ডানকার্ক: নোলানের আরেক বিস্ময়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর পর্যায়, ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি। পুরো পৃথিবী দুভাগে বিভক্ত, মিত্রবাহিনী আর অক্ষবাহিনী। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলছে হরদম। সমুদ্র তীরবর্তী ফ্রান্সের ছোট বন্দরনগরী ডানকার্ক। জার্মানদের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করে কোণঠাসা ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও ব্রিটিশ সম্মিলিত মিত্রবাহিনীর প্রায় ৪ লক্ষ সৈন্য। হিটলার বাহিনী তাদেরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে এবং পিছু হটাতে হটাতে ডানকার্ক সি পোর্টে আটকে ফেলে।

‘বন্দি নয়তো মৃত্যু’ এই ছিল মিত্রসেনাদের সামনে একমাত্র পথ। এমন সময় হিটলারের বিশেষ ‘হল্ট অর্ডারে’ মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা ফিরে আসার একটা সুযোগ পায়। আটকা পড়া সেনাদের উদ্ধার অভিযানের নাম হয় ‘অপারেশন ডায়নামো’ বা ‘মিরাকল অব ডানকার্ক’। যাই হোক, ডানকার্ক ইভ্যাকুয়েশনের জন্য ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট ছোট জাহাজ আসলো, কিন্তু আটকে পড়া সৈন্য সংখ্যার তুলনায় উদ্ধারের জন্য আসা জাহাজের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য।

তাছাড়া, হঠাৎ হঠাৎ আক্রমণ হচ্ছিলো, যুদ্ধ চলছিল আকাশপথেও, যুদ্ধবিমান থেকে তাদের ওপর নিয়মিত বিরতিতে বোমাবর্ষণ হচ্ছিলো। ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সও তাদের মতো করে সেই আক্রমণ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু যেকোনো সময় আরও বড় ধরণের আঘাত আসতে পারে, তার আগেই ছাড়তে হবে এই ডানকার্ক।

অন্যদিকে একজন বয়স্ক ব্যক্তি তার কিশোর ছেলে ও ছেলের এক বন্ধুকে নিয়ে ইয়টে করে রওনা দিয়েছে ডানকার্কের দিকে। উদ্দেশ্য, যতটা সম্ভব অবরুদ্ধ ব্রিটিশ ও মিত্র সেনাদের উদ্ধার কাজে সাহায্য করা। ডানকার্ক সি পোর্টের সেই বিভীষিকাময় যুদ্ধ নিয়েই ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা—‘ডানকার্ক’।

এই ‘ডানকার্ক ইভ্যাকুয়েশন’ বা ‘অপারেশন ডাইনামো’ দেখানোর জন্য নোলান একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছেন। সেটা হলো পারস্পেক্টিভ। ৩ টি ভিন্ন পারস্পেক্টিভ থেকে তিনি এই এভ্যাকুয়েশন দেখিয়েছেন, একটি গল্প স্থলে অর্থাৎ সমুদ্র সৈকত, আরেকটি জলে অর্থাৎ মাঝসমুদ্র এবং অন্যটি, আকাশে ভাসমান যুদ্ধবিমান। এই পারস্পেক্টিভগুলো এক ঝলক দেখানোর পর শুরু হয় সমান্তরালভাবে তাদের গল্প বলা।

কখনো সৈকতে, যেখানে ৪ লাখ সৈন্যের অবস্থান, জাহাজের জন্য অপেক্ষা, প্রথম জাহাজগুলোতে আহত ও ব্রিটিশদের প্রাধান্য দেয়া ইত্যাদি কাহিনী। কখনো আকাশে যুদ্ধরত বিমান, কখনোবা ইংলিশ চ্যানেলের অপর প্রান্তে ব্রিটিশ স্বজনদের টেনশন এবং বাবা-ছেলের মাঝসমুদ্র অভিযান। তিনটি ঘটনাপ্রবাহের এরকম সমান্তরাল পরিচালনা পুরো সিনেমা জুড়েই।

কাহিনী ও স্ক্রিপ্ট দুটোই লিখেছেন নোলান নিজে। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে কিছুই নেই। আসলে সিনেমাটির কেন্দ্রবিন্দু কোনো চরিত্র নয়, বরং একটি স্থান— ফ্রান্সের বন্দরনগরী ডানকার্ক। বলা যায়, ডানকার্কই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র!

