পাগলি || ছোটগল্প

‘ইতনা ছি ছি কারনেকা কেয়া হুয়া?’

চিৎকার শুনতে পাচ্ছি লেনের শেষমাথার বাড়িটার সামনে থেকে।

সেদিকে হাটা দিতেই দেখলাম প্রচুর লোক ভীড় জমিয়েছে সেখানে। সবার হাততালি শুনে মনে হচ্ছে, খুব দারুণ সার্কাসের খেলা হচ্ছে বোধহয়। প্রবল কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গেলাম।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে তারস্বরে চেঁচিয়েই যাচ্ছে পাগলিটা। উদ্দেশ্য বাড়ির দোতলার জানালা। জানালার সামনে বিরক্তমুখে পাগলির দিকে তাকাচ্ছেন এ বাড়ির মালকিন মিসেস ফাতেমা। রাস্তায় এতলোক জমে আছে ঠাট্টা-তামাশা করতে, কিছু ছেলেপেলে ঢিল মারছে তাঁর দিকে। কোন মানুষ যদি রাস্তায় বিপদে পরে, একটা লোককে পাওয়া যায়না সাহায্যের জন্য, কিন্তু কোন ঝগড়াঝাঁটিতে মজা দেখার জন্য মানুষের অভাব থাকেনা।

উসকো-খুসকো চুল, গায়ে শতচ্ছিন্ন শাড়ি, ডানহাতে বহু পুরাতন বালা, ভাষা শুনে বোঝা যায় সে বাঙালি নয়, বিহারী। নাম ললিতা, পরিবার ছিল এককালে। কিন্তু চোখের সামনে সবাইকে আগুনে পুড়ে মরতে দেখাই তার মাথা খারাপের কারণ হয়ে গেল।

বিহারী হওয়ার কারণে বোধহয় মানুষের তুচ্ছতাচ্ছিল্য, ঘৃণার পরিমাণটা একটু বেশিই!

গতকাল থেকে কোনমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছে।

৪ নং বাসার বেসমেন্টে ঘুমিয়ে পড়ায় দারোয়ানের লাঠির বাড়ি ঠিক এসে পড়েছিল ডানপায়ের হাড্ডিতে, চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে, কান্না আসছে ব্যাথায়। কিন্তু পাগলের কান্না কে বোঝে?

মিসেস ফাতেমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সহ্য করেছেন আর না। আমজাদ সাহেব যদি ললিতাকে না তাড়ায়, তিনি বাপের বাড়ি চলে যাবেন। এইতো সন্ধ্যাবেলায় তার ৮ বছরের ছেলেটাকে থাপ্পড় মেরেছে পাগলি, কত্ত বড় সাহস! এলাকার লোকজন এলোপাথাড়ি মারতে থাকে ললিতাকে। তবে ললিতা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ছেলেটা আগে তাঁর গায়ে লাঠি দিয়ে মারছিল, কিন্তু পাগলের কথা কে বিশ্বাস করে? মার থামলো না।

মিসেস ফাতেমা উপর থেকে মারতে নিষেধ করলেন, কেমন কেমন লাগছে তার। ছেলেটাও অনেক দুরন্ত হয়েছে, এতদিনের বায়না করা নতুন কিনে আনা হকিস্টিকটা নিয়ে কেন পাগলির উপরই ওর প্র্যাকটিস করতে হলো? ছেলেকে বকা দিতে গেলেন, এটা দিয়ে মানুষের উপর কেন আক্রমণ করলো। ছেলের উত্তর শুনে থমকে গেলেন, ‘মা তুমি যেদিন ওকে সিঁড়ি থেকে ধাক্কা মারলে, সেদিন তো বলেছো, মানুষ না, ও পাগল, আমি তো মানুষকে মারিনি, পাগলকে মেরেছি!’

