দেবী হয়েও দেবীর সম্মান তিনি পাননি

সুপ্রিয়া দেবী… বাঙালি ওঁকে দেবী বললেও দেবী-র লেশমাত্র সম্মান ভালোবাসা ওঁকে দেয়নি।

বাঙালী সমাজে পরচর্চার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। থার্ড ওম্যান তাকে বলেছে সমাজ কিন্তু সেই তৃতীয় নারীর কোনো বলবার জায়গা নেই ছিলনা। কোন বৈবাহিক সম্পর্কে তৃতীয় কেউ প্রবেশ করা মানে সমাজের চোখে সব দোষের ভাগী তৃতীয় নারীটি। কিন্তু একহাতে কি তালি বাজে?

সুপ্রিয়া কারও সংসার ভাঙেননি। যতই মধ্যবিত্ত মানসিকতার বউ-ঝিরা সেকথা বলুক। উত্তমই এসছিল সুপ্রিয়ার কাছে, ‘বেণু আমায় একটু আশ্রয় দেবে বলে।’

সুপ্রিয়া গৌরী দেবীর সংসারে দখল অধিকারের দাবী করেননি। কিন্তু সুপ্রিয়া যে ভুল করেছেন সুচিত্রা সেন সেই ভুল করেননি। হয়তো তাই সুচিত্রা দেবী হয়ে রয়ে গেলেন। সুপ্রিয়া দেবী হয়েও নয়।

উত্তম সুচিত্রার কাছেও আশ্রয় চেয়েছিলেন কিন্তু সুচিত্রা আবেগতাড়িত হননি। সুপ্রিয়ার তাঁর ক্যারিয়ারের পূর্ণবিকাশের শ্রেষ্ঠ সময়টা দিয়ে দিলেন উত্তম কুমারকে। উত্তমকে আশ্রয় দিয়ে তাঁর সংসারে তাঁর জীবনে হয়ে উঠলেন উত্তমময়ী।

আবেগের তোড়ে ভেসে গেলেন সুপ্রিয়া যাতে তাঁর নিজের আমিত্ব টুকু হারালেন নিজের ফিল্মি ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিলেন সুপ্রিয়া। সঙ্গে সমাজের চোখে রক্ষিতা সঙ্গিনী হয়ে উঠলেন। আমি এজন্য কিছুটা বেণুদিকেই বকব, যে বেণু ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র নীতা করেছেন, কোমল গান্ধার করেছেন, বসু পরিবার নাগপাশ করেছেন, বলিউডে ছবি করে এসছেন, আম্রপালী করে ঝড় তুলেছেন সে কেন উত্তম-মাটির উপর নিজের জীবন দাঁড় করালেন।

যেসব ছবিতে সুপ্রিয়া নায়িকাও নয় উত্তমের সেসব ছবির আউটডোরেও সুপ্রিয়া যেতেন, ভালো ভালো রান্না করতেন সবাইকে খাওয়াতেন। হয়তো কিছুটা উত্তমের উপর নিজ অধিকার রাখতেও যেতেন কিন্তু উত্তমের সেবিকা হওয়া ছাড়াও নিজের অভিনয় দাপট তাঁর আছে সেটা কেন জলাঞ্জলি দিলেন সুপ্রিয়া? নিজের মাটি নিজের যোগ্যতায় রাখার ক্ষমতা তাঁর ছিল। যে অসীম সময় তিনি উত্তম আবেগে ভাসিয়ে দিয়েছেন সেইসময় একটু নিজেকে দিতে পারতেন নিজের মতো উত্তম যেগুলোয় নায়ক নয় সেরকম ছবি করতে পারতেন যতই উত্তমকুমার পজেসিভ হন।

