পরোপকার ও একজন কাভার্ড ভ্যান চালক

১.

বনানীতে একটা কাজে গিয়েছিলাম কিছুদিন আগে। কাজ শেষ হতে হতে রাত ১০ টা বেজে গেল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল, যে কোন সময় ভারী বৃষ্টি নামবে। বাড়িতে টিভি দেখতে দেখতে আর হাতে একটা কফির মগ নিয়ে এরকম আবহাওয়া উপভোগ করা যায় কিন্তু এক ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার পরেও যখন কোন বাস কিংবা সিএনজি পাওয়া যাবে না তখন একটা অনুভূতিই আসে – বিরক্তি। আমিও বিরক্ত হচ্ছিলাম, কিন্তু কিছুই করার নেই। দুই একটা বাস যাও এসেছিল সেটাও শাহবাগের দিকে যাবে না, মিরপুর যাবে।

অপেক্ষা করতে করতে দেখলাম একটা কাভার্ড ভ্যান সিগনালে দাঁড়িয়ে আছে, ওর পাশের সিটটা ফাঁকা। অনেকের কাছে শুনেছি এসব গাড়িতে লিফট নিয়ে কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেই ড্রাইভার খুশি থাকে। তবে মাঝে মাঝে অনেক মানুষ সুবিধা নিতে গিয়ে ছিনতাই কারি চক্রের কবলে পড়েছে। আমি সচরাচর এসব গাড়িতে লিফট চাই না, আজ বাধ্য হয়ে ড্রাইভারকে অনুরোধ করলাম। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম সে ওদিকেই যাচ্ছে, বললাম শাহবাগ নামিয়ে দিতে। গাড়িতে উঠে চিন্তা করলাম ড্রাইভারকে কত টাকা দেওয়া যায়। বাস পেলে ভাড়া লাগতো ১০ টাকা, কিন্তু এরকম কমফোর্ট ভাবে আসতে পারতাম না সেটা নিশ্চিত। ভাবলাম একটু বাড়িয়ে দেব। একটু পর জানলাম কাভার্ড ভ্যানটা চকবাজারে যাবে, আমার বাড়ির রাস্তা দিয়েই। আমার জন্য সুবিধাই হলো।

একদম বাড়ির কাছে নেমে ড্রাইভারকে ৫০ টাকা দিলাম। এই পর্যন্ত আসতে আমার লাগতো ৬০ টাকা, আবার ড্রাইভারও খালি আসলে এই ৫০ টাকাও পেত না। দুই জনেরই লাভ।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ড্রাইভার টাকাটা নিল না। প্রথমে ভাবলাম টাকা কম হয়ে গিয়েছে কিনা, পরে বুঝলাম বেশী টাকা দিলেও ও নিবে না। যে কাজে ওর কোন বাড়তি পরিশ্রম হয় নি সেটার জন্য টাকা নিলে আর উপকার করার বিষয়টা থাকে না। এখানে নাকি মূল্য শোধের একটা বিষয় এসে পড়ে। এটা ও চাচ্ছে না।

এর বিনিময়ে উনি উপরওয়ালার কাছে আরেকদিন বিপদে পড়লে অন্য কোন সাহায্যকারী চাচ্ছেন।

একজন ড্রাইভারের এরকম দৃষ্টিভঙ্গী দেখে একটু অবাক হলাম। সাথে সাথে অনেক দিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল।

২.

ছোটবেলায় প্রায়ই দেখতাম গ্রাম থেকে অনেক আত্মীয় স্বজন আমাদের বাসায় আসতো সাহায্য চাইতে। আমার বাবাও সাধ্যমতো সাহায্য করতেন।

এই অযাচিত উপকার করা নিয়েই আমার বাবার সাথে আমার মাঝে মাঝে বিরোধ লাগতো।

– সাহায্য তো আমরাও করি। কিন্তু আপনার মতো না।

– আসলেই কি তুই মানুষকে সাহায্য করিস?

– সন্দেহ আছে কোন?

আমার প্রশ্নের উত্তরে মানুষকে উপকার করা নিয়ে আমার বাবা আমাকে কিছু কথা বোঝালো। তার জবানেই কথাগুলো বলছি।

উপকার সাধারনত পাঁচ রকমের হয়।

– নিজের কোন ক্ষতি হচ্ছে না কিন্তু নিজের কাজের সাথেই অল্প একটু যোগ করলে একই কাজ দ্বারা আরেকজনের উপকার হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলি। মনে কর তুই নিউমার্কেট যাবি একটা বই কিনতে। এখন তোর মামার কিংবা অন্য আরেকজনের আরেকটা জিনিস প্রয়োজন যেটা আনতে হলে তাকে নিউমার্কেটে যেতে হবে। তুই ইচ্ছে করলে সেটা তাকে এনে দিতে পারিস। এই উপকার করলে কয়েকটা দিক থেকে লাভ। তোর মামার সময় আর যাওয়া আসা বাবদ ভাড়ার টাকা দুটোই বেচে গেল। মাঝখান থেকে তোরও কোন ক্ষতি হলো না।

