দেরীতে হলেও বুঝলো বাংলাদেশ?

একজন ব্যাটসম্যান কতটা ভালো কিংবা খারাপ সেটা নির্ণয় করার জন্য অনেক প্যারামিটার বিশ্লেষণ করতে হয়। তবে কোন ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং গড় দেখে আপনি কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন যে পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে সে কতটা সুযোগ পেয়ে কতগুলো রান করতে পেরেছে।

আন্তর্জাতিক টেষ্ট ক্রিকেটে কোন গ্রেট ব্যাটসম্যানের স্ট্যান্ডার্ড গড় ধরা হয় ৫০। এর মানে হচ্ছে কোন ব্যাটসম্যানের গড় যদি ৫০ কিংবা এর বেশি-কাছাকাছি হয় তাহলে আপনি তাকে গ্রেট বলতে পারেন। অবশ্য ৫০ এর অনেক কম গড় থাকা কিছু ব্যাটসম্যানকেও গ্রেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যাতিক্রম যে আসলে উদাহরণ সেটা প্রমাণ করার জন্যেই হয়তো বা হেইন্স (৪২.২৯) গ্রাহাম গুচ (৪২.৫৮) কিংবা ভিক্টর ট্র্যাম্পারের (৩৯.০৪) মতো ব্যাটসম্যানদের গড় ৫০ এর আশেপাশেও না থাকার পরেও তারা গ্রেট হিসেবেই বিবেচিত হয়।

তবে ক্যারিয়ার শেষে ৫০ এর মতো গড় রাখা একটা বিশেষ কৃতিত্বের কাজ। অনেক ব্যাটসম্যানই শুরুটা খুব চমকের সাথে করলেও পুরো ক্যারিয়ারটা সেভাবে টেনে নিয়ে যেতে পারে না।

সিনক্লিয়ারের মতো ব্যাটসম্যানের অভিষেক টেষ্টের পর গড় ২১৪ হলেও ক্যারিয়ার শেষ করেছেন মাত্র ৩২.০৫ গড় নিয়ে। আবার সাঈদ আনোয়ারের মতো ব্যাটসম্যান অভিষেক টেষ্টের দুই ইনিংসেই শূন্য রান করে আউট হবার পরেও ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ৪৫.৫২ গড় নিয়ে।

প্রতিভা থাকলে আর পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে একজন ব্যাটসম্যান ক্যারিয়ারের কোন পর্যায়ে নিজের গড়কে একটু স্বাস্থ্যসম্মত করতে পারেন। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই একজন ব্যাটসম্যান ক্যারিয়ারের শুরুতেই নিজেকে মানিয়ে নেবার জন্য একটু সুযোগ পান। সে কারণে কোন ব্যাটসম্যান প্রথম ৫-১০ টা টেষ্টে পর্যাপ্ত রান না পেলেও তাকে বাতিল বলে ঘোষনা করে দেওয়া হয় না। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের মতো ৯৯.৯৪ গড়ের অধিকারী ব্যাটসম্যানও প্রথম টেষ্টে দুই ইনিংসে করেছিলেন ৯.৫০ গড়ে মাত্র ১৯ রান।

প্রতিভা হোক কিংবা অন্য কিছু, কোন ব্যাটসম্যান যদি ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যায় পর্যন্ত গড় ৫০ এর কাতারে ধরে রাখতে পারে তাহলে সেটা এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু বলেই বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক। কাজটা এক্সট্রা অর্ডিনারি বলেই এই পর্যন্ত টেষ্ট ক্রিকেট এরকম ব্যাটসম্যান দেখেছেন মাত্র ২ জন। হাবার্ট স্যাটক্লিফ আর জাভেদ মিয়াদাদ। স্যাটক্লিফের সর্বনিম্ন গড় ছিল ৬০.৭৩। আর মিয়াদাদের সর্বনিম্ন ৫১.৭৫।