ক্রিস্টোফার নোলান— সিনেমা জগতে যেন এক বিস্ময়ের নাম। হলিউডের সবথেকে আধুনিক, কৌশলী পরিচালক হিসেবে এক নামে পরিচিত। মোটেও সোজাসাপ্টা গল্পের মানুষ নন। ‘মেমেন্টো’ ‘ইনসোমনিয়া’ থেকে শুরু করে ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ‘দ্য প্রেস্টিজ’ ‘ইনসেপশন’ ও ‘ইন্টারস্টেলার’, একের পর এক শুধু চমকই দেখিয়ে গেছেন। প্রথম যখন জানা গেলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের ডানকার্ক ইভ্যাকুয়েশনের উপর ছবি বানানো হচ্ছে, অনেকেই তখন ভেবেছিলেন আবারও হয়তো প্রচলিত ধারার একটা ওয়ার মুভি হতে চলেছে। কিন্তু সবার সব ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে নোলান যেভাবে কাহিনীবিন্যাস ও শ্বাসরুদ্ধকর জীবন্ত দৃশ্যায়ন করেছেন, তা সবার কল্পনারও অতীত।

নোলানের পূর্ববর্তী সব সিনেমায় চোখ রাখলে একটা বিষয় প্রতিয়মান হয় যে, তার ছবিগুলি একই জনরায় ঘুরপাক খেয়ে এসেছে এতোদিন; ক্রাইম, থ্রিলার ও সায়েন্স ফিকশন। আর গল্পে দেখা যেতো, আবেগের ঘনঘটা ও অতিরিক্ত সংলাপ। প্রায় সব ফিল্মেই চরিত্রদের প্রচুর ব্যাখ্যামূলক সংলাপ আওড়াতে দেখা গেছে। কিন্তু, এই ছবির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উলটো।

নিজস্ব কৌশলের বাইরে গিয়ে নতুন এক ধারার প্রবর্তন করলেন। মেদহীন সংলাপ আর উচ্চমার্গীয় শৈল্পিক উপস্থাপনা, অন্য কোনো যুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় এত নিখুঁতভাবে দেখা গেছে কি না সন্দেহ। তিনটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি টাইমলাইনে সহাবস্থান করলেও চিত্রনাট্যের সফল একাত্মবোধে ছবিটা অসাধারণ হয়ে ওঠেছে।

নোলানের সিনেমা দেখে যারা অভ্যস্থ তাদের এটা নিশ্চয়ই জানা যে, নোলনের সিনেমা মানেই অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি। আকাশ, সমুদ্র ও মাটিকে যেভাবে শ্যুট করা হয়েছে, এক কথায় অনবদ্য। বিশেষ করে, সমুদ্রের পানিতে তেল পড়ে যাওয়া তারপর সেই তেলে আগুন লাগা–সহ প্রতিটা দৃশ্যকেই একদম জীবন্ত মনে হয়েছে।

‘ডানকার্ক’র আবহ সঙ্গীতের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়, এই কাজটা দক্ষতার সাথে করেছেন হ্যানস জিমার। স্বল্প ডায়লগের এই সিনেমায় মিউজিকে তিনি বাজিমাত করেছেন। অভিনয় নিয়ে আসলে তেমন কিছু বলার নাই, এটি কোনো বিশেষ চরিত্রকেন্দ্রিক সিনেমা নয়। ডানকার্ক যুদ্ধকে শৈল্পিক রূপ দিতে ফিওন হোয়াইটহেড, মার্ক রায়লান্স, হ্যারি স্টাইলস, সিলিয়ান মারফি, টম হার্ডি-সহ আরও অনেক শিল্পীই শ্রম দিয়েছেন।

যুদ্ধ ভিত্তিক ছবি কিন্তু হলিউডে নতুন নয়। তবে অনেকেই নোলানের এই সিনেমাটিকে সর্বকালের সেরা যুদ্ধ-বিষয়ক সিনেমার কাতারে ঠাঁই দিতে চাইছেন। ঘাত-প্রতিঘাত আর শ্বাসরূদ্ধকর ১৯৪০-র সেই অপারেশন নিয়ে নির্মিত ডানকার্কের পরিপার্শ্বিক অবস্থা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, দেখে মনে হবে এটা আসলে সিনেমা না, বরং সিনেমার আবরণে থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রামাণ্য চিত্র।

সবশেষে একটা কথা বলি, ইতিহাস না জানা অনেকের কাছে সিনেমাটি পানসে মনে হতে পারে। কেননা এখানে সচরাচর সিনেমার মতো রং মেশানো কোনো দৃশ্য নেই। এটি একটি চরম বাস্তবিক চলচ্চিত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে আলাদা কোনো কথাও নেই। যেন ধরেই নেওয়া হয়েছে যা দেখানো হচ্ছে, তার সবই আমাদের জানা।

দ্য ইন্ডেপেনন্ডেন্ট অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।