যার ন্যাচারাল আক্টিং ক্ষমতা ছিল, ক্লাসিকাল নৃত্যের তালিম নিয়েছিলেন, বার্মার প্রধানমন্ত্রী থাকিন নু বেণুকে রূপোর চামচ দিয়েছিলেন পুরস্কার নৃত্যকলায় প্রথম হওয়ায়, বাংলা সিনেমায় হলিউড স্টাইল আনেন তিনি।এইসব শুধু উত্তম আলোকে ঢাকা পড়ে গেলো। মেঘে ঢাকা আলোয় বিলীন হয়ে গেলেন আম্রপালী। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ বছর বছর সন্তান উৎপাদন করত, শাশুড়ী বউমা একসঙ্গে সুতিকাগৃহে থাকত একসঙ্গে দুজনের সন্তান প্রসব হত। সেই সমাজ আবার সুপ্রিয়ার সমালোচনা করত। সমাজের মুখে পরপর বুড়ো আঙ্গুল দেখান সুপ্রিয়া।

সুপ্রিয়া উত্তমের ঘর ভেঙেছে এইটা শুধু রটে, কিন্তু সুপ্রিয়াই সেই সমাজে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটান। প্রথম স্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরীর দ্বিতীয় বিয়ে দেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সুপ্রিয়া। সমাজে কেউ এমন ভাবতেই পারেনা। শ্রী তারাশংকর ‘আম্রপালী’ করবার সময় যাকে ছাড়া তাঁর নায়িকা ভাবতে পারেননা। তিনি সুপ্রিয়া। তিনি ডাকনামে বেণু। যিনি শ্রী তারাশংকর কে বলেছিলেন ‘আমি আম্রপালী-র চরিত্র করতে কোনারকম পোশাক পরব।’

সেদিন সাহসিনী সুপ্রিয়ার সেই কথা শুনে সবাই বলেছিলেন, ‘তাহলে সিনেমা হলে ঢিল পরবে। ওমন দুঃসাহস দেখিওনা বেণু।’ তখন বেণুর জবাব ছিল ‘তাহলে এই চরিত্র নিয়ে ছবি করবেন ভেবেছেন কেন? যদি সাহসী পোশাক পরাতেই না পারেন!’

তবু শেষ অবধি ‘আম্রপালি’তে সেযুগে অনেকটাই সাহসী পোশাক পরে কাঁচুলী পরিহিতা সুপ্রিয়া রূপালি পর্দায় আবির্ভূতা হন। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে যৌনতার সহিত সৃজনশীলতাকে ঘরেঘরে পৌছে দেন। এক ছবিতেই বেণু আম্রপালী রূপে সব পত্রিকার হেডলাইন হয়ে যান। সুচিত্রা সাবিত্রী অরুন্ধতী প্রতিমা মুখ নায়িকাদের জমানায় এক আগুন সুপ্রিয়া জ্বলে ওঠেন।

যার মুখে বিখ্যাত ডায়লগ ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’। সত্যি ভূমিষ্ঠ হবার দিন থেকেই তাঁর একার লড়াই শুরু তাঁর। আর্থিক অনটনের সংসারে বছর বছর কন্যাসন্তান যেন শনির ছায়া। সূতিকাগৃহে অষ্টম কন্যাসন্তান কৃষ্ণা যেন শ্রীকৃষ্ণ’র নারীসত্ত্বা। যে ভূমিষ্ঠ হবার সঙ্গে সঙ্গে সারা সংসার বলে ওঠে ‘আবার মাইয়া’। নিদারুন হতাশায় যে শিশুকন্যাকে তাঁর মা পা দিয়ে ঠেলে দিয়েছিল।

কৃষ্ণা সূতিকাগৃহে রাখা আগুনের মালসায় পরতে পরতে বেঁচে গেল। ঠিক সেদিন থেকেই কৃষ্ণার লড়াই শুরু।কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় যার পিতৃপ্রদত্ত নাম সেই বেণু সেই সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া নাম তাকে দেন অভিনেতা পিতৃতুল্য পাহাড়ী সান্যাল। এরপর যুদ্ধের পর যুদ্ধ। বর্মা থেকে দু’মাস পায়ে হেঁটে এসেছিল সে কলকাতা। যে আসা ছিল অতি দুর্গম। কিশোরীবেলায় সব ঐশ্বর্য ছেড়ে তাকে ঝাপ দিতে হয়েছিল জীবনের আগুন।