দাঁত কিড়মিড় করছেন মিসেস ফাতেমা, ছেলের যুক্তির কাছে সবসময় হেরে যান, এ পরাজয় মায়েদের কাছে মধুর হলেও তাঁর কাছে রাগ লাগে। এ ছেলে যে তার পেটে ধরা নয়।

৮ বছর আগের কথা।

মিসেস ফাতেমা আর আমজাদ সাহেব ছিলেন নিঃসন্তান দম্পতি, শিল্পপতি আমজাদ সাহেবের সম্পত্তির উত্তরাধিকারীর অভাব তাকে দুশ্চিন্তায় পাগল করে ফেলেছিল।

আবার সন্তান না থাকার হাহাকার ফাতেমাকে প্রায় মানসিক রোগীর মত বানিয়ে দিচ্ছিল। পরিবারের সবাই জানতো, সমস্যা আমজাদ সাহেবের, কিন্তু আসলে সমস্যাটা ছিল ফাতেমারই। কিন্তু পরিবার থেকে দ্বিতীয় বিয়ের চাপ আসার ভয়ে আমজাদ সাহেব এটি চেপে যান।

কোন এক রাতের বেলা, দেরি করে বাড়ি ফেরেন আমজাদ সাহেব। সাথে পিএসও এসেছে কি যেন নিয়ে। একটি বাচ্চা ফাতেমার হাতে তুলে দেন আমজাদ সাহেব। তিনি বলেন, এলাকার পাগলিটা বাচ্চা কনসিভ করে ফেলেছে, কোন হারামজাদা কুকাজ করে দিয়েছিল, সমাজের অধঃপতনের উপর আধাঘণ্টা লেকচার দিয়ে দেন তিনি, তারপর বোঝান যে, পাগলির কাছে থাকলে বাচ্চাটার অন্ধকার ভবিষ্যৎ হবে, আবার তাদের সন্তান দরকার, তাই বাচ্চাটাকে দত্তক নিয়ে নেন তিনি। মনে অনেক প্রশ্ন থাকলেও স্বামীভক্ত ফাতেমা অম্লানবদনে বাচ্চাটাকে নিয়ে নেন। তারও তো মাতৃত্বের স্বাদ পেতে ইচ্ছে করে, যদিও তিনি বুঝে ফেলেছেন এ বাচ্চার বাবা আমজাদ সাহেবই।

রাত অনেক হয়ে গেছে। পাগলিটা নেতিয়ে পড়ে আছে মার খেয়ে। সামনের দোকানটায় খাবার চেয়ে মার খেয়েছে আবার। রক্তে ভেসে যাচ্ছে কাপড়, দ্রুত ড্রেসিং না করলে ইনফেকশন নিশ্চিত। কিন্তু, পাগলের ডাক্তার লাগেনা, নোংরা পাগলের কাছে কে আসবে? আসবে কেউ কেউ, নিজের কামনা মেটাতে, হাতের ঝাল মেটাতে। কিন্তু দরদ এদের জন্য না।

ডাস্টবিনের সামনে পড়ে থাকা পাগলির সামনে গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়ালো রবিন, মা-বাবা ঘুমুতে যেতে দেরি না করলে আরো আগেই লুকিয়ে বের হতে পারত। তার হাতে কিছু খাবার আর গামছা, তুলা,পানি, স্যাভলন। অনেক ব্লিডিং হতে দেখেছে। আজ তার জন্য পাগলি বেচারি মার খেয়েছে। খারাপ লাগছে তার, কেন মানুষ এদের সাথে এমন করে?

ললিতা চোখ বন্ধ করে মৃত্যুর অপেক্ষা করছিল, হঠাৎ কোমল হাতের স্পর্শ তাকে জাগিয়ে তুলল। হ্যা এসেছে, ছেলেটা এসেছে! ভুলে গেল এই ছেলেটাই সন্ধ্যায় কি মার মেরেছে। খাইয়ে দেয়া খাবার সব ভুলিয়ে দিল, খুব আপন লাগে কেন যেন ছেলেটাকে, ছেলেটা তাকে ঘৃণা করেনি!

অনেক আনন্দ হতে লাগল মনে, প্রবল মমতা চোখে নিয়ে ছেলেটাকে চলে যেতে দেখল। জীবনে তার যা পাওয়ার হয়ে গেছে। মাথাটা ফাকা লাগছে ললিতার, চোখ বুঝল শান্তি নিয়ে।

আর কাউকে কোনদিন জ্বালাতে আসবে না সে। নীরবেই বিদায় নিতে হবে তাকে।

সে জানে তার জন্য চোখের পানি পড়বে না কারও।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।