দেশি চলচ্চিত্রের প্রথা ভেঙেছিলেন যিনি

মুক্তিযুদ্ধ শেষ, দেশ এখন স্বাধীন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা এখনো অবহেলিত। রাজাকার এখনো গ্রামের মাতব্বর। এক বীরঙ্গনা গ্রামের মাতব্বরের কামনার বশবর্তী হতে না চাওয়ায় গ্রামচ্যুত। এমনই এক গল্প নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হলেন তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র।

কিন্তু, নির্মাণের পর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড নানা আপত্তির কথা বলে ছবিটিকে সেন্সর ছাড়পত্র দিতে দেরি করতে থাকে। ছবিতে ব্যবহৃত ‘জয় বাংলা, পাকিস্তানি মিলিটারি, রাজাকার ইত্যাদি শব্দ, বা পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক অত্যাচারের দৃশ্য নিয়ে আপত্তি ছিল সেন্সর বোর্ডের, কারণ তৎকালীন স্বৈরশাসক আমলে এসব দেখানো নিষিদ্ধ ছিলো।

এই নিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদ হলে শেষ পর্যন্ত সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দিতে বাধ্য হয়। অবশেষে মুক্তি পায়, সেই ছবিটি। ছবির নাম ‘আগামী’, আর এই সিনেমাটিকে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে যিনি দর্শকদের জন্য সেলুলয়েডের পর্দায় এনেছেন, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য চলচ্চিত্রকার, শিশুতোষ চলচ্চিত্রে যিনি অগ্রগামী, তিনি হলেন মোরশেদুল ইসলাম।

পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ছাত্রাবস্থায় থাকাকালে ১৯৮৪ সালে নির্মান করেন মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আগামী’। নানা জটিলতার পর মুক্তি পেলে ভীষন ভাবে প্রশংসিত হয়, একাধিক আর্ন্তজাতিক পুরস্কারের পাশাপাশি জাতীয় পুরস্কারের আসরে সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের সম্মান জিতে নেয় এই ছবিটি, এতে অভিনয় করেছিলেন আলী যাকের,রওশন জামিল, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরো অনেকে।

প্রথম ছবি নির্মানের প্রায় এক দশক পর এক লাশবাহী গাড়ি ও গাড়োয়ানের গল্প নিয়ে নির্মান করলেন আরেকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘চাকা’, মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জনপ্রিয় নাটক অবলম্বনে এটি নির্মান করেন। এই ছবিটি বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক পুরস্কারে সম্মান অর্জন করে। বাংলাদেশে মুক্তধারার ছবি নির্মাতা হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেন তিনি। অভিনয় করেছিলেন আমিরুল হক চৌধুরী, আশীষ খন্দকার।

দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মানের পর ১৯৯৬ সালে সরকারী অনুদানে নির্মাণ করলেন প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দীপু নাম্বার টু’, পাশাপাশি গড়ে তুললেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মনন চলচ্চিত্র। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের জনপ্রিয় কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে সুপরিচিত। দর্শকপ্রিয় এই ছবিটি দুটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।অভিনয় করেছিলেন বুলবুল আহমেদ, অরুণ সাহা, ববিতাসহ আরো অনেকে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতিতে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে ১৯৯৭ সালে নির্মান করেন ‘দুখাই’। সিনেবোদ্ধারা এটিকে ওনার সেরা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি দেন। জাতীয় পুরস্কারে সেরা চলচ্চিত্র সহ মোট ৯ টি পুরস্কার জিতে নেয় এই ছবিটি, তবে সেরা পরিচালকের জন্য জাতীয় পুরস্কার না পাওয়াটা আজো তিনি আক্ষেপ করেন। অভিনয় করেছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, রোকেয়া প্রাচী, আবুল খায়েরসহ আরো অনেকে।

হুমায়ূন আহমেদের শিশুতোষ উপন্যাস ‘পুতুল’ অবলম্বনে ২০০৪ সালে নির্মান করেন ‘দূরত্ব’ ছবিটি, বিভিন্ন পুরস্কারের পাশাপাশি সেরা শিশুশিল্পী বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পায়। অভিনয় করেছিলেন হুমায়ূন ফরিদী, সুবর্ণা মুস্তফা, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, অমল, ফাহাদ, সোহেল রানাসহ আরো অনেকে।

মাহমুদুল হকের উপন্যাস অবলম্বনে ২০০৬ সালে নির্মান করেন মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছবি ‘খেলাঘর’, ছবিটি বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি তিনি নিজেও পান সেরা পরিচালকের পুরস্কার।তবে জাতীয় পুরস্কারে ছবিটি অগোচরে রয়েই যায়। অভিনয় করেছিলেন রিয়াজ, সাবা, আরমান পারভেজ মুরাদসহ আরো অনেকে। এই দুইটি ছবিই প্রযোজনা করেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম।

হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে ২০০৯ সালে নির্মান করেন ডিজিটাল চলচ্চিত্র ‘প্রিয়তমেষু’। দুই নারীর প্রতিবাদের গল্প ফুটে উঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন আফসানা মিমি, সাবা, আরমান পারভেজ মুরাদ, তৌকির আহমেদসহ আরো অনেকে।

ছবিটি সেরা শিশু শিল্পী (বিশেষ) বিভাগে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। ২০১১ সালে সরকারী অনুদানে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় নির্মান করেন মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। এই ছবিটি তিনি নির্মান করেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে। ছবিটি ৩ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। অভিনয় করেছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, আফনান, হোমায়ারা হিমু, গাজী রাকায়েতসহ আরো অনেকে।

২০১৫ সালে আবার তিনি ফিরে এলেন হুমায়ূন সাহিত্যে। নির্মান করলেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি ‘অনিল বাগচীর একদিন’। ছবিটা তাঁর ভক্তদের সেভাবে প্রত্যাশা পূরন না করলেও জাতীয় পুরস্কারে সেরা ছবি সহ ৬ টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করলেন, আর অবশেষে তিনি নিজে পান সেই অধরা সেরা পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার। অভিনয় করেছিলেন আরেফ সৈয়দ, গাজী রাকায়েত, জ্যোতিকা জ্যোতিসহ অনেকে।

এই বছরের একেবারেই শেষে ২১ ডিসেম্বর আবার তিনি আসছেন নতুন একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নিয়ে। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে সরকারী অনুদানে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় ছবির নাম ‘আঁখি ও তাঁর বন্ধুরা’। আশা রাখি,ছবিটি দর্শকদের প্রত্যাশা পূরন করবেন।

১৯৫৮ সালের আজকের এইদিনে জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলামের আজ ৫৯ তম জন্মদিন। তার প্রতি রইলো জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।