শুধু খালি পায়ে ক্রোশ ক্রোশ পথ হেঁটে আসা নয়,পরনের পোশাক টুকু ছিড়ে যায়,পথে ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে তাকে কেউ ছিলনা কোন কৃষ্ণ এসে কৃষ্ণা দ্রৌপদীকে বস্ত্রযোগান দেয়নি। সেদিন কিশোরী বেণু কাদা মেখে নিজের শরীর ঢেকে সারা পথ হেঁটে এসেছিল লোলুপ মানুষের চোখ নখদন্তসর্বস্সতা এড়িয়ে। জলের তেষ্টায় বুক ফেটে যেত। ছোট ভাইবোনদের মুখের দিকে চেয়ে নিজে জল না খেয়ে তাদের জল খাওয়াতো ‘সিস্টার’।সেই পিপাসার্ত অবস্থা এত ভয়ানক যে আজও বেণুর মনে হয় জলের তৃষ্ণা এখনও মেটেনি।

তৃষ্ণা তো মেটেইনি। তাকে বারবার বস্ত্রহরণ করেছে সমাজ কুলটা উত্তম-সঙ্গিনী বাজারি বেশ্যা রক্ষিতা তকমা দিয়ে। যে আজীবন বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজের গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় অশ্লীলতার দায়ে ‘বিষ কন্যা’।
সুপ্রিয়া মহানায়ক কে যে উজাড় করা ভালোবাসা দিয়েছিল তাই কিন্তু মহানায়ক কে বাঁচিয়ে রেখেছিল। যখন তিনি মহানায়ক তখন সুপ্রিয়া মহানায়কের ছায়াসঙ্গিনী ছিলেন। সমাজ সুপ্রিয়াকে সঙ্গিনী এক্সট্রা তকমা দিলেও এটা ভেবে দেখেনি কেউ উত্তমের সেসময় যোগ্য সঙ্গিনী সুপ্রিয়া। যে উজাড় করা নিখাদ ভালোবাসা ও সেবা সুপ্রিয়া উত্তম কে দেন সেটা কম কথা নয়।

যখন সুপ্রিয়া নিজেও ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে। যিনি ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ করে ফেলেছেন অন্যদিকে ‘আম্রপালী’ কে নিজ গরিমায় উদ্ভাসিত করান, আম্রপালি রূপে যিনি ছিলেন তারাশংকর-র প্রথম পছন্দ, যিনি বলিউডেও কাজ করে এসেছেন তিনি শুধুমাত্র উত্তমকে ভালোবেসে নিজের একক ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। সেসময় শুধু উত্তম নায়িকাই রয়ে গেছেন সুপ্রিয়া।

উত্তম-নায়িকা তিনি তখন শুধু তাঁর ফিল্মোগ্রাফিতে। কিন্তু অন্য ভিন্নধারার ছবিতেও ভানুমতীর খেল দেখাবার পারদর্শীতা সুপ্রিয়ার ছিল। নিজের ভালোবাসাকে বড় করে দেখেছিলেন সেদিন সুপ্রিয়া। যে ভালোবাসা কোনদিনও সমাজ ভালো চোখে নেয়নি, আজও সুপ্রিয়ার প্রপৌত্র প্রপৌত্রী বয়সীরা তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করে আজও পাননি এতটুকু সম্মান। বাড়তি সে জন্ম থেকেই সমাজ যেন বেণুকে চোখরাঙিয়ে বুঝিয়ে দেয়।নারীসুলভ পুরুষ মানেই সে ঋতুপর্ণর মতো আর কারও সংসারে থার্ড ওম্যান মানেই সে সুপ্রিয়ার মতো। কিন্তু মতো জুড়তে হয়।

লোকে সুপ্রিয়াকে ছোটো করে এসছেন। সুপ্রিয়াও বুঝতেন সমাজের এই বিদ্রুপ তাই তিনি ভদ্র মুখোশধারী সমাজের মুখের উপর এমন স্টাইল করতেন নিজেকে এমন ভাবে সাজাতেন যে তাকে নিয়ে গসিপ করা সমাজ চমকে যেত যা আগে দেখেনি সমাজ। নগ্ন চওড়া পিঠ, সরু স্লিভলেস ব্লাউজ, সরু কোমরে কোমরবন্ধনী, সঙ্গে তুলে নিতেন জমকালো বেনারসী কি শিফন।

