নাচপাগল সেই তোতলা ছেলেটি

এক ক্ষুদে বালকের গল্প বলছি।

তাঁর কথায় জড়তা ছিল। সহজ ভাবে বলতে গেলে, কথার বলার সময় তোতলাতো। হয়তো কথা বলতে ভয়ও পেতো।  আর দশটা শৈশবের মত দুরন্তপনায় কোনো ছাড় না দিলেও কথা বলার সময়ই যেন সব এলোমেলো হয়ে যেত।

যদিও মাইকেল জ্যাকসনের ভক্ত সেই ছেলেটি অতটুকু বয়সেই বেশ ভাল নাচতো। একদিন সাহস করে তাই বাবাকে বলেই ফেললো, ‘আমি অভিনেতা হতে চাই।’

এই সামান্য কথাটা বলতেও নাকি তাঁর লেগেছিলো গোটা দুই মিনিট। বাবা সেদিন অবাকই হয়েছিলেন। ছেলের অদম্য ইচ্ছাশক্তিটা তার মনে ধরে গিয়েছিল। যদিও নিজে এক কালে স্ট্রাগলিং অভিনেতা ছিলেন, অভিনয় জগৎটা কতটা কঠিন ভালই জানা ছিল তাঁর।

ছেলেকে তাই বাস্তবতা বোঝালেন। বললেন, ‘এই ছোট্ট কথাটাই তুমি ঠিক মত বলতে পারছো না। অভিনেতা হবে কি করে?’

এবার এক তরুণের গল্প বলি।

বয়স তখন মাত্র ২১।  স্কোলিওসিস ধরা পড়ল! স্পাইনের একপাশে বাঁকানো। ঠিক মত দাঁড়াতেই পারতেন না তিনি। ডাক্তার সাফ বলে দিয়েছেন, ‘দৌড়ানো তো বটেই, এমনকি দ্রুত হাঁটাও যাবেনা, নাচ তো অসম্ভব! এর বাইরে গেলেই পুরো জীবন হুইলচেয়ারে কাটাতে হবে!’

প্রথম গল্পের বালক আর দ্বিতীয় গল্পের তরুণ আসলে একই মানুষ! কে ভেবেছিল একদিন সেই বালকই একদিন মুঘল সম্রাট আকবরের চোস্ত উর্দু বলবে, কে ভেবেছিল এই বালকই ‘কাইটস’-এ নিখুঁত স্প্যানিশ ও ইংরেজি বলতে পারবে! সেদিন কেই বা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিল যে, এই তরুণই পরবর্তীতে ‘এক পাল কা জিনা’, ‘ম্যায় অ্যায়সা কিঁউ হুঁ’ বা ‘ধুম মাচালে’র মতো গানে নাচের ট্রেন্ডসেটার হয়ে ওঠেন, পরিণত হন বলিউড তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেরা ড্যান্স আইকন!

এই বালক বা তরুণটি হলেন স্বয়ং হৃতিক রোশন। রাকেশ রোশন নাগরথ ও পিঙ্কি রোশনের ঘর আলো করে ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারি জন্ম হয় হৃতিকের। রাকেশ রোশনের ডাকনাম ছিল ‘গুড্ডু’। সেটা উল্টিয়ে হৃতিকের ডাকনাম রাখা হয় ‘ডুগ্গু’! পরিবার থেকে ইন্ডাস্ট্রি, পরবর্তীতে হৃতিক পরিচিতি পায়  সকলের প্রিয় ‘ডুগ্গু’ নামেই।

বাবা রাকেশ রোশন এক কালে অভিনেতা হিসেবে খুব বেশি সফল না হলেও পরবর্তীতে নির্মাতা হিসেবে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। এমন একজন বাবার ছেলে হলে সুযোগ তো সহজেই মিলে যাওয়ার কথা।

