পরীর বিসর্জন || ছোট গল্প

ব্যস্ত নগরীর সবচেয়ে বড় রাস্তার ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে পরী। দেখতে খুব ফুটফুটে সুন্দর ছিলো বলে প্রথমবার কোলে নিয়েই বাপে ওর নাম রাখছিলো পরী। কিন্তু ভাগ্য ওরে আজ  রাস্তায় নিয়ে আসছে। ওর পাপ ওরে আবারও খদ্দের খুঁজতে বার করছে।

কুয়াশা মোরা ফাঁকা রাস্তায় একলা বসে নিজের পাপ পুণ্যের হিসেব কষে ও। অসুস্থ বাবার ঔষধ কেনা কেন পাপ ছিল সে জানে না, সে জানে না কি অপরাধে সাতজনের পরিবারের ভাত কাপড়ের দায়িত্ব কেবল তারে একলাই নিতে হইসে সেদিন। ভাবতে গেলে চোখটা ঝাপসা হয়া যায়। বাবা…মা…ভাই…বোন শব্দগুলোও কেমন জানি পর পর লাগে!

আজ থেকে আট বছর আগে হঠাৎই কি এক অসুখ হল তার বাপটার আর কাজে যেতে পারলো না। দুইদিনেই বিছানায় পরে গেলো। বড়লোক তো পরী ছিল না, ছিল না বাবার ব্যাংক একাউন্টে জমানো লাখ লাখ টাকা। বস্তির একটা ছোট্ট রুমে ছিল তার মায়ের মাটির ব্যাংকটা। তা দিয়ে আর কয়দিনই বা চলে?

পাঁচ ভাই বোন এর মধ্যে বড় পরী নিজেই চাইলো সংসারের হাল ধরতে। চৌদ্দ বছরের পরী যদিও জানতো না কোথায় গেলে কাজ পাওয়া যায় কিন্তু সাহায্য করা লোকেরও অভাব হল না। দুদিনেই কাজ পেয়ে যায় পরী। নতুন চাকরির প্রথম দিনেই বদ্ধ ঘরে তিনজন মিলে কুরে কুরে খায় পরীকে।

এটাই নাকি তার চাকরি ! চলে যায় তারা যেদিক থেকে এসেছিল। পরে রয় সে কিছু ছড়ানো টাকার মাঝে। তারপর আর থেমে থাকেনি পরীর জীবন। চাকরির নাম করে সেই তিন ভদ্রলোক সেদিন যা করেছিলো তার সঙ্গে, তাই করতে লাগলো সে।

বাবার ঔষধ কেনা হয়ে যেতো, তাই বাবা কিছু বুঝতে চাইতো না। মা রান্নার চাল পেয়ে যেতো, তাই হয়তো বাঁধা দিলো না। ছোট চার ভাইবোন বড় হল যে টাকায় কখনও তাদের পাপ মনে হতো না। অথচ আজ…

আট বছর পর আজ মায়ের অনুশোচনা হয় পাপের টাকায় চিকিৎসা হয়েছিল বলে স্বামী বাঁচেনি তার। যে বোনের সংসার সাজিয়ে নিজের ঘর বাধার শখ পুরণ করেছিল পরী, স্বামী পরিত্যাক্ত হয়ে সে বোনও আজ পরীকে ধিক্কার দেয়।

যে ছোট ভাই ঈদে নতুন শার্ট পরার সময় ভাবতো না বোন কি করে, আজ বউ পেয়ে বলে- ‘বাচ্চাগুলো বড় হচ্ছে বুবু, ওরা যদি জানে……’ আট বছর পর আজ আবারও রাস্তায় নামে পরী। কিন্তু ভেবে পায় না পরী ঠিক কার জন্য নিজেকে বিসর্জন দিয়ে অপরাধী হল এই সমাজে ?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।