চলচ্চিত্রেও তাঁকে দেখি আমরা নতুন নতুন আঙ্গিকে কখনও ‘সবরমতী’, ‘চিরদিনের’ লাউড লুক মোটা ঠোঁট একে গাঢ় লিপস্টিক, নিত্য নতুন হেয়ারকাট যা বাংলাছবির দর্শক আগে দেখেনি, ‘কাল তুমি আলেয়া’র ড: লাবন্য সরকার, ‘ছিন্নপত্র’র ভ্যাম্পিস চরিত্র, ‘মন নিয়ে’ তে দুই বোনের চরিত্রে সাইকোলোজিকাল রোল দুটো চরিত্র সম্পূর্ন আলাদা, বনপলাশিণী শ্রাবণধারার মতো রূপলাবনী যার অঙ্গ থেকে পড়ে ঝরি, কিংবা দিলীপ মুখার্জ্জীর সঙ্গে রাজেন তরফদারের ছবি ‘আকাশ ছোঁয়া’। ‘চৌরঙ্গী’র করবী গুহ উঁচু করে বুফো খোঁপা, বড় করে চোখ আঁকা। বারবার ট্র্যাডিশন ব্রেক করেছেন সুপ্রিয়া দেবী। ড্রেস ক্যারি করায় আজও তিনি প্রথমা।বাঙালিকে বিদেশি পাশ্চ্যাত্যের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট শিখিয়েছেন সুপ্রিয়া।

উত্তমকুমার বলতেন তিনি তিনটে জিনিস খেতে ভালোবাসতেন -চা চিনি চুমু আর বিশেষ একজনের হাতের রান্না। বলে বেণুদির দিকে তাকিয়ে চোখটা স্লাইট মেরে দিতেন উত্তমভঙ্গিতে। প্রথম দেখাতেই যেন দুজনের ভালোবাসা হবে ঈশ্বর জানতেন। বার্মা থেকে কলকাতায় এসে উত্তমকুমারের পাড়ায় গিরীশ মুখার্জি রোডে ‘জয় হিন্দ’ নামের একটা বাড়ির এক তলায় ভাড়া বাড়িতে উঠেছিল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার।উত্তমের বয়স তখন ১৮,বেণুর ১১। সাত বছরের তফাত।

উত্তম বেণুদের আমাদের বাড়ির লনে ব্যাডমিন্টন খেলতে আসতেন। আর ওপরে চার তলার ঘরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইত তখনকার দিনের বিখ্যাত গান- ‘পি লে, পি লে, হরিনাম কা প্যায়ালা’। একদিন অমন গান করছে, আর পাড়ার সব মেয়ে জানলার পিছনে ভিড় করে লুকিয়ে শুনছে সে গান, গান শেষ হতেই সবাই হাওয়া। উত্তম সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। এগারোর বেণু ওর সামনে দাঁড়িয়ে চার্জ করেছিল- ‘তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে গান করো কেন? পাড়ার মেয়েরা ভাল করে শুনতে পায় না।

এ বার থেকে বাইরে সবার সামনে গান করবে…।’ হতভম্ব হয়েগেছিল উত্তম পরে বাড়িওয়ালার মেয়েকে বলেছিলেন উত্তম- ‘মেয়েটা কে রে? পটপট করে কথা বলে।’

তারপর ‘বসু পরিবার’ আবার অনেকদিন গ্যাপ এরপর ‘সোনার হরিন’, ‘লাল পাথর’, ‘উত্তরায়ণ’। ‘উত্তরায়ণ’-এর মেক আপ রুমে মেকআপ করছেন তন্বী সুপ্রিয়া। হঠাৎ পেছনে একটা ছায়া…..উত্তম….প্রথম চুম্বন।
‘আমায় চিরদিনের সেই গান বলে দাও,আমায় চিরদিনের সেই সুর বলে দাও’ … রচিত হল।