না, ‍হৃতিকের জন্য সুযোগ সহজে আসেনি।  বাবা রাকেশ রোশন আসলে ছেলেকে বিনোদন জগতে আনতেই চাননি। হৃতিক ভাল ছাত্র ছিলেন। মুম্বাইয়ে সিডেনহ্যাম কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করার পর তার আমেরিকায় স্কলারশিপও জুটে গিয়েছিল। পরিবারও চেয়েছিল হৃতিক বাইরে পড়তে যান।

কিন্তু, তাঁর মনে যে তখন অভিনেতা হওয়ার তীব্র স্বপ্ন। বাবাকে নিজের ইচ্ছার কথা বললেন। বাবা অবশ্য শুরুতেই খুব সহজে হৃতিককে সুযোগ দিয়ে ফেলেননি।  বরং, বাবার সাথে লম্বা সময় পর্দার আড়ালের কাজে থাকতে হয়েছে তাঁকে। ওই সময় কি না করেছেন তিনি। কখনো ট্রলি টেনেছেন, কখনো মেঝে পরিস্কার করেছেন। এর মধ্যে শ্যুটিং শেষে একা একাই ডায়লগ আওরাতেন।

টানা ছয় বছর বাবার সাথে কাজ করে যখন তিনি পরিপক্ক তখন শুরু হল ক্যামেরার সামনে কাজ। ১৯৯৮ সালে শুরু হয় ‘কাহো না প্যায়ার হ্যায়’ সিনেমার শ্যুটিং। মুক্তি পায় ২০০০ সালে।

বাকিটা ইতিহাস! সে বছর কেবল সিনেমাটি সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাই ছিল না, জিতে নিয়েছিল রেকর্ড ৯৩ টি পুরস্কার!

হৃতিকের ক্যারিয়ার অবশ্য আশির দশকেই শুরু হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে রজনীকান্তের সিনেমা ‘ভগবান দাদা’ তে তিনি ছিলেন ‘গোবিন্দ’ শিশু চরিত্রে। এটাই তাঁর প্রথম স্বীকৃত চরিত্র। তখন হৃতিকের বয়স মাত্র ১২।  তবে, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ এই সময়ে আরো চারটি ছবিটি অল্প কিছুক্ষণের জন্য ছিলেন হৃতিক। সেই হিসেবে তার প্রথম সিনেমা ১৯৮০ সালের ‘আশা’। জয় ওম প্রকাশের সিনেমায় জিতেন্দ্র আর রীনা রায়ের সাথে হৃতিকও ছিলেন অল্প কিছুক্ষণ। সেটাও আবার একটা গানের নাচের দৃশ্যে। প্রথম সেই নাচের জন্য হৃতিকের পারিশ্রমিক ছিল ১০০ রুপি!

‘ভগবান দাদা’ সিনেমার আগেই হৃতিক নিজে নিজে অনুশীলন করে কথা বলার জড়তা কাটিয়ে উঠেছেন পুরোপুরি। আর এরপর নায়ক হওয়ার আগে অনেক ডাক্তার দেখিয়ে, অনেক পরিশ্রম করে শারীরিক ঘাটতিটাও পুষিয়ে নিয়েছেন।

তিনি মাইকেল জ্যাকসনের বিশাল ভক্ত। কিন্তু, মঞ্চে বা সিনেমায় যখন নাচেন, তখন লোকে মাইকেল জ্যাকসনের নামই ভুলে যেতে বসে। ক্যারিয়ারটা খুব অল্পদিনের নয় হৃতিকের। এখনো কাজ করেন খুব বেছে বেছে।

হৃতিক আক্ষেপ করতে পারেন, মাত্র ছয় বছর বয়সে জীবনের প্রথম সিনেমার জন্য ১০০ রুপি পেলেও, সিনেমার শেষে ক্রেডিট লাইনে নাম আসেনি তাঁর। তবে, এটা ভেবে গর্বও করতে পারেন যে, এখন প্রযোজক-পরিচালকরা ক্রেডিট লাইনে ‘হৃতিক রোশন’ নামটা রাখার জন্য হলেও কোটি কোটি রুপি খরচ করতে রাজি! একজন অভিনেতা, একজন সুপারস্টারের সার্থকতা তো এখানেই!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।