পরম নির্জনতায় প্রবেশ করলেন তিনি

দ্বিজেন শর্মার লগে আমার পরিচয় সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে। ভদ্রলোক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আসতেন এবং সবাইকে ভোরবেলা ঘুম ভাঙলেই রমনা পার্কে গিয়া হাঁটাহাঁটি করার পরামর্শ দিতেন।

তেমন একদিন ভোরের দিকে তার লগে দেখা হইলো বকুলতলায়। সেইখানে উনি কান খাড়া কইরা কি একটা পাখির ডাক শোনার চেষ্টা করতেছেন। পাখিটার নাম আমার মনে নাই। তবে পাখিটা কেন রমনা পার্কে আইসা সকাল সকাল ডাকাডাকি শুরু করছে, সেই ব্যাপারটা তিনি বুইঝা ফেলছিলেন এবং সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় আমারে তা বোঝানোর চেস্টা করতেছিলেন।

রমনা পার্কে দেখছি, উনি প্রকৃতির সাথে মানুষকে এমনভাবে মিশতে শিখাইতেন, যেই শিক্ষা সাতারের মতো, একবার শিখলে আর কেউ ভোলে না। আমাকে জারুলের ঘ্রান নিতে শিখাইছিলেন। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ বলছিলেন, কীটের বুকেতে যেই ব্যথা জাগে, আমি সে বেদনা পাই। দ্বিজেন শর্মাকে নিয়াও এই কথা বলা যাবে। ব্যাক্তিগতভাবে উনি সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন।

ঢাকা শহরের কোথায় কোন গাছটা আছে এবং সেইগুলার বয়স কত, কে লাগাইছিল, কেন লাগানো হইছিল ইত্যাদি হাতের তালুর মতো মুখস্ত ছিল তার। অনেক রেয়ার গাছ গাছালি উনি জোগাড় কইরা নটরডেম কলেজ প্রাঙ্গনে আর রমনা পার্কে লাগায় রাইখা গেছেন।

আমরা ব্যক্তিগতভাবে উনারে গাছ গাছালির অংশ হিসেবে দেখতাম! তার অলক্ষ্যে রমনা পার্কে বইসা একে অন্যরে জিগাইতাম, দ্বিজেন শর্মার বৈজ্ঞানিক নাম কী? বড় সরল মানুষ ছিলেন।

একবার গাছ দেখতে গাজীপুর ন্যাশনাল পার্কে যাওয়ার প্রস্তাব উঠলে উনি খুবই বিরক্ত হন। নির্জনতা প্রকৃতির অংশ বইলা মনে করতেন তিনি। নিসর্গের শব্দ কিভাবে উপভোগ করতে হয় এই বিষয়ে দ্বিজেন শর্মার চেয়ে ভাল কেউ আর জানেন না। ন্যাশনাল পার্কে একবার গিয়া উনি দেখেন, পিকনিক করতে আসা লোকেরা জঙ্গলের মাঝখানে পিকআপ ভ্যানে কইরা লাউড স্পীকার নিয়া আইসা ফুল ভলিউমে বাজায়া দিছে। তারপরে হল্লা করতে করতে বিরানী খাইতেছে। এরপর থেকে উনি আর ওইদিকে যান না।

তবে তার লগে একবার সিলেটের পাহাড়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন তিনি। সেইখানে আর যাওয়া হইলো না।

পরম নির্জনতায় প্রবেশ করলেন দ্বিজেন শর্মা। তাঁর আত্মার শান্তি হোক।

– ফেসবুক থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।