নাটক + চুইংগামের মত টানাটানি = সিনেমা?

আজকাল বাংলাদেশি সিনেমাকে অনেকেই ‘নাটক’ বলে গালি দেন। হ্যাঁ, গালিই বলব। কারণ যারা সেগুলা বলেন, তারা ‘নাটক’ এর সংজ্ঞাও সঠিক জানেন বলি আমার ধারণা। আমিও মহা পন্ডিত না। তবু এতটুকু মনে হয় সবাই জানেন, নাটক কথাটা এসেছেই মঞ্চ থেকে। ‘মঞ্চনাটক’ যাহা লাইভ দর্শকের মাঝে পরিবেশিত হয়। তাহলে এখন টিভিতে যা দেখি তাকে নাটক বলি কেন?

আর যদি তাহা নাটক নাই হয়, সেগুলা কি? আর এখন শর্ট ফিল্মের জোয়ারে আরও বেশি করে প্রয়োজন হয়ে গেছে সঠিক ক্যাটাগরিতে ফেলা। সাধারণের চোখে যা ব্যাপ্তিতে লম্বা তাই চলচ্চিত্র/সিনেমা/ফিল্ম/মুভি। স্বল্পদৈর্ঘ্য হলেই সেটা নাটকের আবডালে চলে আসে। তবু অনেকে ২ ঘণ্টার সিনেমা বিরক্ত হলে সেটাকে ‘নাটক’ বলিতে দ্বিধা করেন না, আরও বলেন যে ‘নাটকের গল্পকে বলে টেনে টেনে লম্বা করে সিনেমা বানানো হয়েছে।’ তাহলে নাটকের গল্প কি আর সিনেমার গল্পই বা কি?

সিনেমায় প্রায়ই আমরা ‘মেলোড্রামা’ টার্মটা শুনি, যার অর্থ দাঁড়ায় নাটকীয়তা। তো সিনেমায় নাটকও থাকে? কনফিউজিং হচ্ছে একটু?

সম্প্রতি ‘ডুব’, ফারুকির পূর্বের বেশিরভাগ ‘সিনেমা’ই অনেকের কাছে ‘নাটক’। আমার কাছে না। আমার কাছে মনে হয়েছে এহেন ধারনার কারণ – সিনেমা বলতে এনারা গল্পের বিবিধ টুইস্ট, গান, থ্রিল, লং শটস, লাউড ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, সর্বোপরি জাঁকজমকপূর্ণ ক্যানভাসই বোঝেন। কিন্তু minimalist approach, nuanced, subtle ব্যাপারের মাঝেও যে ‘সিনেমা’ বানানো যায় সেটা জানেন না/ বোঝেন না।

আমিও যে খুব বুঝি তা না, যতটুকু বুঝি তাঁর চেয়ে বেশি জানতে চাই, ব্যাপারটা নিয়ে comprehensive discussion করতে চাই। তাই এই পোস্টটা করা। এখানে যতটুকু যা জানি বা বুঝি তা পয়েন্ট আউট করার চেষ্টা করলাম।

নাটক আর সিনেমার মাঝে পার্থক্য আসলে কি? আমি যতটুকু বুঝি সেগুলা শেয়ার করছি।

১. প্রথমত আমাদের দেশে এক পর্বের নাটক বলে যা হচ্ছে ভালগুলাও সেগুলাকে নাটক না বলে টেলিফিল্ম বলা ভালো। নাটক বলতে শুধু সিরিয়ালগুলাকেই বুঝানো উচিত। কারণ- নাটকে চরিত্র একটা লম্বা সময় ধরে একিরকম আচরণ ধরে থাকবে, পরিবর্তন হবে অনেক স্লো, অনেক সময় নিয়ে। সিনেমায় প্রগ্রেশান আরও দ্রুত।

টেলিভিশন নাটক হল ‘mostly based upon concepts that are selling at the moment where as movie makers try different things which is a reflection of their creative talent.’ সহজভাষায় বললে টিভিতে সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগ কম, পন্য বিক্রয় করার সুযোগ বেশি। সিনেমায় সৃজনশীলতা বেশি দেখানো যায়।

২. নাটক শুধু সমসাময়িক সমাজকে তুলে ধরবে, এর দীর্ঘস্থায়ী টাইম ভ্যাল্যু নাও থাকতে পারে। সিনেমা হতে হবে এমন যা যুগ আর সমাজের গণ্ডীর বাইরে।গল্পের দিক থেকে তা সার্বজনীন যত হবে তত বেশি ‘সিনেমা’ হবে, যেখানে চারিত্রিক প্রতিফলন গভীর হবে, কমপ্লেক্স হবে নাটকের চেয়ে। গল্পের পরিধি, নিরীক্ষা বেশি করা যাবে, নাটকে অতটা না, নাটক হতে হবে সহজবোধ্য যার গঠন আর ট্রিটমেন্ট এমন হতে হবে যাতে আগ্রহ পুরাটা সময় যে করে হোক ধরে রাখে। তাই এখানে সৃষ্টিশীলতার জায়গা কম সিনেমার চেয়ে।  সিনেমাতে আমরা সবাই কোনো স্পেশাল, একদম ফ্রেশ ও অভিনব কিছু খুঁজি।