সমাজের রক্ষনশীলতা ভেঙে বারবার সুপ্রিয়া ভালোবাসার গল্প শুনিয়েছেন যা সমাজ পেটে খিদে মুখে লাজ নিয়ে গিলেছে। উত্তম-সুচিত্রা-সুপ্রিয়া…এই ট্রায়ো একসঙ্গে কোনো ছবি করলে সে ছবি লেজেন্ডারী ক্লাসিক হত। কিন্তু বাঙালী এই ট্রায়োকে সবসময় ফ্যান্টাসি করত।

বাঙালির ফ্যান্টাসিতে আসত উত্তম-সুচিত্রা স্বামী স্ত্রী। আর তাঁদের সংসারে ভুষ্টিনাশ করতে অবতীর্ণ হচ্ছেন সুপ্রিয়া। ফিল্মি ম্যাগাজিন ‘উল্টোরথ’, ‘প্রসাদ’ রাও সেভাবে বাজারে খাওয়াতো খবর।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল একটি ঘটনা, একবার সুচিত্রা ফোন করেছেন উত্তমকে। সুপ্রিয়া ফোন ধরেছেন। সুচিত্রা তখন সুপ্রিয়াকে বলেন, ‘উতু কে ফোনটা দেত বেণু, উতুকে খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।’ সুপ্রিয়া জানতেন রমাদি তাকে রাগাচ্ছে।

আরও একটি ঘটনা।

চাঁদিপুরে ‘হার মানা হার’ ছবির শুটিং। উত্তম-সুপ্রিয়া সবাই সেখানে দুপুরের আগেই পৌঁছে গেলেন। যদিও ‘হার মানা হার’ ছবিতে অভিনয় করেননি বেনুদি, উত্তমের সঙ্গে এমনিই গিয়েছিলেন, যেমন যেতেন। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা চলছে। উত্তম বায়না ধরলেন চাইনিজ খাবেন। চাইনিজ রান্নার ভার পড়ল যথারীতি বেনুদির উপর। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে বিশ্রাম।

ধীরে ধীরে বেলা পড়ে এল। ঠিক তখনই সুচিত্রা সেন এলেন। তিনি সোজা দোতলায় উঠে গেলেন। বেশ খানিকক্ষণ পর বেনুদি দোতলায় গেলেন। দেখলেন, চা পানের বিশাল আয়োজন। গান-টান হচ্ছে। উত্তম আর সুচিত্রা একসঙ্গে নাচ করতে লাগলেন।সুচিত্রা নাচতে নাচতেই বেনুদিকে বললেন, ‘কিরে উত্তমের সঙ্গে আমাকে এই অবস্থায় দেখে তোর হিংসে করছে না তো?’

সুচিত্রার কথা শুনে সুপ্রিয়া দেবী হেসে ফেললেন। তারপর বললেন, ‘বহুদিন থেকেই তোমাদের দেখছি। তোমাদের প্রেম, তোমাদের ভালোবাসা, তোমাদের বিরহ, তোমাদের নাচ-গান, তোমাদের পরস্পরের কাছাকাছি আসা সিনেমার পর্দায় সব দেখে আমার চোখ সয়ে গেছে। আমার মনে হয় সুচিত্রা-উত্তমের পর্দার কেমিস্ট্রি সমস্ত জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে।’

মহানায়কের মহাপ্রয়ানের পর ন বছর কাজ করেননি সুপ্রিয়া। মহানায়কের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করা হয়।কাজ পাননি ঘর থেকে বেরোননি সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া জানতেন তার ভাগ্যলিখন তাই তিনি উত্তমকে বলেওছিলেন,
‘আমি তোমায় যতই ভালোবাসি, তবুও আমি তোমার জীবনে খলনায়িকা হয়েই রয়ে যাব। ৫০-১০০ বছর পরও আমি বাংলাছবির ইতিহাসে খলনায়িকা হয়েই রয়ে যাব।’

৭৯-তে রূপালি পর্দায় মামণি রূপে ফিরলেন সুপ্রিয়া দেবী। বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’। তার আগে নিজের প্রোডাকশানে একটি ছবি করেন ‘উত্তর মেলেনি’। দীপঙ্কর দে-সুপ্রিয়া জুটি। অসম জুটি হলেও এক নারীর এক মায়ের লড়াইয়ের গল্প বলেন সুপ্রিয়া।