– নিজের লাভের কথা ভেবে আরেকজনের উপকার করা। এই ধরণের ক্ষেত্রে সাধারণত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলে একটা বিষয় থাকে । মনে কর তুই ব্যবসা করিস। এখন এই ব্যাবসায় আরেকজন মানুষ তোর কাছে সাহায্য চাইলো। তুই ভেবে দেখলি লোকটাকে সাহায্য করলি সে হয়তো ভবিষ্যতে তোর কোন কাজে আসতে পারে। এই ক্ষেত্রে নিজের সামান্য কষ্ট হলেও দেখা যাবে তুই উপকারটা করছিস। ব্যবসা বাদেও তোর কোন আত্মীয় কিংবা পরিচিত মানুষকেও এভাবে অনেক সময় সাহায্য করে থাকিস।

– অন্যজন উপকার করেছে এর প্রতিদান দেবার জন্য কৃতজ্ঞতা স্বরূপ উপকার করা। এই ক্ষেত্রে দেখা যায় এমন একজন বিপদে পড়েছে যে কিনা একসময় তোর বিপদে সাহায্য করেছিল। তুই খুব খারাপ না হলে লোকটাকে সাহায্য করবি।

– খ্যাতি অর্জনের জন্য। সাধারণত রাজনীতি বিদরা এই কাজটা করে থাকে। অনেক সময় রাজনীতিবিদ না হলেও এলাকা কিংবা অন্য কোন ক্ষেত্রে নিজের প্রভাব বিস্তার করার জন্য কোন ভালো কাজ করে। যেমন কোন ধনী ব্যক্তি যদি এলাকায় একটা স্কুল কিংবা মাদ্রাসা করে দেয় তাহলে তার নাম অনেকদিন থাকবে। (সবাই খ্যাতি অর্জনের জন্য কাজটা করে না, অনেকে নিঃস্বার্থভাবেই করে থাকে।)

– নিজের কিছু পরিমাণ ক্ষতি হলেও আরেকজনের উপকার করা। সত্যিকার অর্থে এটাকেই পরোপকার বলা চলে।

যদি ৫ নম্বর পয়েন্ট মতো চলতে পারিস তাহলে নিজেকে পরোপকারি বলাটা সাজে। ১ আর ৩ নম্বর পয়েন্টটা নিজের কর্তব্য মনে করেই করা উচিত। ২ নম্বরটাও খারাপ কিছু না, তবে এর জন্য নিজেকে পরোপকারি বলিস না, অন্তত নিজের কাছে সৎ থাকিস। ৪ নম্বর পয়েন্ট নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভালো। তবে এরপরেও মানুষ যদি উপকৃত হয় সেটাও খারাপ নয়।

এখন তুই চিন্তা করে দেখ তুই কোন ধরণের উপকার করিস?

৩.

গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করা আমার কাজ না। এই কথাটা যে বয়সে শুনেছিলাম তখন তো আরো বয়স কম ছিল। তবে এতদিন পর এই ড্রাইভার ভাইটার কথা শুনে মনে একটু নাড়া দিল।

আমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ৫ নম্বরের কাতারে পড়ি না। কোয়ান্টাম থেকে গত দুই মাসে অন্তত ৫ বার ফোন করেছে রক্ত দিয়ে আসার জন্য। দুটি কারণে যেতে পারিনি, প্রথমটা ব্যস্ততা। সপ্তাহে একদিন বাসায় থাকি, সেদিন বাসা থেকে রক্ত দেবার জন্য ৩ ঘন্টা সময় ব্যয় করে রক্ত দিয়ে আসার মতো পর্যাপ্ত সময় আসলেই আমার হাতে নেই। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে আমার রক্তের গ্রুপ ‘বি’ পজিটিভ, খুব রেয়ার কিছু নয়। তবে এরপরেও কাছাকাছি থাকলে আমি রক্তটা দিয়ে আসতাম। আমি রক্ত দিতে অনাগ্রহী নই।

তবে আমার পরিচিত অনেক মানুষই আছে যারা অফিস শেষ করে সুদূর ময়মনসিংহ থেকে নিজের ভাড়া খরচ করে ঢাকা এসে ‘বি’ পজিটিভ রক্ত দিয়ে আবার ফিরে যায়। পৃথিবীতে এই ধরণের মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তবে এই অল্প সংখ্যক মানুষের জন্যেই হয়তো পৃথিবীটা এখনো টিকে আছে।

জানিনা কখনো এরকম উপকার করতে পারবো কিনা। তবে একজন কাভার্ড ভ্যানের ড্রাইভার আমাকে কিছু শিক্ষা দিয়ে গেল।

শিক্ষাটা প্রয়োজন ছিল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।