৩. নাটকের স্ট্রাকচার এমন হবে, যেখানে জায়গায় জায়গায় বিজ্ঞাপন ঢুকালেও দর্শকের আগ্রহ বজায় থাকে, তা না হলে সেটা নাটকও হবেনা, সিনেমাও না। সিনেমায় ফিল্মমেকার ইউনিক গল্প, নির্মাণ, অভিনয় বিভিন্ন জিনিসে অতিরিক্ত মুন্সিয়ানা দেখিয়ে দর্শককে হলমুখি করার বিভিন্ন উপাদান রাখবে, প্রোডাকশন, ক্যামেরা, সাউন্ড ডিজাইন – সব দিক থেকে ডিটেইল্ড এবং ভাস্ট হবে – এখন সেটা বুঝার চোখ যেই দর্শকের নাই, সে সিনেমাকে নাটকই বলবে।

৪. structurally আর ফোকাসের দিক থেকে সিনেমা/ফিল্মকে হতে হয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সলিড, থ্রি-অ্যাক্টে, যার মূল থিম শুরু থেকেই থাকবে, সে উদ্দেশ্যে এর পেসিং উঠানামা করতে পারে গল্পের প্রয়োজনে। নাটক হতে হবে আরও টাইট, থিমের চেয়ে প্রতিটা সময়ে দর্শককে আটকে রাখার মত উপাদান থাকতে হবে। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে নাটক বানানো অনেকের জন্যই কঠিন সিনেমার চেয়ে। যে কারনে নাটকে গল্পকারের অবদান বেশি, সিনেমায় পরিচালকের।

৫. তাই বলা যায়, নাটকে লেখনী (সংলাপ, চিত্রনাট্য) আর অভিনয় নির্ভর, টেকনিক্যাল বাকি জিনিসগুলায় অত বাজেট না থাকলেও চলে। সিনেমায় শুধু সংলাপ-অভিনয় না, পরিচালনা-শব্দ নিয়ন্ত্রন-আবহ সঙ্গীত-শিল্প নির্দেশনা এ অনেক বেশি জোর দিতে হয়।

৬. অভিনয়ে ডিটেইলিং অনেক বেশি হতে হয় সিনেমায়, যেহেতু বড় পর্দায় অভিব্যক্তির দুর্বলতা ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে। নাটক সংলাপনির্ভর, সেখানে অভিব্যক্তির/ সাইলেন্ট অভিনয় এর চেয়ে সংলাপ বলে যাওয়াটাই বেশি ডিমান্ড করে।

৭. বাজেটের কথা বলে অনেকে। আজকাল সল্প বাজেটেও দারুণ দারুণ সিনেমা হচ্ছে, আগেও হত। তবে সবাই পারেনা। এবং পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেও সিনেমায় বাজেট নাটকের চেয়ে বেশি বলেই দেখা যায়।

৮. সিনেমা দেখা হয় আয়োজন করে। অন্ধকার ঘর, বিশাল পর্দা, টিকিট কেটে ঢোকা, শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিপূর্ণ মনোযোগ দাবী করে। আর টিভি নাটক দেখার সময় রিমোর্ট আমাদের হাতে থাকে, টিভি চলতে থাকে আমরা গল্প করি, অন্য কাজ করি, আবার তাকাই, খাই চ্যানেল পাল্টাই, বিরতি আর মন:যোগ নষ্ট হওয়ার হাজারটা কারন আছে।

মোদ্দা কথা – নাটকে সর্বক্ষণ মনোযোগ না দিলেও চলে, কিছু মিস হলেও বোঝা যাবে, সিনেমা হতে হলে প্রতিটা সেকেন্ডকে মিনিংফুল করতে হবে যাতে মিস করার অবকাশ নাই। আর আমাদের দর্শকদের অ্যাটেনশান টু ডিটেইলস তুলনামুলক কম বলেই হয়ত উপমহাদেশের সিনেমাগুলায় ‘বিরতি’ সিস্টেম রাখা হয়।

এগুলা আমার একান্তই নিজস্ব দর্শন আর ফাইন্ডিংস। মূলত আমাদের দেশে ‘নাটক’ কনসেপ্টটাই এখন পরিবর্তনের সময় এসেছে, যেটা আমাদের চ্যানেলগুলাকেই করতে হবে। ব্যপ্তির উপর নাটক/সিনেমা নির্ভর করেনা। আয়নাবাজি সিরিজ/অস্থির সময়ে স্বস্তির গল্প দেখিয়েছে যে ৪০ মিনিটেও একটা সিনেমা লাইক অভিজ্ঞতা দেয়া যায়।

এখন সিরিয়ালগুলাকেই নাটক বলা যায়। টেলিফিল্মের নামে যা হচ্ছে সেগুলা নাটক থেকে যোজন যোজন দূরে, বেশিরভাগ সময়েই মহা বোরিং হয়, ধরে রাখার কোন ব্যাপার নেই। সেগুলা আসলে টিভি মুভি। আজকাল অনেকে তাদের এক ঘন্টার কাজকে ‘ভিডিও ফিকশান’ নাম দিচ্ছে। ঠিক আছে, এক ঘন্টার নাটকগুলা এখন আসলে নাটক না, একেকটা টিভি মুভি। যাই হোক, এর বাইরে আরও কিছু থাকলে জানার জন্যও মুখিয়ে থাকলাম।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।