দেওয়ানবাড়ির সেই ছোট্ট ছেলেটি

তার ফিল্ডিং মানেই দর্শকের আনন্দের বাড়তি খোরাক। কখনো ঝাঁপিয়ে পড়ে নিশ্চিত চার বাঁচিয়ে দিচ্ছেন,কখনো বা নিশ্চিত ছক্কা হবার বলটিও তালুবন্দী করছেন অবিশ্বাস্যভাবে। বাংলাদেশ দলের ‘বেস্ট ফিনিশার’ খেতাবটা বর্তমানে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের নামের পাশে জুড়ে গেলেও একটা সময় ছিল যখন এই খেতাবটা ছিল তার একার দখলেই। জ্বি ঠিক ধরেছেন বলছি, নাসির হোসেনের কথা। আজ ৩০ নভেম্বর আর আজকেই ২৫ বছর পেরিয়ে পা রাখছেন ২৬ বছরে।

১৯৯১ সালে রংপুরের দেওয়ানবাড়িতে জন্ম। শৈশবের চঞ্চলতা অদম্য ছুটে চলা সবকিছুই ছিল সেই ছোট্ট নাসিরের মাঝে তবে এর পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি প্রবল টান ছিল তার। ক্রিকেটার হবার অদম্য ইচ্ছা থেকেই পরবর্তীতে বড় ভাইয়ের সহযোগীতায় ২০০৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাড়ির সকলকে ছেড়ে ভর্তি হন বিকেএসপিতে।

নিয়মিত ভালো পারফরমেন্স এর জন্য একসময় ডাক পেলেন ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে। একই সময়ে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে খেললেন অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ। এরপর থেকেই ধীরেধীরে নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন নতুন এক উচ্চতায়। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং তিন বিভাগেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন প্রতিনিয়ত।

ঘরোয়া ক্রিকেটেও তার পারফরমেন্স নজর কেড়েছে নির্বাচকদের।২০০৮-৯ সালে প্রথমে রাজশাহী বিভাগের হয়ে খেলেছেন,এরপরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন অলরাউন্ডার নাসির।আবাহনীর হয়েও মাঠে নেমেছেন প্রিমিয়ার লিগে।

২০১১ সালের ১৪ই আগস্ট অবশেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখলেন নাসির, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে।অভিষেক ম্যাচেই নিজেকে মেলে ধরলেন। ৫৮ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশ দলকে ১৮৮ রানে পৌঁছে দিল তার ৯২ বলে ৬৩ রানের দৃঢ় ইনিংস। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনেকদূর যাবার ইঙ্গিত সেদিনই দিয়েছিলেন নাসির।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একই বছর নভেম্বর মাসে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেলেন, ১০০ রান করলেন ১৩৪ বল খেলে। তখন থেকেই বাংলাদেশ দলের লোয়ার মিডল অর্ডারের নির্ভরযোগ্য সৈনিক বনে যান নাসির,হয়ে ওঠেন দলের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। নিউজিল্যান্ডকে ঘরের মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করে ইতিহাস গড়ার মূল হোতাও যেন এই নাসির , আর সেই সিরিজ থেকেই নাসির পরিচিতি পান ‘ ফিনিশার’ হিসেবে।

ডানহাতি অফব্রেক বোলার হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন অল্প সময়েই। ২০১১ সালে অভিষেক হবার পরেই অক্টোবরে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে বিধ্বংসী এক স্পেলে প্রায় একাই জিতিয়েছিলেন দলকে। তাছাড়া এরপর বেশ কিছু ম্যাচেই ভাল বোলিং করে দলের জয়ে অবদান রেখেছেন তিনি। ২০১৫ সালে মিরপুরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করে (২৬ রান দিয়ে ৩ উইকেট) প্রোটিয়াদের কম রানেই গুড়িয়ে দিয়েছিলেন এই অলরাউন্ডার।

ওয়ানডে অভিষেকের পর সাদা জার্সিতেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে নাসির হোসেনের অভিষেক ঘটে ২০১১ সালেই। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ১১ই মার্চ গল টেস্টে শ্রীলংকার বিপক্ষে পেয়ে যান প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।

ওয়ানডে ক্রিকেটে নাসিরের ব্যাটিং গড় ৩১,১২ অন্যদিকে টেস্টে ব্যাটিং গড় ৩৪.৮। ওয়ানডে বোলিং এ গড় টেস্ট এবং ওয়ানডে দুই ফরম্যাটেই হাফ সেঞ্চুরি ৬টি এবং সেঞ্চুরি একটি করে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৬১ ম্যাচে তার রানসংখ্যা ১২৭৬ অন্যদিকে টেস্টে ১৯ ম্যাচে রান সংখ্যা ১০৪৪।

ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে সাফল্য পাওয়া অলরাউন্ডার নাসির বেশ কয়দিন যাবৎ চাপের মুখেই আছেন। অফ ফর্ম,আচরণবিধি লঙ্ঘন ইত্যাদি নানা বিতর্কের মুখে পড়ে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয়েছেন কয়েকবার। স্কোয়াডে থেকেও একাদশে তার জায়গা না হওয়া নিয়েও অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে, ক্রিকেট ভক্তরাও মেনে নিতে পারেনি বিষয়টি। তবে এতে দমে যাননি নাসির, সুযোগ পেলেই তা কাজে লাগাতে চান, দলের জন্য অবদান রাখতে চান অনেকদিন পর্যন্ত।

জন্মদিনের মতন শুভক্ষণে দর্শকরাও নিশ্চয়ই একসময়কার বেস্ট ফিনিশারের নতুনভাবে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকবেন, দাবি রাখবেন সেই পুরনো নাসিরকে ফিরে পাওয়ার। বাংলাদেশ দলকে যে এখনো অনেক কিছু দেবার বাকি আছে তার!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।