পদ || রম্যগল্প

‘চাকরীটা আমি পেয়ে গেছি দিয়া শুনছো?’

দিয়া প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারলো না। কয়েক মুহুর্তের জন্য ওর মনে হলো কিছু একটা ভুল শুনেছে। তারপর ছোটোখাটো একটা চিৎকার দিয়ে বললো, ‘তুমি সত্যি বলছো অনিক। তুমি সত্যি বলছো?’

– হ্যা বাবা হ্যা, মিথ্যা বলব কেন। মাত্র ১০ মিনিট আগে খবরটা কনফার্ম হলো। ফার্স্ট ফোন তোমাকেই করেছি। এখনো আম্মু জানেনা।

– থ্যাংকস গড, ফাইনালি আমার অপেক্ষার দিন ফুরোলো। আমি ঠিক কতটা খুশি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। আচ্ছা কি চাকরী সেটা তো বললা না।

– হু হু, সেটাই তো সারপ্রাইজ। তুমি কল্পনাও করতে পারবা না।

– সিরিয়াসলি! বলো না, বলো বলো।

অনিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুব বড় কোনো ঘোষণা দিচ্ছে এরকমভাবে উচ্চারণ করলো, ‘অন্টারিন গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ!’

দিয়া কিছু বলার ভাষাও হারিয়ে ফেললো।

– একটা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ? ওহ গড। এতো ভালো চাকরী। আমার জাস্ট বিশ্বাস হচ্ছে না।

– হু হু, আমাকে যতটা অকর্মা তুমি ভাবো আমি ততটাও না। এইটা কোম্পানির চার নাম্বার পজিশন। আমার উপরে শুধুমাত্র তিনজন। বুঝো তাইলে!

– তাই তো দেখছি। আচ্ছা শুনো আমি অন্নেক অনেক স্যরি।

– স্যরি কেন হঠ্যাৎ?

– এই যে এতোদিন তোমাকে অকর্মা ভেবেছি। কত রাগ করেছি। ভেবেছি তুমি ফান করা ছাড়া আর কিছুই পারো না।

– আরে ইটস ওকে। এগুলো তো তুমি ভালোবেসেই বলেছ। যাই হোক এখন রাখছি, অনেক কাজ। কাজ তো কেবল শুরু। আগের মত আর ফ্রি টাইম নাই। হাহা।

অনিক ফোন রেখে দিতেই দিয়া দুই হাত উচু করে একটা চিৎকার দিলো। দিয়ার আম্মু দৌড়ে আসলেন,

‘কিরে কি হলো তোর?’

দিয়া মুচকি হেসে বললো,    আব্বুকে বলে দাও ঐ ডাক্তার ছেলেকে না করে দিতে। এই বাড়িতে আমার চুপ করে কান্নাকাটি করার দিন শেষ। এখন আমি বলবো তোমরা শুনবা।’

দিয়ার আম্মু কিছু না বুঝে অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন শুধু।

মিজানের আম্মু খবরটা শুনেই মুখে আচল চাপা দিয়ে হাউমাউ কান্না শুরু করলেন। এতোদিন জমানো কষ্ট বের হয়ে আসছে আজ খুশির মুহুর্তে। ছেলেকে নিয়ে অনেক টেনশন করেছেন এতোদিন, মানুষের কথা শুনেছেন, আজ সবকিছু বুঝি শেষ হলো। মিজান চাকরী পেয়েছে। তাও যে সে চাকরী না। অন্টার না কি একটা কঠিন নামের বিশাল বড় গ্রুপ কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। এই এলাকায় এর আগে এতোবড় চাকরী কেউ পায়নি। মিজানের আম্মু অজু করে আসলেন। মানতের একশো রাকাত নামাজ শুরু করতে হবে। কাল থেকে রাখতে হবে রোজা। নামাজের সাথে সাথে ছেলের চাকরীর জন্য একমাস রোজাও মানত করেছিলেন মিজানের আম্মু। আর এতোবড় চাকরীর খবরে উনার ইচ্ছা হচ্ছে রোজা কয়টা বেশিই রেখে দিতে। আজ থেকে যে তার সুখের দিন শুরু হলো।

আদনানের দূর সম্পর্কের চাচা নাসির সাহেব আদনানের দিকে বাকা চোখে তাকালেন।

‘আদনান, আমি এখনো বুঝতে পারছি না একটা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ কি যেন নাম, হ্যা অন্টারিন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যানের পজিশন তুমি একবারেই কিভাবে পেলে।’

‘ইয়ে আঙ্কেল আসলে ঐ কোম্পানির যিনি চেয়ারম্যান আমি উনাকে খুব বড় একটা হেল্প করেছিলাম। উনি খুশি হয়েই আমাকে এই পজিশন দিয়ে দিয়েছেন।’

