বাংলাদেশের পাঁচ তারকা হোটেলের মানদণ্ড কী!

কখন একটি হোটেলকে ‘পাঁচ তারকা হোটেল’ বলা যাবে? এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পাঁচ তারকা হোটেল হিসেবে কোনো হোটেলকে চিহ্নিত করার জন্য গোটা বিশ্বে অনেকগুলি ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড রয়েছে। কিছু গবেষণা নিয়ন্ত্রিত হয় কর্তৃপক্ষ দ্বারা আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হোটেল মালিকদের সমিতিও এই কাজটি করে থাকেন।

বাংলাদেশে, ‘হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্ট নীতি-২০১৬’ অনুসারে একটি হোটেল কত তারকা বিশিষ্ট হবে, তা নির্ধারণ করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী কোনো হোটেলকে পাঁচ তারকা রেটিং পাবার জন্য ৩৪ টি বিভিন্ন উচ্চ মানের মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ‘হোটেল ও রেষ্টুরেন্ট বিভাগ’ এই রেটিং প্রদান এবং নিরীক্ষণের কাজটি করে থাকেন।

পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতে, দেশে ১৩ টি পাঁচ তারকা হোটেল, ৪টি চার তারকা হোটেল এবং ১৭ টি তিন তারকা হোটেল রয়েছে।

তবে, অভিযোগ রয়েছে অনেক স্থানীয় হোটেল তারকা পাবার মানগুলো পূরণ করে নি তবুও তারকা পেয়ে গিয়েছে কেবলমাত্র রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য। অন্যদিকে আরো কিছু হোটেল রয়েছে, তারা ধরে রাখার জন্য যাদের সংস্কার প্রয়োজন।

এই শিল্পের অন্দরের লোকজন জানান, হোটেল বিভাগের জনশক্তি অতি সামান্য এবং এমন কোন বিশেষজ্ঞ নেই যিনি সকল অনুমাপক অনুযায়ী কোনো হোটেলকে মূল্যায়ন করতে পারেন।

গোপন এক অনুসন্ধানে, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত একটি পাঁচ তারকা হোটেলের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি সঠিকভাবে বিবেচনা করা হতো, তাহলে কেবলমাত্র দুই বা তিনটি হোটেল পাঁচ তারকা হোটেলের মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম হতো। বাকি যে হোটেলগুলো এদেশে আছে, তা মাত্র তিন তারকা পাবার যোগ্যতা রাখে।’

এমনকি দেশের সবচেয়ে পুরনো পাঁচ তারকা হোটেল (বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল) তার কাঠামো পুনরায় ঢেলে সাজাচ্ছে কেননা পাঁচ তারকা হোটেল হবার অনেক মানদণ্ড এর মাঝে অনুপস্থিত ছিল। এই হোটেলের ভবন এবং অন্যান্য সুবিধাগুলো সর্বোচ্চ পর্যায়ের নয়, যেকারণে অনেক আন্তর্জাতিক হোটেল ব্যবসায়ী হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে পরিচালনা করতে অস্বীকার করেছেন।

একটি পাঁচ তারকা হোটেলের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘হোটেলের অবস্থান উপরে ওঠানোর জন্য বেশিরভাগ হোটেল মালিকেরা হোটেলের রেটিংকে ব্যবহার করেন, যার ফলে তারা খাদ্য সামগ্রীসহ অন্যান্য সেবাগুলোতে আরো বেশি মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন।’

এ সমস্যা মোকাবেলায়, এ শিল্পের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ কর্তৃপক্ষকে একটি সংস্থা গঠন করতে অনুরোধ জানিয়েছেন যা দেশের হোটেল ব্যবসা এবং তার পরিষেবাগুলোর উপর নজর রাখতে পারে।

পর্যটন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম জানান, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে দেশে হোটেল ব্যবসায় এবং পরিষেবাগুলির মান একটি স্তরে আনা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আতিথেয়তা ব্যবসা নিরীক্ষণের জন্য সরকারের কোনো সংস্থা নেই, তারকা হোটেলের মূল্যের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে আমাদেরও একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে এবং রেটিং-য়ের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হবে।

ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রধান (এনএইচটিটিআই) প্রফেসর পারভেজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘হোটেলে এবং রেষ্টুরেন্ট বিভাগের কোন বিশেষজ্ঞ নেই। কোনো হোটলকে মূল্যায়ন করার জন্য পেশাদারদের অতীব প্রয়োজন।’

তিনি যোগ করেন, ‘বাংলাদেশে হোটেল কক্ষের আয়তন কম হলেও কক্ষের ভাড়া বেশি। খাদ্য মূল্য নাগালের মধ্যে থাকলেও কিন্তু এটি পর্যটকবান্ধব নয়।’

চাহিদার উপর ভিত্তি করে, একটি পাঁচ তারকা হোটেলের সাধারণ কক্ষ ১৫০ ডলার হতে ৩০০-৪০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

হোটেল ও রেষ্টুরেন্ট সেলের অতিরিক্ত সচিব শাহাদাত হুসাইন বলেন, যেসব হোটেল সরকারী মাপকাঠি পূরণ করে কেবল তারাই তারকা হোটেলের রেটিং পান। তিনি বলেন, ‘একজন সরকারি প্রতিনিধি হিসাবে, কোনো হোটেলকে বৈধতা প্রদানকালে হোটেল এবং রেস্টুরেন্টের নিয়ম-নীতিগুলো আমরা কঠোরভাবে অনুসরণ করি।’

পাঁচ তারকা হোটেলের বৈধতার জন্য ৩৪ টি মাপকাঠির মাঝে রয়েছে: অন্তত ১০০ টি হোটেল কক্ষ, সুইমিং পুল, জিম, ১০০-২০০ টি গাড়ি পার্কিং সুবিধা, মুদ্রা বিনিময়, ওয়াইফাই এবং তারের ইন্টারনেট সংযোগ, রেন্ট-এ-কার সার্ভিস, সার্বক্ষণিক ডাক্তার এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সুবিধা, ২৪ ঘন্টা নিরাপত্তা, একাধিক বেলা ভোজের ব্যবস্থা, কনফারেন্স হল এবং রেস্টুরেন্ট সুবিধা থাকা।

ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের পরিচালক (বিপণন ও বিক্রয়) শাহিদুস সাদিক জানান, বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ম্যারিয়ট, হিলটন এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল গ্রুপের মতো হোটেলগুলো একই মান বজায় রেখে চলে। তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে বাংলাদেশে এমন হোটেল চেইন নেই। ফলস্বরূপ, আমরা দেশে মানসম্মত হোটেল সেবাগুলো পাই না।’

একটি পাঁচ তারকা হোটেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, হোটেলটি পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্রায়ই হোটেলের মান যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে অতিথি হিসেবে নিরীক্ষক প্রেরণ করেন। তিনি প্রস্তাব করেছেন, স্থানীয় হোটেলগুলোর মানদণ্ড পূরণের জন্য সঠিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

– What is a five-star hotel in Bangladesh? শিরোনামে লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ঢাকা ট্রিবিউনে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।