দেশটা আরো সুন্দর হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি: হুমায়ুন ফরীদি

তাঁকে নতুন করে চেনানোর কিছু নেই। বাংলাদেশে এযাবৎকালে যতজন গুণী অভিনেতা এসেছেন তিনি নি:সন্দেহে তাঁদের মধ্যে সেরাদের একজন। তিনি হলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কিংবদন্তি হুমায়ুন ফরীদি। ছয় বছর হল তিনি আমাদের মাঝে নেই। তারপরও আজো তিনি এক নম্বর।

প্রয়াত এই কীর্তিমান যাবার আগে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভিতে। ‘কী কথা তাহার সাথে’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলান। হুমায়ুন ফরীদির স্মরণে অলিগলি.কমের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি হুবহু দেওয়া হল।

ইমদাদুল হক মিলন: আমি আসলে একটু অন্যভাবে শুরু করতে চাচ্ছি। আপনার নামের বানানের ক্ষেত্রে যে বিচিত্রতা লক্ষ্য করা যায় এটা আসলে কেন?

হুমায়ুন ফরীদি: মূলত লিখতে যাতে সুবিধা হয়, সে কারণেই ‘ফরীদি’ বানানটা এভাবে করা।

ইমদাদুল হক মিলন: ফরীদি নামটা কি আপনি আপনার বাবা বা কোনো আত্মীয়ের থেকে নিয়েছেন?

হুমায়ুন ফরীদি: মূলত এই নামটা নিয়েছি আমার মায়ের কাছে থেকে। ওনার নাম ছিলো ফরিদা। সেখান থেকেই ফরীদি নামটা নেয়া।

ইমদাদুল হক মিলন: তোমার পরিবারের মধ্যে কি অভিনয়, নাচ-গান কিংবা এরকম সাংস্কৃতিক কাজকর্মের চর্চা ছিলো?

হুমায়ুন ফরীদি: না, তেমনটা ঠিক না। তবে শুনেছি বাবা গ্রামে একটা মঞ্চ নাটকে একবার সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে অভিনয় করেছেন একবার। সেখানে, আমি যেভাবে করেছি, সেভাবে উনি করেছেন কিনা তা ঠিক বলতে পারবো না। সেক্ষেত্রে বলতে পারেন, পরিবারের প্রভাব আমার অভিনয়ে একেবারেই ছিল না।

ইমদাদুল হক মিলন: আমি জেনেছি, যাত্রা দিয়ে তোমার অভিনয় জগতে প্রবেশ। এটার সত্যটা কতটুকু?

হুমায়ুন ফরীদি: প্রথম যে অভিনয় করি আমি, সেটার জন্য আমি কোনো টাকা নেইনি। বলতে পারেন বাস্তব জীবনের অভিনয়। মঞ্চে আমি প্রথম অভিনয় করি মাদারীপুরে। নাটকের নাম ছিল, ‘মুখোশ যখন খুলবে’। মফস্বলে যা হয় আরকি। এটা ’৬৭ বা ’৬৮ সালের  কথা। আড় যাত্রাদলে মূলত যোগদান করাটা বাধ্য হয়েই। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশে বেশ নৈরাজ্যকর অবস্থা। তরূণ সমাজে একধরণের একগুঁয়েমি ভাব ছিল। সেখান থেকেই মূলত একটা যাত্রাদল খুলে ফেলি আমরা। সেখান থেকে কয়েকটা মঞ্চ করেই দল ভেঙে যায়। দীর্ঘ বিরতীতে চলে যাই বলা চলে। প্রায় পাঁচ বছর।

ইমদাদুল হক মিলন: তারপর কিভাবে আবার ফিরে আসা মঞ্চে?

হুমায়ূন ফরীদি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ হয়নি তাই। তাছারা এখানে আমার বেশ কয়েকজন বন্ধুও ছিল। তারপর জাহাঙ্গীরনগরের নাট্যদলে আমার একটা নাটক মঞ্চস্থ হয়। সে নাটক পরে ঢাকা থিয়েটারে যায়। ওখান থেকেই মূলত অভিনয় জগতের শুরু বলতে পারেন।

 ইমদাদুল হক মিলন: যতদুর আমি জানি, জাহাঙ্গীরনগরে সেলিম আহমেদের সঙ্গে তোমার পরিচয় ছিল। মূলত এই পরিচয়ের কারনেই কি তোমার মঞ্চে অভিনয় করা?

হুমায়ূন ফরীদি: হ্যাঁ, ওনার সাথে পরিচয় ছিল। তবে আমাদের ওখানে আন্ত: নাট্যদল প্রতিযোগীতায় বিচারক হিসেবে ছিলেন, নাসিরুদ্দিন ইউসুফ সাহেব। উনি আমার অভনয় দেখে বললেন, ‘আমার ঢাকায় একটা দল আছে, তুমি যদি চাও ওখানে কাজ করতে পারো। একদিন আসো, দেখো কেমন লাগে।’ আমি চলে যাই।

ইমদাদুল হক মিলন: ঢাকা থিয়েটারে এসে তোমার প্রথম নাটক কি?

