নিছক দুর্ঘটনা না চূড়ান্ত গাফিলতি?

‘ভাইয়া, আমি আকাশে উড়বো! প্লেনে চড়বো!’ যাবার আগে ভাই সালাউদ্দিনকে বলে গিয়েছিল ছোট্ট প্রিয়ন্ময়ী। বাবা-মার সাথে প্রিয়ন্ময়ী উড়েছিল ঠিকই, ফেরা হয়নি। বাবা প্রিয়কের সাথে প্রিয়ন্ময়ী চলে গেছে না ফেরার দেশে।

শুধু প্রিয়ন্ময়ী কিংবা প্রিয়কই নয়, এমন অনেক তাজা প্রাণের ইতি ঘটেছে ইউএস বাংলা বিমান দুর্ঘটনায়। বিমানে মোট ৬৭জন যাত্রী ছিলেন, যাদের মধ্যে ৩২জন বাংলাদেশি এবং ৩৩জন নেপালি ছিলেন। বাংলাদেশের যাত্রীদের মধ্যে ১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১৮ জন নিহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, তাদের দাবী মোট মৃতের সংখ্যা ৪৯!

কেউ কাজে যাচ্ছিলেন। কেউ যাচ্ছিলেন স্রেফ বেড়াতে, কেউ বাড়ি ফিরছিলেন। কি দোষ ছিল তাঁদের? কে নেবে এই এতগুলো মৃত্যুর দায়? সময় যত এগোচ্ছে, দুর্ঘটনাটা নিয়ে ততই যেন উৎকণ্ঠা বাড়ছে। দুর্ঘটনাটির কারণ নিয়ে হচ্ছে নানা বিতর্ক, খোঁজা হচ্ছে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। একটা প্রশ্ন সামনে চলে আসছে, ব্যাপারটা কি স্রেফ দুর্ঘটনা, না চূড়ান্ত গাফিলতির প্রকাশ? – চলুন এই প্রশ্নের একটু উত্তর খোঁজা যাক।

  • ইউএস বাংলার বিমান

বিমানটি ১৭ বছরের পুরনো। বিমানটি সেকেন্ড হ্যান্ড না, রীতিমত ফোর্থ হ্যান্ড। অর্থাৎ চতুর্থবার ইউএস বাংলার বহরে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এর আগে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান এয়ারলাইন্স, রয়্যাল জর্দানিয়ান ও অগসবার্গ এয়ার ওয়েজের বহরে ব্যবহার হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের সালের ৪ সেপ্টেম্বর সৈয়দপুরের রানওয়ে থেকে ছিটকে যায়। তারপরও বিমানটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তাও আবার ইন্টারন্যাশনাল রুটে।

  • ত্রিভূবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দায়

বিমানের পাইলটকে অবতরণের ভুল নির্দেশনা দেয়া হয় বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে। এমনটা জানিয়েছে নেপালি টাইমস। কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পাইলটের সর্বশেষ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে। কন্ট্রোল রুম থেকে ভুল বার্তা দেয়ার কারণেই ককপিটে দ্বিধায় পড়েন পাইলট। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগ মুহূর্তে বিমানের পাইলটের সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের সর্বশেষ কথোপকথনে এমনই আভাস মিলেছে বলে গণমাধ্যমটির দাবী।

অডিও রেকর্ডের শুরুতে শোনা যায়, কন্ট্রোল রুম থেকে বিমানের পাইলটকে বিমানবন্দরের ডানদিকের দুই নাম্বার রানওয়েতে অবতরণের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। পরে পাইলট বলেন, ঠিক আছে স্যার। নির্দেশনা অনুযায়ী পাইলট বিমানটি বিমানবন্দরের ডানদিকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান কন্ট্রোল রুমে।

কিন্তু ডানদিকে রানওয়ে ফ্রি না থাকায় তিনি আবারো কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তাকে ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়। এবারে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি বর্তমান অবস্থানে থাকতে পারবেন?

এ সময় পাইলট দুই নম্বর রানওয়ে ফ্রি করার জন্য কন্ট্রোল রুমের কাছে অনুরোধ জানান। কিন্তু তাকে আবারো ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর পাইলট বলেন, স্যার আমি আবারো অনুরোধ করছি রানওয়ে ফ্রি করুন। এর পরপরই বিমানটি বিকট শব্দ করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই বিমানটি ত্রিভুবণ বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে আঁছড়ে পড়ে।

  • পাইলট আবিদ কি ক্লান্ত ছিলেন?

এয়ারক্রাফট বিএস২২১-এর পাইলট আবিদ সুলতান সকাল সাড়ে সাতটায় মিনিটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফ্লাই করে সাড়ে নয়টায় ঢাকা ফিরে এসেছেন। আধা ঘন্টা পর আবার সকাল ১০টায় টায় চট্টগ্রাম ফ্লাই করে ১২ টায় ঢাকা ফিরে এসেছেন।

আবার দুপুর সাড়ে ১২টায় তাঁ ক কাঠমুন্ডু ফ্লাই করতে হয়েছে। দুর্ঘটনা না হলে আবার তাকে ঢাকা ফেরত এসে দু’বার চট্টগ্রামে যাওয়া আসা করতে হত তাকে। এমন লোকাল বাসের মত বিমান চালালে দুর্ঘটনা হওয়াই কি স্বাভাবিক নয়?

  • দুর্ঘটনাপ্রবণ ত্রিভূবন বিমানবন্দর

নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে গত ৮ বছরে ১৫টার মত বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। পাহাড় ঘেরা এই বিমানবন্দরটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। এপর্যন্ত এখানে ৭০ টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

এর মধ্যে দু’টি দুর্ঘটনার কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ১৯৯২ সালে থাই এয়ারওয়েজের একটি এয়ারবাস অবতরণ করার জন্যে বিমানবন্দরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় একটি পাহাড়ে বিধ্বস্ত হয়। এতে ১১৩ জন যাত্রীর সকলেই নিহত হয়। সে বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হয় আরো একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা। পিআইএর বিমানটি বিধ্বস্ত হলে বিমানের ভেতরে থাকা ১৬৭ জনের সবাই প্রাণ হারায়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।