এরপর সোনার মামণি। উত্তমকে হারিয়ে যে কষ্ট অপবাদ পান সাদা থান পরিহিতা এলোচুলের দাপটে আবহে তবলার মিউজিকে যখন প্রাসাদসম দালান দিয়ে মামণি হেঁটে যান বাংলা ছবি বুঝে যায় মায়ের রোলে সমান দাপট দেখাতে সক্ষম সুপ্রিয়া। একটা ছবি খুব মনে পড়ছে, ‘নট ও নটী’। ইন্দ্রাণী হালদার ও সুপ্রিয়া দেবী সেসময় করেন। কি দাপট দেখিয়েছিলেন সুপ্রিয়া মায়ের রোলে এলো চুলে জমকালো সাজে। এখনও মনে আছে সে অভিনয় সে দাপট। তিনকড়ি বালা দাসীকে নিয়ে ছবিটি।

এরপর দজ্জাল শাশুড়ী হয়ে উঠলেন ‘জননী’।

যখন টেলিভিশনে শুধু ধারাবাহিক যুগ তখন লাল কাতান সিল্ক পরে সুপ্রিয়া এসে বলেন, ‘এবার আসছে বাংলার প্রথম মেগা সিরিয়াল ‘জননী’। বাঙালিকে মেগা শব্দের সঙ্গে পরিচয় করান সুপ্রিয়াই। ঘিয়ে গরদ ঘিয়ে কেশের খোঁপায় জননী সুপ্রিয়াকে দেখতে রাস্তাঘাট দুপুরবেলা ফাঁকা হয়ে যেত। ঘরেঘরে ভাতের থালা হাতে নারীরা বসে পড়ত ভাগের মা অনুপমা দেবীর সংসার ও তাঁর দাপট দেখতে।

ইন্দ্রাণী সেন-র কন্ঠে সেই টাইটেল সং ‘যে হাসি মুখে সবই সয়, জগতের সেই তো জননী’…বাঙালি ভুলবেনা। সুপ্রিয়া মানেই যেমন ‘আবেদনের প্রতীক’ সুপ্রিয়া মানে যেমন ঢাকাই শাড়ি কপালে বড় সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে চওড়া সিঁদূর, সোনায় মোড়া গা, বড় নাকছাবি, আঁচলে চাবির গোছা তেমনি সুপ্রিয়া মানে জননী’র মতো এক বিধবার দাপট। যেন এক কমপ্লিট ওম্যান সুপ্রিয়া।

সিরিয়াল যাত্রা থিয়েটার যেটাই করেছেন সুপ্রিয়া নিজের স্টারভ্যালু বজায় রেখেছেন। ২০০৯ সালেও নিজের স্টারভ্যালু এতটুকু কমেনি তাঁর। ২০০৯ এ ‘শ্রী চরণেষু বড়ম’ মেগা সিরিয়ালের পোস্টারে সারা কলকাতা শহরের দেওয়াল ছেয়ে গেছিল। যার নাম ভূমিকায় ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। বিশাল পোস্টার জুড়ে ছিল সুপ্রিয়া দেবীর মুখ।

উত্তমা রমণী সুপ্রিয়া। না উত্তম কুমারের রমণী সঙ্গিনী নন। যে কন্যা শ্যামাঙ্গী, যার কেশ মনোহর, যে কন্যা মনোহারিনী। মনোহর ভ্রূ-যুক্তা, সুশীলা, গতিশালিনী। গম্ভীর স্বরযুক্তা, সুদন্তা, পঙ্কজ নয়না। কথা অতি উত্তম ও মিষ্টভাষী বলে মনে করবে।যে কন্যা কুলের কল্যাণ কারিণী। যার গতি হংসিনীর মত, তিনিই তো উত্তম রমণী উত্তম যার অঙ্গ সৌষ্ঠবকে আদর করে চিঠিতে লিখতেন, ‘আমার পদ্ম গোলাপরা কেমন আছে?’

