নব্বইয়ের সুপারস্টার কিংবা একালের ওয়ান ম্যান আর্মি!

আশির দশকের শেষ ভাগ। পরপর বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক সফল ছবি উপহার দিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন তরুণ এক নায়ক। মুক্তি পাবে ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, সঙ্গে নায়িকা অঞ্জু ঘোষ, যার পরপর ১৭ টা ছবি ফ্লপ। সেই কারণে বড় বড় প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা নিতে চাইলেন না এই ছবি।

কিন্তু মুক্তির পর পুরো ভিন্ন চিত্র, বিপুল সাড়া ফেলল এই ছবি। বাংলা চলচ্চিত্রে বহু সিনেমা রেকর্ড পরিমান ব্যবসা করেছে, তবে আজো এই ছবিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যবসা সফল ছবি হিসেবে নাম লিখিয়েছে এই ছবি। এই সিনেমার সাফল্যের পরেই নায়ক রাজ রাজ্জাক, এফডিসিতে সবার সামনে এই নায়ক কে ‘সুপারস্টার’ খেতাবে ভূষিত করলেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় নায়ক কিংবদন্তি ইলিয়াস কাঞ্চন।

কলেজ ফাঁকি দিয়ে যেই নায়িকার সিনেমা দেখতে হলে যেতেন, সেই ববিতার সাথেই অভিনয় করে শুরু হয়েছিল তাঁর চলচ্চিত্র যাত্রা। প্রথম অভিনয় ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া সুভাষ দত্তের বিখ্যাত ছবি ‘বসুন্ধরা’, ব্যবসায়িক সাফল্য না আসলেও বেশ প্রশংসিত হয়েছিল,বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার ও জিতে নেয়।

তাঁর পরের দুটো ছবিও বিখ্যাত,ডুমুরের ফুল ও সুন্দরী। কিন্তু তারপর পথটা সেভাবে মসৃন হলো না,প্রতিদন্ধিতার ভিড়ে একক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেন না, শুরু করলেন পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়। নিজের পারিশ্রমিক পাবার জন্য প্রযোজকদের অফিসের ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন,কিন্তু নিজের প্রাপ্য টুকু ঠিকভাবে পেতেন না। আশির দশকের মাঝখান পর্যন্ত এই দুরবস্থায় কাটান,এই সময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমা শেষ উত্তর, নালিশ, অভিযান, কলমীলতা।

১৯৮৬ সালে শরৎ সাহিত্য নিয়ে আলমগীর কবিরের ছবি ‘পরিনীতা’য় অভিনয় করে জাতীয় পুরস্কার পাবার পর সবার নজরে আসেন। সঙ্গে ‘আঁখি মিলন’ ছবিটিও পায় বাণিজ্যিক সফলতা। এরপর একে একে সহযাত্রী, নীতিবান, ভেজা চোখ, ভাইবন্ধু, প্রতিরোধ পরপর সব সিনেমা বাণিজ্যিক সফল, বেদের মেয়ে জোছনার বড় সাফল্য তাকে এনে দেয় শীর্ষস্থানের খেতাব।

আশির দশকে যে সমুজ্জ্বল ক্যারিয়ার গড়েছিলেন, সেই যাত্রা নব্বই দশকেও ছিল সমুজ্জল। তিনি ছিলেন বাণিজ্যিক ভাবে সবচেয়ে সফল ও ব্যস্ত নায়ক। প্রতি বছর মুক্তি পেতে থাকে রেকর্ড সংখ্যক ছবি, যার বেশিরভাগই ছিল সফল। এই দশকে তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবি ত্যাগ, চরম আঘাত, ভাংচুর, শেষ রক্ষা, প্রেমের প্রতিদান, সম্মান, জন্মদাতা, স্নেহের প্রতিদান, মহান বন্ধু, আত্বত্যাগ, বাঁশিওয়ালা, আদরের সন্তান, আয়না বিবির পালা, মৃত্যুর মুখে, মহা গ্যাঞ্জাম, কমান্ডার, চাকর, দরদী সন্তান, রাজার ভাই বাদশা, দুর্জয়, বন্ধন, অচেনা।

একবিংশ দশকে চলচ্চিত্র থেকে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। এই সময়ে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে চেয়ারম্যান, শাস্তি, হাজী শরিয়তউল্লাহ, নিরন্তর অন্যতম। মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘বিজলী’ নামের একটি ছবি।

নায়ক হিসেবেও নয়, প্রযোজক হিসেবেও তিনি সফল। ‘মাটির মানুষ’ হচ্ছে ওনার প্রযোজিত প্রথম ছবি, এরপর আরো কয়েক টি ছবি প্রযোজনা করেন। পরিচালনা করেন বাবা আমার বাবা ও মায়ের স্বপ্ন নামে দুটি। বাংলা চলচ্চিত্রের গানের জগতেও রয়েছে বিশাল উপস্থিতি। ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে, বেদের মেয়ে জোছনা, জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প থেকে এই জীবন তোমাকে দিলাম, আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারাসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান।

বাংলা চলচ্চিত্রের এই চিরসবুজ নায়ক, ববিতা থেকে পপি সবার সাথেই দারুণ মানিয়ে যেতেন, জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন দু’টি। তবে শেষের টা তিনি প্রত্যাখান করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় নায়ক নিয়ে কিছুটা আক্ষেপও আছে। নব্বই দশকের শেষে একের পর এক মূলধারার বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় না করে যদি কিছুটা ভিন্নধর্মী ছবি বা গল্পনির্ভর ছবিতে অভিনয়ের চেষ্টা করতেন, তাহলে বাংলা চলচ্চিত্র তখন এত দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হতোনা।

ওনার মত কিংবদন্তিকে ফাটাকেষ্ট টাইপ ছবিতে এখনো দেখতে হয়, সস্তা বিজ্ঞাপনের মডেল হন এটা হতাশাজনক। মুনমুনের সাথে একাধিক ছবি করা ব্যক্তিগত ভাবে ভালো লাগেনি। এখনো যদি তিনি নিজেকে একজন নায়ক না ভেবে দক্ষ অভিনেতা হিসেবে অভিনয়ে আসেন, তাহলে বাংলা চলচ্চিত্র এর সুফলতা পাবে।

ব্যক্তিজীবনে প্রথম বিয়ে করেছিলেন জাহানারা কাঞ্চনকে। সেই সংসারে রয়েছে দু’টি সন্তান। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক ভাবে তিনি সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান, তারপর থেকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সাথে যুক্ত আছেন। দ্বিতীয় বিয়ে করেন প্রয়াত চিত্রনায়িকা দিতিকে, কিন্তু এই সংসার বেশিদিন টিকেনি। বেশ কয়েক বছর আগে, আবার তিনি বিয়ে করেছেন। নিজের দুই সন্তানও সংসারী হয়েছেন।

২৪ ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্ম নেন এই স্বনামধন্য অভিনেতা। সমাজসেবায় তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। এখন এটাই তাঁর বড় পরিচয়। পর্দার হিরো এখন বাস্তবের সুপার হিরো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।