‘বাহ বাহ, তোমার তো পুরো লটারি লেগে গেছে দেখা যাচ্ছে। নাসির সাহেব সূক্ষ্ম একটা ঈর্ষার কাটা মনের মধ্যে অনুভব করলেন। উনার নিজের ছেলে ঢাকা ভার্সিটি থেকে পড়ে ছোটোখাটো একটা কোম্পানিতে অ্যাসিস্টেন্ট সেলস ম্যানেজার হিসাবে জয়েন করেছে আর এই পোলা একবারেই ভাইস চেয়ারম্যান। তাও এতোবড় কোম্পানির। একেই বলে ভাগ্য। এতোদিন আদনানকে নিয়ে কত হাসাহাসি করেছেন নিজের ছেলের সাথে তুলনা দিয়ে সেটা ভাবতেই লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেলেন।

আদনান অবশ্য এতো কিছু ভাবলো না। বললো, ‘চাচা আসলে যেজন্য আসা। চাকরী উপলক্ষে আব্বু বাসায় ফকির মিসকিন খাওয়াবে। আপনিও যদি একটু আসতেন। শুক্রবারে জুম্মাবাদ। মানে আব্বুকে সহযোগীতা করতে আরকি।’

নাসির সাহেব মাথা নেড়ে হ্যা বললেন। ছেলেটা যে বড় চাকরী পেয়ে হালকা খোচা মেরে গেলো সেটা বুঝলেন। এতোদিনের উপহাসের প্রতিশোধ নিল তাহলে। নিক, আজ সময় আদনানের হাতে। এতটুকু তো বলবেই।

আদনান উঠে যেতেই নাসির সাহেব বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

শরীফ চুপচাপ বসে আছে। গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার। একটা খবরের কাগজ দুইভাজ করে বাতাস নেয়ার চেষ্টা করছে। এসি নষ্ট। অবশ্য এমন না যে এসি আগে ভালো ছিলো। সে এক ফ্রেন্ডের বাসা থেকে নষ্ট এসিই জোগাড় করেছে। সবাইকে বলবে আজ সকালেই নষ্ট হলো। সারাতে হবে। এতে দাম বাড়ে। শরীফের প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। সে বসে আছে খাবারের জন্য। আজকে খাবার আনার কথা মিজানের। সকালে আলুভর্তা এনেছিলো দুপুরে কি আনবে কে জানে! মাছ হলে ভালো হবে।

শরীফ অন্টারিন গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। অফিসে একটা মাত্র চেয়ার যেটাতে সে বসে। আর যখন বাথরুমে বা বাইরে যায় তখন বসে আদনান। এজন্য আদনান ভাইস চেয়ারম্যান। মিজান এমডি আর অনিক চিফ মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। ওরা দুইজন বসে পাটি পেতে। টাকা গুছিয়ে আরো চেয়ার কিনতে হবে। কিন্তু শরীফের পকেট ফাকা। বাবার কাছেও টাকা চাইতে পারবে না। বাবা ওকে একটা মুদিখানার দোকান করে দিয়েছিলো শরীফ সেটা বন্ধ করে দিয়ে এই গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ খুলেছে। সেজন্য বাবা ওকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। খাওয়াদাওয়া করছে অন্যদের বাসা থেকে। যাদের সে চাকরী দিয়েছে। যেহেতু নিজের কোম্পানি সুতরাং মানুষকে ইচ্ছামত বড়বড় পদ দিচ্ছে। এখনো কিসের কোম্পানি এটা শরীফ জানেনা। কাজ হিসাবে ফেসবুকে পেজ খোলা হয়েছে শুধুমাত্র। ওরা সবাই নিজেদের আইডিতে ওয়ার্ক এট হিসাবে যোগ করে রেখেছে। আজকাল মানুষ দেখে শুধু বড় বড় পদ। তাই মানুষকে খুশি করার এরচেয়ে ভালো উপায় আর পায়নি সে।

ডাল আর ঢেঁড়স ভাজি দিয়ে ভাত খেতে খেতে ফোন রিসিভ করলো শরীফ। এক পুরুষ কণ্ঠস্বর, ‘বাবা আমার ছেলেটাকে একটা চাকরী দিয়ে দিতে পারবা? ছোটোখাটো হলেই হবে। তুমি এতোবড় কোম্পনির চেয়ারম্যান তোমার পক্ষে তো কিছুই অসম্ভব না। আমার ছেলে মাস্টার্স পাশ করে বহুদিন বসে আছে। অনেক ভালো রেজাল্ট। কিন্তু চাকরী পাচ্ছে না। লোকজন বাকা বাকা কথা বলছে।’

শরীফ মুচকি হাসলো, ‘ছোটোখাটো চাকরী কেন করাবেন ছেলেকে? বড় স্বপ্ন দেখা শিখুন চাচা। কাল সকালে অফিসে পাঠিয়ে দিন। আপনার ছেলে এখন থেকে অন্টারিন গ্রুপের অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজিং ডাইরেক্টর।’

ওপাশ থেকে বৃদ্ধের কৃতজ্ঞ কণ্ঠ ভেসে আসলো!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।