ধর্ষণ ও ‘এসব কাউকে বলা যায় নাকি’ থিওরি

ধর্ষিত হলে নিজেকে সবচেয়ে পাপী হিসেবে বিচার করতে হয় এবং কখনই কোন ধর্ষকের শাস্তি কামনা করা যায় না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় তেমনই মনে হচ্ছে।

যাক, বনানীর দুজনের জন্য জাতির একটু বিবেক জাগ্রত হল বুঝি! ৮ বছরের মেয়েটা, ৬ বছরের শিশুটা কিংবা ট্রেনের নীচে আত্মহুতি দেয়া পিতা কন্যাদের আত্নাগুলো একটু হাসবে না হয় এবার!

যেইসব লোকেরা ধর্ষনের পেছনে কারণ খুঁজতে যান কিংবা সে অনুযায়ী ডিফেন্স করেন তারা এক একজন প্রচন্ড রকমের খারাপ মস্তিকের অধিকারী। পোশাক, লাইফস্টাইল, চালচলন আরো কত না কারণ আপনারা খুঁজে পান!

সবার মত নারীর শারীরিক গঠন একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার। ঠিক যেমন আপনার মায়ের দেহেও দুটি স্তন রয়েছে, একটি যোনী রয়েছে, সুডৌল নিতম্ব রয়েছে তেমনটাই যে কোন পুর্ন বয়সের নারীর রয়েছে। হাত, পা, চোখ যেমন দেহের অংশ, এগুলোও তাই। এই অঙ্গগুলোই কেন মুহূর্তে আপনার পশুত্বকে জাগ্রত করে দিবে!

বেশ কিছুদিন আগে আমাকে ইনবক্সে এক মেয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করেছিলো, ‘আচ্ছা আপু, ধর্ষিত হয়ে বেঁচে থাকাটা কি খুব বড় পাপ’? জবাবে বলেছিলাম, ‘মোটেও না আপু’। সে বলেছিলো, ‘তবে কেন জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে মানুষ চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় ধর্ষিত হওয়াটা ধর্ষিতারই দোষ’। আমি ম্যাসেজ সিন করে অনেকক্ষণ রিপ্লাই দেইনি। কি বলবো মেয়েটাকে! কত কষ্ট বুকে নিয়ে হয়ত কথাটা বলেছে।

পোশাকের দায় দিচ্ছেন? অন্যদের কথা বাদ দিন। আমার কথাই বলি। পোশাকের ব্যাপারে আমি যথেষ্ট শালীন। এই ২ সপ্তাহ আগেও মিরপুর ১ এ আমাকে দেখিয়ে একজন ভ্যানওয়ালা তার যৌনাঙ্গ হাত দিয়ে নাড়ছিলো এবং আমাকে পাস করে যাওয়ার সময় জিব দিয়ে খুব বাজে অঙ্গভঙ্গি করছিলো। আমি তো এমন কোন পোশাকে ছিলাম না যা একজনের পশুত্বকে জাগ্রত করে দিতে পারে। ভার্সিটির ক্লাস শেষে ক্লান্তি নিয়ে বাসের অপেক্ষায় ছিলাম।

লেগুনা, বাস, শপিং মল কোথায় আমরা যৌন নিপীড়নের শিকার হইনা বলতে পারেন? আপনারা সুশীলরা তো আবার বলবেন ভীড়ে যাবা কেন, বাসে দাড়াবা কেন? তো ভাই, আপনার মেয়ে হইলে একদিক থেকে মায়ের নাড়ী কাইটেন আর একদিক থেকে তার দুই পায়ে শিকল আটকে দিয়েন।

পুরুষের পুরুষত্ব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বরং না থাকাটা সমস্যা। কিন্তু সেই পুরুষত্বকে যদি আপনি সামলাতেই না পারেন তবে কি লাভ বলুন! কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটে নারীর দেহের ভাঁজে হাত ছুঁয়ে কি এমন পুরুষত্ব জাহির করতে চান আপনারা?

বলবেন হয়তো, তোমার সাথেই ক্যান সবসময় এগুলা হয়? নারে ভাই, আমার সাথে না, আমরা যারা নিজদের কাজ/পড়াশোনা/অন্য কোন দরকারে ঘরের বাহির হই তাদের প্রায় ৮০% ই যৌন নিপীড়নের শিকার হই। আমি ঠাস ঠাস করে সত্যটা বলে ফেলি আর অন্যরা ‘এসব কাউকে বলা যায় নাকি’ থিওরিতে আটকে থাকে। এটাই পার্থক্য।

আমাদের সমাজের বর্তমান অবস্থা খুব খারাপ। বিশ্বাস করুন আমাদের কন্যরা তাদের মামা/চাচা/কাজিনের কাছেও হয়ত সেইফ না। একটু খেয়াল রাখুন।

আমাদের সামাজিকতা আমাদের নষ্ট করে। আমরা শিখিয়ে দেই সন্তানদের এসব বলতে মানা, ছি! এসব কথা কাউকে বলতে নেই! আর তাই ৪ বছরের বাচ্চাটাকে পাড়ার চাচা যখন কোলে নেয়ার উছিলায় বুক টিপে ধরে রাখে, সে কথা সে কাউকেই কখনো বলেনা। এসব বলতে নেই কিনা!

আসুন শুরুটা আমাদের থেকেই করি। মেয়ে সন্তানকে বুঝিয়ে দেই তার দেহে অনিচ্ছাকৃত কারো হাতের আনাগোনা যেন আমাদের জানায়। আসুন বয়ঃসন্ধিকালে পৌছালে ছেলে সন্তানকে বুঝিয়ে বলি মেয়েদের শারীরিক গঠন, সমস্যা বা অন্যকিছু নিয়ে। যাতে নিষিদ্ধ জানার চাহিদা তাকে পশু না করে বরং নিজের মায়ের মত অন্য মেয়েদের প্রতিও সম্মান জন্মে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।