‘নারী’ শব্দটা বাদ দেওয়ার সময় এসেছে

অনূর্ধ্ব ১৫ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার জন্য বাংলাদেশ জাতীয় অনূর্ধ্ব ১৫ দলকে অনেক অনেক অভিনন্দন!

শুরুটা হয়েছিল ২০১৫ এএফসি অনূর্ধ্ব ১৪ ফুটবল টুর্নামেন্টের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়া দিয়ে, এরপর ২০১৬ তে অনূর্ধ্ব ১৫ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের চ্যাম্পিয়ন, ২০১৭ তে এশিয়া কাপে গ্রুপ পর্বে বাদ পড়লেও হার না মানা ফুটবল দিয়ে বিশবমঞ্চে নিজের ছাপ রেখেছে বাংলাদেশ জাতীয় দল।

সাফল্যের পথে সর্বশেষ মাইলস্টোন এই সাফ শিরোপা! এই দলের অনেক সদস্য আগের বছরেও ছিলেন, সিনিয়ররা মূল ‘জাতীয়’ দলে চলে গেছে সেখানেও নৈপুণ্য দেখাচ্ছে। এদের জন্য বাংলাদেশের নাম ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ১০০ এর ভিতরে চলে এসেছে… আশা করা যায় সুষ্ঠু যত্ন নিলে আগামী ৫-১০ বছরের ভিতরে বিশ্বকাপের দরজায়ও কড়া নাড়বে ‘বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল’!

সাদা চোখে উপরের অংশটা পড়ে একটু খটকা কি লাগছে? ‘জাতীয় দল’ মানে? ‘জাতীয় দল’ তো মামুনুল এমিলি রা না? যারা একবছর যাবত জাতীয় দলের হয়ে ম্যাচ খেলে না? সর্বশেষ ম্যাচে ভুটানের সাথে হেরেছিল? যাদের নামে একাধিক স্ক্যান্ডাল আর কন্ট্রভারসি আছে? যাদের ব্যর্থতার ভার বইতে বইতে বাংলাদেশ এখন ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ২০০ এর কাছাকাছি?

জি, তারাও জাতীয় দল… তারাই তথাকথিত জাতীয় দল! কিন্তু আমি বলছি অন্য জাতীয় দলের কথা… যাদের বিশেষায়িত করতে জাতীয় দলের আগে ‘নারী’ বা ‘প্রমীলা’ যুক্ত করতে হয়!

এই দেশের লাখ লাখ মেয়ে গার্মেন্টসে মানুষের বাড়িতে কাজ করে এনে সংসার চালায়, কিন্তু সেই সংসারেও তাঁর অকর্মণ্য অলস নেশাখোর পুরুষটাই ‘স্বামী’ হয়ে থাকে! তেমনি ক্রীড়াক্ষেত্রেও নারী ফুটবলাররা সম্মানের পর সম্মান এনে দেবার পরেও বছর পর পছর ধরে সাফল্যহীন পুরুষ দলটাকেই এখনও ‘জাতীয় দল’ বলা হবে! এমন অভাবনীয়, অতিমানবীয় কীর্তির পরও কিছুই বদলাবে না।

এটা না বুঝেও বলা যায় যে আমাদের পুরুষ ফুটবলাররা যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা আর আর্থিক সহায়তা পান, নারী ফুটবলাররা তাঁর ১০০ ভাগের ১ ভাগ ও পান না! প্রায় সিমিলার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসার পরেও পুরুষ ফুটবলাররা দুই এক বছরের মধ্যে গাড়িবাড়ি তুলে ফেলেন অথচ নারী দলের কিশোরী মেয়েগুলা বিশ্বমানের ফুটবল খেলে দেশের র্যাংিকিং ১০০র মধ্যে আনলেও কলসিন্দুর, রংপুর, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা কিশোরীদের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি এককড়িও। এদের ভালো বেতন, কোন বিশ্বমানের ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি, নিউট্রিশন ডোমেস্টিক স্ট্রাকচার, পাইপলাইন, কোচ তো দূরে থাক বাড়ি ফেরার জন্য বাসটাও দেওয়া হয়না! ওরা এখনও ‘নারী দল’ বা সর্বোচ্চ ‘নারী জাতীয় দল- এর বেশি কিছু নয়!

আর পুরুষদল সারা বছর ফিটনেসের ব্যাপারে অনীহা দেখাবে, অনুশীলনে মনোযোগী থাকবে না, সমর্থকদের চুপ করিয়ে দেওয়ার সেলিব্রেশন করবেন। কমিটমেন্টের কোনো ধার না ধেরে তারা পাড়া-মহল্লার কাঁদা মাঠে ক্ষ্যাপ খেলে বেড়াবেন। ফেডারেশনের সাথে, কোচের সাথে গণ্ডগোল তো নস্যি। অথচ, তারাই হয়ে থাকবেন দেশের ফুটবলের ‘পোস্টার’। এদের নিয়েই ডোমেস্টিক ক্লাব লাখ কোটির ব্যবসা হবে, এদের সামান্য একটু সাফল্যে বাড়ি গাড়ি টাকা সম্মানের বন্যা বয়ে যাবে। পরিবর্তন হবে না কেবল দেশের ফুটবল ভাগ্যে, দর্শক ফিরবে না মাঠে। জাদুঘরে চলে যাবে ফুটবলের হারানো সুদিন। র্যাং কিংয়ে পেছাতে পেছাতে এক সময় বিলীন হয়ে যাবে ফুটবল।

দায় টা যাবে পুরা দেশের ঘাড়ে! কারণ দেশ কে রিপ্রিজেন্ট তারাই করছেন কিনা ‘জাতীয় দল’ এর নাম ধারণ করে… নারীদলের সাফল্যে একটু হাততালি আর লেখালেখিই জুটবে, আর কিছু না!

এই সাইকেলটা চেঞ্জ হওয়া দরকার! ‘জাতীয় দল’ তারাই হবে, দর্শক কিংবা মিডিয়ার তারাই পাবে যারা দেশকে সেই প্ল্যাটফর্ম তা এনে দিচ্ছে! এই কৃষ্ণা, সানজিদা, মারিয়া, শামসুন্নাহারদের যথাযথ সুযোগ দেওয়ার দাবীটা এখন তাই আর জোর গলায় জানানোর কিছু নেই। এই মেয়েরাই আমাদের এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপ মঞ্চে নিয়ে যাবে!

এদের সেই স্কিল আছে! বেশি খাটতেও হবে না! আর এদের মধ্যে ছেলেদের মত ‘আমি কি হনু রে’ ভাব টা নাই জন্য এরা অনেকদুর যাবে… অন্তত মাদকাসক্ত হয়ে ফিটনেস নষ্ট করবে না বা ক্ষ্যাপ খেলতে গণ্ডগ্রামে দৌঁড়াবে না! খালি কোন মেয়ের যাতে অকালে বিয়েটা না হয়ে যায় বা অন্য কোনো পারিবারিক কারণে খেলা থেকে যেন সরে না যায় সেটা নিশ্চিত করতে হয়।

জাতীয় ফুটবল দলের আগ থেকে ‘নারী’ বিশেষণ টা বাদ দেওয়া উচিৎ এই মুহূর্তে। আমাদের ‘জাতীয় ফুটবল দল’ আমার কাছে মেয়েরাই!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।