হুমায়ুন ফরীদি: ঢাকা থিয়েটারে আমার প্রথম নাটক ‘শকুন্তলা’।

ইমদাদুল হক মিলন: তখন মঞ্চে আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফা এদের মত অভিজ্ঞ শিল্পীরা কাজ করতেন। তাদের সবাইকে বিট করে তোমার একটা বিরাট জায়গায় পৌঁছে যাওয়া, এটা কীভাবে সম্ভব?

হুমায়ুন ফরীদি: আমি জানি না আসলে। ভাগ্য….! তবে এক ধরণের কাজ করার প্রতি আগ্রগ ছিল। সম্ভবত সে কারণেই এরকম একটা সুযোগ পেয়ে যাই। হয়তো, সে স্থানে পৌঁছায়ে যে পরিমাণ যোগ্যতা প্রয়োজন হয়, সেটা আমি অর্জন করতে পেরেছিলাম।

ইমদাদুল হক মিলন: মঞ্চে অভিনয় করার সময় তোমার আশেপাশের অন্যান্য অভিনেতা যারা ছিলেন তারা তোমাকে ঠিক কতটা সাহায্য করেছিলেন?

হুমায়ুন ফরীদি: প্রত্যেকেই আমাকে সহযোগীতা করেছে। আমাদের ঢাকা থিয়েটারের পরিবেশটা এমন যে এখানে কোনো রকমের ঝামেলা নেই।

ইমদাদুল হক মিলন: টেলিভিশন নাটকে তুমি কবে অভিনয় শুরু করলে?

হুমায়ুন ফরীদি: টেলিভিশন নাটকে আমি মূলত এফডিসি হবার আগে নাটক করেছিলাম। এবং ঐ নাটকের পরিচালনায় ছিলেন বাচ্চু ভাই, আমার চরম সৌভাগ্য ছিলো সেটা। আতিকুর রহমান চৌধুরী আমাকে “নিখোঁজ সংবাদ” নামের একটি নাকটের জন্য নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, একদিন আসো। আমি গেলাম, উনি আমাকে স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, ভাই আমি অডিশন দিতে পারবো না। উনি বললেন, আমার অডিশন দেয়া লাগবে না। আমি স্ক্রিপ্ট পড়লাম, তারপর বললাম এটা আমি করবো না। উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন? আমি বললাম আমার পছন্দ হয় নাই, তাই করবো না। আসলে যে চরিত্র আমার পছন্দ হয় নি, ওটাতে অভিনয় করতে গেলে কখনই বেস্ট হবে না।

ইমদাদুল হক মিলন: আশির দশকে তুমি মঞ্চ শুরু করলে। একাধারে কতদিন করলে একাধারে মঞ্চ আর  টেলিভিশনে? পাশাপাশি কি আর কিছু করছিলে?

হুমায়ুন ফরীদি: মূলত একাধারে মঞ্চ আর টেলিভিশনে নাটক করেছি দশ বছর। আর হ্যাঁ, অভিনয় করার পাশাপাশি আমি চাকরি করতাম। করোলা কর্পোরেশনে। এ কাজগুলো করার জন্য কোম্পানি আমি বিশেষ ছাড় দিত।

ইমদাদুল হক মিলন: তুমি মঞ্চ ছেড়ে দিলে এখন থেকে বাইশ বছর আগে। তারপর টেলিভিশন এ অভিনয় করছো। সেখান থেকে তথাকথিত বাণিজ্যিক সিনেমায় টেলিভিশনের সুপারস্টার হুমায়ূন ফরীদির আগমনটা হলো কিভাবে?

হুমায়ুন ফরীদি: একটা সময় দেখলাম যে, আমার পক্ষে চাকরি করাও সম্ভব না, ব্যবসা করাও সম্ভব না। আমি অভিনয় খারাপ করি না, এটাই মোটামুটি আমার নিজের প্রতি আস্থা ছিলো। সে সময়ে টেলিভিশনে নাটক করলে পেতাম ৪২০ বা ৪২৫ টাকা। এটা দিয়ে তো আর সংসার চালানো সম্ভব না। একমাত্র আমি যদি ফিল্ম নিয়ে কাজ করি, তাহলে ওখানকার যে পারিশ্রমিক সেটা দিয়ে আমার সংসার চালানো সম্ভব। ঐ উদ্দেশ্যেই মূলত আমার সিনেমা জগতে যাওয়া। আমি সিনেমায় খুব একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন করার জন্য বা শিল্পের সাধনা করার জন্য গেছি সেটা একেবারেই ভুল।

ইমদাদুল হক মিলন: প্রথম ছবি কবে এবং কোনটা?

হুমায়ূন ফরীদি: আমার প্রথম ছবি আমি শ্যুট করেছি, ‘দিন-মজুর’। আমার মুক্তি পেয়েছে প্রথম ছনি ‘সন্ত্রাস’। এ দু’টি সিনেমার পরিচালনায়ই ছিলেন শহীদুল ইসলাম খোকন। প্রথম সিনেমাটাই  ব্যবসা সফল ছিলো।

ইমদাদুল হক মিলন: এ পর্যন্ত কয়টা সিনেমা করলে?