তবে স্ট্যান্ডার্ডকে যদি ৪০ এর ঘরে নামিয়ে আনা হয় তাহলে সংখ্যাটা হয় ২০। এই ২০ জনের মাঝে আজহারউদ্দিন, গাঙ্গুলী, গিলক্রিষ্ট, গাভাস্কার, ফ্র্যাঙ্ক ওরেল এর মতো ব্যাটসম্যানরাও আছেন।

এই ২০ জনের মাঝে গত শতাব্দীর অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকার কিংবা ব্রায়ান লারার মতো ব্যাটসম্যনের নাম নেই। প্রথম ২২ টেষ্ট শেষে শচীন টেন্ডুলকারের গড় ছিল মাত্র ৩৯.২৬।

অথচ লিটল মাষ্টার ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ৫৩.৭৯ গড় নিয়ে।

অন্যদিকে প্রথম ৪ টেষ্ট শেষে ব্রায়ান লারার গড় ছিল ৩০.৫০। অথচ লারা ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ৫২.৮৯ গড় নিয়ে।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে ‘ক্যারিয়ারের কোন পর্যায়েই গড় ৪০ এর নীচে নামে নি’ – এমন ব্যাটসম্যানদের মাঝে একজন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানও আছেন। ছোট খাটো সেই ব্যাটসম্যানের নাম মমিনুল।

টানা ১১ টি টেষ্টে অন্তত ১ টি ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরী করার ক্ষমতা যে ব্যাটসম্যনের আছে তাকে যে কোন মানদন্ডেই অন্তত ধারাবাহিক বলতেই হবে।

অথচ বাংলাদেশের মতো দেশেও তাকে টেষ্ট দল থেকে বাদ পড়তে হয় পারফর্মেন্সের কারণে। যে দেশে সাকিব আল হাসান (৪০.৯২) ছাড়া আর কোন ব্যাটসম্যনের টেষ্ট গড় ৪০ এর উপরেই নেই।

প্রতিটা দলেই এমন কিছু ব্যাটসম্যান থাকে যারা কিনা কয়েক ম্যাচ খারাপ করলেও দলে সুযোগ পান নিজের খারাপ সময় কাটিয়ে তোলার জন্য। মমিনুল সর্বশেষ দুই টেষ্টে পর্যাপ্ত রান করতে ব্যর্থ হওয়ায় দল থেকে বাদ পড়েছেন। শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যান মারাভান আতাপাত্তুর নাম শুনেছেন। ৫৫০২ টেষ্ট রান করা এই ব্যাটসম্যানের প্রথম তিন টেষ্টের ৬ ইনিংস শেষে রান ছিল মাত্র ১। বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যানের স্কোর প্রথম ৩ টেষ্ট শেষে এমনটা হলে তার পক্ষে ক্যারিয়ারে ৪র্থ টেষ্ট খেলাটা অলৌকিক কল্পনাই বলতে হবে।

অন্যান্য উন্নত দেশে টেষ্ট স্পেশালিষ্ট ব্যাটসম্যানকেও এমন ভাবে তৈরী করার চেষ্টা করা হয় যাতে সে টেষ্টের সাথে সাথে ধীরে ধীরে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সাথেও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। অথচ আমাদের এদেশে টেষ্ট স্কোয়াড থেকেই মমিনুলকে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো।

রিসোর্স নষ্ট হলে সেটার দায়ভার কর্মকর্তাদের উপরেই বর্তায়। মমিনুলের ক্যারিয়ার নষ্ট হলে তার জন্যেও হয়তো কাউকে দোষী বানানো হবে, কাউকে হয়তো শাস্তিও দেওয়া হবে। কিন্তু, দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মমিনুল আর আমরা সাধারণ ক্রিকেট প্রেমী।

যাই হোক, একটু দেরীতে হলেও টনক নড়লো বিসিবির। টেস্ট দল থেকে এক দফা বাদ দিয়ে আবারো তাকে ফেরানো হল তাকে। এটা না হলে, বড় একটা ভুলই হয়ে যেত। অভিনন্দন মুমিনুল হক, এবার নিজেকে নতুন করে প্রমাণের পালা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।