শুরু করে বড় হওয়া, একপর্যায়ে বাংলাদেশে একজন লেখক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া, আপনার জীবন তো কোনো উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। এই অভিজ্ঞতা কি কখনো কোনো উপন্যাসের চরিত্র হয়ে ফুটে উঠবে?

– আসলে আমি ভীষণ সৃষ্টিশীল কোনো লেখক নই। আমি এডগার এলান পো নই যে, মৃত মানুষকে হিপনোটাইজ করে বাঁচিয়ে রাখার কথা ভাবতে পারব; বা কাফকার মতো, ঘুম থেকে উঠে দেখলাম তেলাপোকা হয়ে গেছি। যদিও নিয়মিত ছোটগল্প যখন লিখতাম, তখন কিছু ফ্যান্টাসি করেছি। যেমন একটা গল্প ছিল আমি ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি মারা গেছি (কাফকা তখনো পড়া হয়নি)। একটা গল্পে লিখলাম, চরিত্রটাই আমাকে, মানে লেখক নিয়ে গল্পটা বলছে। কিশোরদের কল্পনাশক্তি বেশি প্রখর বলে ওদের জন্য লিখতে গিয়ে বেশি কল্পনার আশ্রয় নিয়েছি। একটা গল্প লিখেছি যেখানে সব উল্টো চলে। আরেকটা গল্প মনে পড়ছে, একটা লেখকের ল্যাপটপ চুরি যায়, ওয়ার্ড ফাইলে থাকা গল্পের চরিত্রগুলো অনেক চেষ্টা করে লেখকের কাছে ল্যাপটপটা ফিরিয়ে দেয়। উল্টো লেখক তাদের একজনকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয় চোর সন্দেহে।

উপন্যাসে আমি যা কিছু লিখি, সেটা আমার চারপাশ থেকে নেওয়া। এটা সব লেখকই করে। তবে এও সত্যি, আমার বলা গল্পগুলো শেষ পর্যন্ত গল্পই, সত্যি কোনো ঘটনা নয়। মার্কেস যেমন বলেন, সাংবাদিকতায় এক চিমটি গল্প আর গল্পে এক চিমটি সাংবাদিকতা মিশিয়ে দেওয়া দুটোই খারাপ।

আপনার ছোট গল্পের প্রসঙ্গ যখন এলই, পত্রিকার পাতা থেকে ফেসবুকের ওয়ালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই সমস্ত গল্পকে একত্রে কি আমরা কোনো বইয়ে পাব?

– বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী মাধ্যম এর ছোট গল্প। আমাদের এমন অনেক ছোট গল্প আছে যেগুলো সারা বিশ্বের মানুষকে নাড়া দিতে পারত। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির চেয়ে গল্পগুচ্ছ বেশি শক্তিশালী, মানবিক অনুভূতি তৈরির কথা যদি বলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু গল্প বিশ্ব সাহিত্যের সেরা সম্পদ। প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় তো বিস্ময়কর। প্রেমেন মিত্তিরের তেলেনাপোতা আবিষ্কার সব ভাষার পাঠকদের পড়া উচিত। হুমায়ূন আহমেদের অনেক গল্প পড়ে চমকে যেতে হয়, তিনি কোনো অংশে মুরাকামির চেয়ে কম নন।

আফসোসের বিষয় হলো, আমরা নিজেরা কেন জানি না ছোটগল্পটাকে সেভাবে গ্রহণ করলাম না। ছোটগল্পের বই চলে না এ আমি ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। যদি সম্ভব হতো, আমি আজীবন শুধু ছোট গল্পই লিখে যেতাম। যেহেতু গল্পের বই পাঠক কেনেন না, আমার ১৫-২০টার মতো গল্পের ভবিষ্যৎ কী হবে আমি জানি না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।