দেশে নিজেদের অজেয় বলেই ভাবি: সাকিব

বর্তমান সময়ের সেরা অলরাউন্ডার কে? ইংলিশ গ্রীষ্মে এ বিতর্ক আবারও জেগে ওঠে। কেননা, এই সময়ে মঈন আলী, বেন স্টোকস, ভারতীয় স্পিন জুটি রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর রবীন্দ্র জাদেজা ব্যাট আর বলে সমানভাবে রাজ করেছেন ।

তবে, এই বিতর্কে একজনকে উপেক্ষাই করা হয়েছে, সচরাচর যেমনটা হয়ে থাকে। তবে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের র‍্যাংকিং বলছে, সাকিব আল হাসান বর্তমান বিশ্বের সেরা টেস্ট অলরাউন্ডার, এমনকি পরিসংখ্যানও তা-ই সাক্ষ্য দেয়। আর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তিনি নাম্বার ওয়ান তো বহুদিন ধরেই।

আগামী রোববার থেকে শুরু হতে যাওয়া বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্টটিই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের পঞ্চাশতম টেস্ট। পঞ্চাশ টেস্টের মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে, এক বিদেশি দৈনিককে তিনি খুলে দিলেন মনের অর্গল। বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া লড়াই ছাড়িয়ে যে দিগন্ত বহুদূর বিস্তৃত।

টেস্ট ক্রিকেটে দশ বছর পার করে ফেললেও, এখনও পঞ্চাশ টেস্টের মাইলফলক ছুঁতে পারেননি সাকিব আল হাসান। ২০০৭ সালে টেস্ট অভিষেকের পর থেকে সাকিব টেস্ট খেলেছেন ৪৯ টি; একই সময়ে অস্ট্রেলিয়া সেখানে খেলেছে ১১৪ টি টেস্ট ম্যাচ। ইংল্যান্ড তো খেলেছে আরও বেশি, ১৩১ টি।

কেমন লাগে এতদিন পরপর টেস্ট খেলতে? এ সাক্ষাৎকার যখন নেয়া হয়, ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লীগে জ্যামাইকা তালাওয়াসের হয়ে খেলায় তিনি ব্যস্ত। তবে এত কম টেস্ট খেলার হতাশা তাকে ছুঁয়ে যায় কক্যারিবিয়ান সাগরপাড়েও, ‘এটা হতাশাজনক। আমরা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পারি। কিন্তু এটাই নিয়ম হয়ে গেছে। আমরা এখানে কিছু করতে পারি না।’

একইসাথে দলের সেরা বোলার আর ব্যাটসম্যান হবার কৃতিত্ব, ইতিহাসে খুব কম অলরাউন্ডারেরই ছিলো। ২০০৭ সালে টেস্ট অভিষেকের পর থেকে সাকিব বাংলাদেশ দলের হয়ে তা-ই হয়ে ওঠেন। টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাট হাতে তার সংগ্রহ ৪০.৯২ গড়ে ৩৪৭৯ রান এবং স্পিন বলে ৩৩.০৪ গড়ে ১৭৬ উইকেট। কিংবদন্তি সব অলরাউন্ডারের জন্যও যে পারফরমেন্স ঈর্ষনীয়। শুধু তাই নয়, উপমহাদেশের খেলোয়াড়দের, ‘ঘরে বাঘ, বাইরে বিড়াল’ বলে যে অপবাদ আছে, তার ক্ষেত্রে অন্তত তেমনটা খাটে না। বাংলাদেশের মাটির চেয়ে বাইরেই যে তার সাফল্য বেশি।

এ তো গেলো পরিসংখ্যানগত শ্রেষ্ঠত্ব। পরিসংখ্যানে তো আর লেখা নেই, কতবার দলের বিপর্যয়ে কাণ্ডারির ভূমিকায় নামতে হয়েছে তাকে। তার জন্য এটি দুর্ভাগ্যজনক যে তিনি এমন এক দলে খেলেন, যেখানে তার পারফরমেন্সের পুরষ্কার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই। সাকিবের অনেক সাফল্য দলকে জয়ের বন্দরে ভেড়াতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে এ বছর জানুয়ারিতে ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ার সেরা ২১৭ রানের ইনিংসটির কথা। চারদিন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রেখেও যেখানে পরাজিত দলের নাম ছিলো বাংলাদেশ।

অতীত নিয়ে স্মৃতিচারণা করার সময় কোথায়, যখন হাতের কাছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ। বিস্ময়করই বলতে হবে, অভিষেকের দশ বছর পরে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলার স্বাদ পেতে যাচ্ছেন তিনি। সাকিবও কিছুটা রোমাঞ্চিত, ‘আমাদের বর্তমান দলের কেউই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলেনি, স্বভাবতই সবাই খুব শিহরিত।’