হুমায়ুন ফরীদি: একশ’ ছাড়িয়েছে প্রায়।

ইমদাদুল হক মিলন: তুমিই কিছুক্ষণ আগে বললে, তোমার দ্বারা ব্যবসা হবে না। কিন্তু একটা সময় সিনেমার প্রযোজনায় তোমার নাম দেখা গেল। ওটার পরিচালনায়ও কি তুমি ছিলে?

হুমায়ুন ফরীদি: ছবিটার নাম ছিলো ‘পালাবি কোথায়’। আমরা কয়েকজন মিলে সিনেমাটা বানালাম। দূর্ভাগ্যবশত সিনেমাটা চলেনি। এরপর আর সিনেমা প্রযোজনায় হাত দেইনি। টাকা ছিল না যে। যা আগে আয় করেছিলাম সব এখানেই ভেসে যায়।

ইমদাদুল হক মিলন: তুমি অভিনয়ের প্রতিটি স্থানেই বিচরণ করেছো। তোমাকে নিয়ে বেশ কিছু কথা শোনা যায়। তুমি বেশ ম্যুডি, নিজের চরিত্রে অটুট। এর একটা প্রমাণ কিছুক্ষণ আগেই পেলাম। এবং এখনও নাকি, তুমি কাউকে বলছো শ্যুটিং এ যাবে, টাইম দিলে কিন্তু গেলে না। এই ধরণের অনেক প্রচার আছে, বলতো ব্যাপারটা কি?

হুমায়ুন ফরীদি: এর উত্তর একাধারে হ্যাঁ আবার না। যেমন ধরো, আমার যে কাজটি করতে ভালো লাগে না বা করার জন্য যেই পরিবেশ দরকার সেটা যখন না পাই বা যে সাপোর্টটা দরকার যে ওয়ার্কিং কন্ডিশন দরকার, সেটা যদি না থাকে আমি নিশ্চয়ই তাহলে আমার মন খারাপ হয়। তোমার নিজেরও মেজাজ খারাপ হবার কথা। আমি আসলে নিজেকে আটকে রাখতে পারি না, প্রকাশ করে ফেলি।

ইমদাদুল হক মিলন: এই এতো কিছুর মধ্য দিয়েও তুমি একটা সময় আরেকটি খুব বড় রিস্ক তুমি তোমার জীবনে নিয়ে নিলে। সেটা হচ্ছে, তুমি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম একজন অভিনেত্রীকে বিয়ে করে ফেললে, সুবর্ণা মুস্তাফা। এটার প্রেক্ষাপটটা আসলে কি?

হুমায়ুন ফরীদি: এটা আসলে হয়ে গেছে। তখন আমারও একটা ডেঞ্জার টাইম যাচ্ছিলো, সুবর্ণারও একটু খারাপ সময় যাচ্ছিলো। হয়তো এই কারণেই আমাদের মধ্যে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেছে।

ইমদাদুল হক মিলন: তুমি বলেছো, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবথেকে বেশি অহংকারের বিষয়। এই যুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন দেশ দিইয়েছে, একটি স্বাধীন পতাকা দিয়েছে। আমাদের এই দেশকে নিয়ে এই মুহূর্তে শিল্প-সংস্কৃতি এই সবকিছু মিলিয়ে তোমার ভাবনাটা কিরকম?

হুমায়ুন ফরীদি: আমার ভাবনা হচ্ছে যে, দেশটা আরো সুন্দর হতে পারতো। এবং দেশটা আরো সুন্দর হবে, এটা আমি বিশ্বাস করি। তার কারণ আমার গৌরব করার মত রবীন্দ্রনাথ আছে, আমার গৌরব করার মত বঙ্গবন্ধু আছে, আমার গৌরব করার মত বাংলাদেশ আছে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা আছে, আমার গৌরব করার মত কৃষক আছে। হ্যাঁ, হয়তো কিছু লোক বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। স্রোত যখন শুরু হবে, তারা খড়-কুটোর মত ভেসে চলে যাবে।

ইমদাদুল হক মিলন: তোমার কি মনে হয়, আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যে দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম সেরকম একটা দেশ তৈরি হবে?

হুমায়ূন ফরীদি: হ্যাঁ, স্বপ্ন তো তুমি নতুনদের কাছে দিয়ে যাবে। সুনীল বলেছেন না,

‘নবীণ কিশোর, তোমাকে দিলাম ভুবন ডালা, মেঘলা আকাশ,

তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট, আর ফুসফুস ভরা হাসি।

ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও, ঘৃণায় ছুড়ে ফেলে দাও যা খুশি তোমার।

তোমাকে আমার তোমার বয়সী সবকিছু দিতে বড় সাধ হয়’

আমার স্বপ্ন আমি পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যাব না?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।