ধুলো জমা চিঠি || ছোটগল্প

চৈত্রের দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পা টিপে টিপে লাইব্রেরীতে প্রবেশ করে তিশি। এ বাড়িতে তাদের নিজস্ব একটা বিশাল লাইব্রেরী আছে। দাদা বলেছিলো তিন পুরুষ ধরে বইগুলো সংগ্রহ করেছেন তারা। বাবা-চাচাদেরও কিছু আছে। মায়ের মুখে শুনেছে, মার বই পড়ার নেশা ছিল মারাত্তক। একটা বই পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ঘুমুতেই পারতো না। বাবার সঙ্গে বিয়ের পিড়িতে বসার জন্য এই লাইব্রেরীটাও নাকি একটা কারন। অথচ তার মেয়ে হয়ে তিশির বই পড়ার অভ্যেস একদমই নেই, ওর ঘুরতে ভালো লাগে। বই পরে একটা জায়গা সম্পর্কে জানার চেয়ে ঘুরে দেখে জানাতেই আগ্রহ বেশী তার।

আজ থেকে ঠিক চারদিন পর, তিশিরা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। বেশ বড় আর চারধারে খোলা দোতলা বাড়িটা এরপর আর এমনটি থাকবে না। ডেভলপারকে দিয়ে দেয়া হয়েছে, তাই আপাতত ওরা একটা ভাড়া বাড়িতে গিয়ে উঠছে। চাচারা আগেই চলে গেছেন, তিশি আর তরুনের পরীক্ষার জন্য আটকে ছিল বাবা। তিশি আর তরুন জমজ না হলেও একই ক্লাশে পড়ে।এবার এস.এস.সি দিলো দু’ভাই বোনেতে। এ বাড়িতে তিশির জন্ম, বড় হওয়া-বেড়ে ওঠা। কত স্মৃতি এ বাড়িকে ঘিরে।

চাচাতো সব ভাই বোন মিলে এক সঙ্গে বড় হয়েছে আপন ভাই বোনের মত করে। কিন্তু এবার ফিরে এভাবে আর থাকা হবে না, সবাই যার যার ফ্ল্যাটে আলাদা হয়ে যাবে। দিদান মারা যাবার পর থেকেই এ বাড়ির লোকেরা কেমন উঠি উঠি করছিলো। দিদান… মানে বাবার মা, সবাইকে আদর করলেও তিশিকে কোন এক কারনে অপছন্দ করতো। দেখলেই খেকিয়ে উঠতো জানো। মাকে বলেছিলো তিশি সে কথা, হেসে উড়িয়ে দিলেও মনে হয় মা সেটা লক্ষ্য করেছিলেন। তিশির জন্য মাকেও কম বকুনি খেতে হয়নি দিদানের। সেই দিদান মারা যাবার বছর না ঘুরতেই সবাই আলাদা হয়ে গেলো!

তিশির উপর ভার পরেছে লাইব্রেরীটার। সব বই তারা পাবে না। কিছু বই বাবার, কিছু জ্যাঠু-কাকুরা নিয়ে গেছে যাবার সময়। যেগুলো আছে, সেগুলোই ঝেড়েমুছে ট্রাঙ্কে ভরতে হবে, নতুন বাড়ি যেয়ে সাজানোর দায়িত্বটাও তিশিকেই দিয়েছেন বাবা। লাল মলাটের একটা বই হাতে নেয় তিশি, মায়ের খুব প্রিয়। বহুদিন মাকে এ বই হাতে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ভাবতে দেখেছে সে। বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টাতেই একটা চিঠি পেয়ে যায় তিশি। হলদে হয়ে আসা, খামহীন ছোট্ট চিঠি। অন্যের চিঠি পড়তে নেই সে জানে, তবুও এখানে তো কেউ তাকে দেখছে না এই ভেবে খুলেই ফেললো ভাজটা। সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে লিখা দু লাইনের ছোট্ট চিঠি…

সই,

আমার মেয়েটাকেও পারলে একটু আদর দিস।

উপরে তিশির জন্ম তারিখটা !

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।