সর্বশেষ যেবার অজিরা বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়েছিলো, তখনকার বাংলাদেশের সাথে এই বাংলাদেশের বিস্তর ফারাক। টানা ৭১ ম্যাচ হারের মাঝে কেবল একটি ম্যাচ জয়ের দেখা পেয়েছিলো বাংলাদেশ, এমন রেকর্ডও ছিলো একদা। সেসব দিন গত হয়েছে আজ বেশ কিছুকাল। গত বছর দুয়েকে, বাংলাদেশের সাফল্যের পাল্লাই ভারী। এ বছর আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে পৌঁছানো কিংবা ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট প্রাপ্তি, তাদের উঠে আসার কথাই জানান দেয়। এছাড়াও বলা যেতে পারে শ্রীলঙ্কার মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জয়ের কথা যেখানে অস্ট্রেলিয়া ৩-০ তে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিলো বছর দুয়েক আগে অথবা ইংল্যান্ডকে তিন দিনে টেস্টে পরাজিত করার কথা, যা প্রমাণ করে তাদের সামর্থ্য। আর যাদের হাত ধরে বাংলাদেশের এই স্বর্ণালি পথচলার সূচনা, সাকিব আল হাসান তাদের মাঝে একজন।

কিভাবে সম্ভব হলো এ অবিশ্বাস্য পরিবর্তন? সাকিব জানান এর অন্দরের খবর। বললেন, ‘এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার গল্প। আমারও মাঝেমাঝে এত দ্রুত এতদূর চলে আসাকে অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার মনে হয় না, কেউ এমনকি বাংলাদেশেরও অনেকে ভাবতে পারেননি, আমরা এতদূর আসতে পারবো। আমি মনে করি এর পেছনে বিদেশি কোচদের কৃতিত্ব দেয়া উচিৎ, কেননা তারা আমাদের ফিটনেস এবং পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। একইসাথে, ক্রিকেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবার দরুণ বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবকাঠামোও দাঁড়িয়ে গেছে।’

তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে, পরাজয়ের বৃত্তেই ঘুরপাক খেত বাংলাদেশ। সাকিব এর পেছনে আত্মবিশ্বাসের অভাবকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম আমাদের জেতার ক্ষমতা আছে এবং আমাদের এই বিশ্বাসের প্রয়োজন ছিল যে আমরাও জিততে পারি। কিন্তু সেই বিশ্বাস তখনই আসবে যখন আপনি জেতা শুরু করবেন। এখন আমরা নিয়মিত জিতছি এবং তাই আমাদের দলে আত্মবিশ্বাসের কোন কমতি নেই। এখন আমরা ঘরের মাটিতে নিজেদের অজেয় বলেই ভাবি – তা প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন। আর নিজেদের উপর এই অগাধ বিশ্বাসই আপনাকে বিজিত করে তোলে।’

ওয়ানডেতে বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ বড় দলের তকমা পেয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে পায়ের তলায় মাটি এখনো খুঁজে ফিরলেও, সাকিব মনে করেন, দেশের মাটিতে বাংলাদেশ যেকোনো দলকে হারাতে পারে, এই বিশ্বাস এসেছে গত বছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের আগে। ‘আগে আমরা বড় দলগুলোর বিপক্ষে ড্র করাকেই সাফল্য মানতাম- পাঁচ দিন খেলা, ড্র করা – সাফল্যের মাপকাঠি বলতে ছিলো এগুলোই। কিন্তু আমরা তাতে ফল পেতে পারি না। ইংল্যান্ড সিরিজের আগে আমরা ভাবতে শুরু করি ‘জেতার জন্য খেলবো।’ এই মানসিকতার পরিবর্তনই আমাদের পক্ষে ফল আনতে সাহায্য করে,’ সাকিব বলেন।

সাকিব আল হাসান একজন বিজয়ী। আইসিসির সেরা অলরাউন্ডারের তকমা হয়তো তারই প্রমাণ। কিন্তু, আমাকে সেরা হতে হবে, এ তাগিদ পেতেন কোথা থেকে, যখন হারটাই ছিলো বাংলাদেশের নিয়তি?