সুপ্রিয়া দেবী আমাদের ছোটোবেলার নিষিদ্ধ রমণী কিন্তু বড় আদরের বড় প্রিয় আমাদের নস্টালজিয়া। যার কথা বলে উল্টোরথ আনন্দলোক পাতার পর পাতার ভরিয়ে ফেলে যেগুলো আজও হটকেক। কলকাতা দূরদর্শন থেকে হালের এবিপি আনন্দ যার ইন্টারভিউতে সর্বাধিক টিআরপি পায়।

সুপ্রিয়া দেবী চলে গেলেন তাতে উত্তম যুগ শেষ হয়ে গেল প্রচার করা হচ্ছে তা কিন্তু নয়। এখনও অনেক উত্তম নায়িকা জীবিত। যাদের মধ্যে কেউ উত্তমকে ভালোবেসেছিলেন। তাই উত্তম যুগ শেষ নয়। কিন্তু শেষ হল দেবী যুগ। কানন দেবী, ছায়া দেবী, চন্দ্রাবতী দেবী, অরুন্ধতী দেবী দের উত্তরসূরী ছিলেন একমাত্র সুপ্রিয়া দেবী। সেই সুপ্রিয়া দেবী চলে যাওয়াতে শেষ দেবী চলে গেলেন। দেবী যুগ শেষ হয়ে গেল আজ।এখনকার কোনো নায়িকা তো আর দেবীতে উত্তোরণ ঘটাবেননা নিজেদের।

আর কেউ বলবেন না, ‘আপনাদের দাদা এইটা খেতে ভালোবাসত’, ‘আপনাদের দাদা ঐটা পরতে ভালোবাসতে’। প্রাণের লোকের সঙ্গে এবার আবার দেখা হবে বেণুর।

সব বউমা দের তিনি তাঁর রান্নার টপ সিক্রেট রেসিপি শিখিয়ে গেছেন।যে বউমারা নিজেরাই আজ শাশুড়ী।আর কেউ অমন আদর করে রান্না শেখাবেননা। বেণুদির রান্নার রেসিপি তাদের মধ্যে দিয়ে পরম্পরায় চলবে।
সুচিত্রাকে উত্তম জুটি ভাবা হলেও সুচিত্রা কত কথায় কথায় উত্তমের কথা বলতেন জানা নেই। কিন্তু সুপ্রিয়া দেবী এই তিন দশকের বেশী সব লেখায় সব ইন্টারভিউতে উত্তমকুমারের কথা বলেছেন।

উত্তমের প্রয়াণের পর তিন উত্তম নায়িকা সাবিত্রী সুপ্রিয়া মাধবী যেন তিন বোন হয়ে গেছিলেন।সুপ্রিয়া যখন আর কাজ করতেননা তখনও দুই বোনকে ফোন করে বলতে, ‘সাবু মাধু আয় আমার কাছে সারাদিন থাকবি আমি রান্না করে খাওয়াবো।’ কিন্তু তিনি কিকরে রান্না করবেন। এতটাই অসুস্থ।সুপ্রিয়া দেবী বিশাল নায়িকা হয়েও অসম্ভব আন্তরিক অতিথি আপায়্যনে। তাঁকে লোকে কু-তকমা দিলেও তিনি সবাইকে তাঁর রান্না খাইয়ে খুশী করে দিতেন নিজেও খুশী হতেন।সুপ্রিয়া নিজে যত না নিয়েছেন তার বেশি লোককে দিয়ে গেলেন।
সাবু বেণু মাধু ট্রায়ো জুটির এক বোন আজ চলে গেলেন।

আরও এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ আজ, সুচিত্রা সুপ্রিয়া কন্যা আজ দুই বোন হয়ে উঠল। নিজের মা’র মতোই সুপ্রিয়া দেবীর সব দায়িত্ব পালন করলেন মুনমুন। সোমাকে দিলেন বড়দির মতো ভরসা।

বেণুর যাবার বেলায় আজ আর কোন রাগ নয় নয়। শুধু অনুরাগ। সমাজ কে দোহাই আজ থেকে আর কোনো সাপস্মৃতি জাগ্রত করে সুপ্রিয়াকে ফোনায় ফোনায় বিষের ছোবল নয়। সুপ্রিয়া কষ্ট দিয়েছেন কম। কষ্ট পেয়েছেন অনেক!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।