সাকিব বলেন, ‘যখন আমি মাগুরাতে আমার বাড়িতে টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতাম, তখন থেকেই আমি হারতে অপছন্দ করতাম। বেশির ভাগ সময়েই আমি জিততাম এবং আমি ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং করতে ভালোবাসতাম। আমি সবসময়ই সেরা হতে চেয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতর প্রতিযোগিতার মানসিকতা ছিল – আমি জানি না তা কোথা থেকে এসেছিল, কিন্তু তা আমার ভেতরেই ছিলো, এটাই আমি মনে করতে পারি।’

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাকিব যখিন সুযোগ পান, তার বয়স তখন তের। তার কোচ তাকে বলেছিলেন, ‘কাউকে অনুসরণ করো না। এমন কিছু করো যেন অন্যরা তোমাকে অনুসরণ করে।’ আজ এত বছর পর এসেও সাকিব তাই বিকেএসপির শিক্ষকদের কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেন না। কেননা, দেশের সেরা ক্রিকেটার হয়তো তিনি নন, তবুও দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব তিনিই, হয়তোবা সেই শিক্ষকের কারণেই।

দেশের তরুণদের আইডল হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে চাইলে এ দেশে ক্রিকেটের তুমুল জনপ্রিয়তাকেও দাড় করানো যায়। সাকিবও সেটি মানেন, ‘বাংলাদেশে ক্রিকেট ধর্মের মতো। যখন আমরা মাঠে খেলি, তখন গোটা দেশ টিভি পর্দায় তাকিয়ে থাকে। এমনকি খেলা চলাকালীন সময়ে, তারা তাদের স্বাভাবিক কাজও বন্ধ রাখে। এই দৃষ্টিকোণে, আমি মনে করি আমরা খুব ভাগ্যবান যে আমরা আমাদের দেশের মানুষের দারুণ সমর্থন পাচ্ছি।’

তবে, এই তুমুল জনপ্রিয়তার বিড়ম্বনাও কি নেই! চাইলেই কি তিনি স্বাভাবিক জীবনধারা বজায় রাখতে পারেন, চাইলেই কি ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে পারেন? সাকিব আল হাসান বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেন। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক রাস্তায় চলাচল করাটা আমার জন্য একটু কঠিন। তবে, ক্রিকেটকে আমার পেশা হিসেবে নিলে, আমার জীবন একটু অন্যরকম হবে, এমনটি মেনে নিয়েই আমি এই জগতে প্রবেশ করেছি।’

তবে, কখনো কখনো এর ব্যত্যয়ও ঘটেছে। নানা সময়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সাকিবকে শাস্তি পেতে হয়েছে। সাইটস্ক্রিনের কাছাকাছি চলে যাওয়ায়, দর্শকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়া, ক্যামেরার সামনে অশালীন অঙ্গভঙ্গি, কোচের সাথে ‘গুরুতর অসদাচরণের’ কারণে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কাছ থেকে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন তিনি। তবে তার মতে, এই ঘটনাগুলো তাকে আরও পরিণত করেছে, ‘এগুলো আমাকে শান্ত করেছে, আমাকে শক্তিশালী করেছে মানসিক ভাবে। যা আমার মাঝে বিশ্বাস জন্মিয়েছে, কেউই আমাকে আর টলাতে পারবে না।’

কোনো কাজে ভালো করার পূর্বশর্ত কি? সাকিবের কাছে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে উত্তর আসবে, কাজ থেকে যতটা পারো দূরে থাকো। তার মতে, ‘আমি পেপার পড়ি না, আমি কোনো খবর দেখি না, এবং আমি অধিকাংশ লোকের সাথে কথা বলি না – শুধু আমার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে কথা বলি, এবং তারা ক্রিকেট সম্পর্কে আমার সাথে কথা বলেন না। তাই আমি কেবল মাঠে অনুশীলন করি, বাড়িতে আমার পরিবারের সঙ্গে আমার সময় উপভোগ করি। আমি মনে করি, এই অভ্যাস আমাকে আরও ভাল খেলতে সাহায্য করেছে।’

তাই হয়তো, ৩০ বছর বয়সে তিনি আগের চেয়ে আরও ভালো খেলছেন এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই উন্নতির সময়ে আরও উন্নতির স্বপ্ন দেখছেন। ‘আমি মনে করি আমরা বিশ্বের সেরা দল হতে পারি। আমি মনে করি আমাদের ২০১৯ বিশ্বকাপে ভালো করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা না হলে, তবে ২০২৩ বিশ্বকাপ তো রয়েছেই। ১৭ বছরে আমরা শুধুমাত্র ১০০ টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছি, বছরে ৬ টির-ও কম, এ সংখ্যা বাড়লে, আমরা টেস্টেও ভালো করব’, সাকিব স্বপ্ন দেখান।

সাকিবের বেড়ে ওঠার সময়ে এ দেশের ক্রিকেট ছিলো ভারত কিংবা পাকিস্তান কেন্দ্রিক। এমনকি সাকিব নিজেও বেড়ে উঠেছেন পাকিস্তানের সাইদ আনোয়ার আর সাকলাইন মুশতাককে আদর্শ মেনে। তবে দিন বদলেছে। সাকিব যেমন দেশের ক্রিকেটকে আরও উঁচুতে তোলার স্বপ্ন দেখেন, তেমনি এদেশের লক্ষ-কোটি তরুণ বেড়ে উঠছে, সাকিব হবার স্বপ্নে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন তো তিনিই।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।