দু’হাত নেই, তবুও তিনি বিশ্বখ্যাত গিটারিস্ট

গিটারিস্ট, গায়ক, গান লিখিয়ে, সুরকার – তাঁর পরিচয়ের কোনো শেষ নেই। এমন পরিচয়ের মানুষ তো বিশ্বজুড়ে অনেক আছেন। তবুও আমেরিকান বংশদ্ভুত নিকারাগুয়ান টনি মেলেনদেজ বাকি সবার থেকে আলাদা। মায়ের পেট থেকে তার জন্মই যে হয়েছিল হাত ছাড়া।

মেলেনদেজ তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। গিটার বাজানো তিনি শিখেছেন পা দিয়ে। আর এটাই তাঁকে এনে দিয়েছে জগৎময় খ্যাতি। এমন গল্প রোজ রোজ শোনা যায় না।

ছোট বেলা থেকেই গিটারের প্রতি আলাদা মোহ ছিল মেলেনদেজের। তবে, হাত না থাকার পরও বাজাবেন কি করে? বয়স যখন তাঁর ছয়, তখন আর্টিফিশিয়াল হাত লাগানো হয়েছিল। তবে, মেলেনদেজের কাছে তখন হাতগুলোকে অনেক ভারি বলে মনে হয়।

যখন তাঁর বয়স ১৬ বছর তখন আরেক মিউজিয়ান ভিন্নভাবে তাকে গিটারের ব্যাপারে শিক্ষা দেন। ওই সময় বাড়ির বাইরে থেকে কেউ গিটারের আওয়াজ শুনলে বিশ্বাস করতে চাইতেন না যে, মেলেনদেজ গিটার বাজাচ্ছে। সেটা বোঝানোর জন্য তাদের বেডরুম অবধি নিয়ে যেতে হত।

১৯৮৫ সালের কথা। তখন থেকেই লস অ্যাঞ্জেলেসে তিনি গিটার বাজিয়ে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৮৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মেলেনদেজ গেয়ে ওঠেন ‘নেভার বি দ্য সেম’। পোপ জন পল দ্বিতীয়’র সম্মানে আয়োজিত সেই সঙ্গীতানুষ্ঠান কাঁপিয়ে দেয় গোটা বিশ্বকে।

পোপ নিজে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন মেলেনদেজকে। বলেন, ‘তোমার প্রতি আমার শুভকামনা রইলো। আশা করি, এভাবেই তুমি মানুষের মাঝে আশার বানী ছড়িয়ে দেবে সব সময়।’

মেলেনদেজ সেই কথা রেখেছিলেন। ২০০৫ সাল থেকে তিনি নিজের ব্যান্ড ‘টনি মেলেনদেজ অ্যান্ড টো জ্যাম ব্যান্ড’ নিয়ে ব্যস্ত। বিস্তর কনসার্ট করেছেন এই সময়ে। একই সাথে মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও তিনি জনপ্রিয়। বাজারে তার বই বিক্রি হয় হট কেকের মত। ১৯৯১ সালে তার লেখা ‘অ্যা গিফট অব হোপ’ বইটি আমেরিকায় খুব রেটেড বইয়ের মধ্যে অন্যতম।

এমন অসাধারণ জীবন যার, তার তো স্বীকৃতি মিলতে বাধ্য। মেলেনদেজও অনেকবারই নিজের কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন, নানা ভাবে। ইউনিটি অ্যাওয়ার্ডের বিবেচনায় তিনি বর্ষসেরা পুরুষ গায়কের পুরস্কার জিতেছেন ২০০০, ২০০২ ও ২০০৪ সালে। এর মধ্যে ২০০২ সালে তিনি পান সেরা শিল্পীর খেতাব। এর আগে ১৯৯৯ সালে ব্রেনসন এন্টারটেইনমেন্ট অ্যাওয়ার্ডের বিবেচনায় তিনি পান বছরের সেরা নবীন শিল্পীর পুরস্কার। ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের পক্ষ থেকে তাকে ‘পজিটিভ রোল মডেল অব আমেরিকা’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

জীবনের ব্যাপারে বরাবরই ইতিবাচক মেলেনদেজ। বললেন, ‘মানুষ আমাকে নিয়ে মজা করতো না? অবশ্যই করতো। যদিও, কখনোই তাঁকে পাত্তা দেইনি। ওটা তাদের সমস্যা, আমার তো নয়। আমার চোখে হাত না থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। কারণ, ওটা তো আমার কখনো ছিলই না, তাই হারিয়ে ফেলেছি এমন ভাবনা কখনো মাথায় আসেনি।’

এত তীব্র মানসিক শক্তি কি করে পেলেন? – এই প্রশ্নের যা জবাব দিলেন তাতে মেলেনদেজকে সত্যিই স্যালুট জানাতে হয়, ‘আমি কি করতাম? বসে বসে কাঁদতাম, আর জীবনে কিছুই করতে পারতাম না? কেঁদে কেঁদে জীবন কাটিয়ে ফেলার চেয়ে আমার কাছে কিছু করাকে ঠিক বলে মনে হয়েছে।’

এখন হোসে অ্যান্টনিও মেলেনদেজ রড্রিগেজের জীবনটা কিছুটা হলেও আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মত। স্ত্রী লিনকে নিয়ে সুখের সংসার তাঁর। সাথে চলছে গান-বাজনা। আক্ষেপ যে একেবারেই করেন না, তা কিন্তু নয়। বললেন, ‘যদি আমার হাত থাকতো তাহলে আমি একই সাথে হয়তো দু’রকম গিটার বাজাতে পারতাম। এই কাজটা তো পৃথিবীতে আর কেউ পারে না। যদিও, সেটা আমার কাছে বড় ব্যাপার নয়। বড় ব্যাপার হল, চাইলেই আমি আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম। চাইলেই ওকে বাহুতে নিয়ে ভালবাসতে পারতাম। তোমরা জানো, এই একটা অনুভূতি আমি কখনো পাবো না!’

মেলেনদেজের চোখে তখন জল। চেহারায় একটু না পাওয়ার আক্ষেপ। তবে, বুক ভরা স্বপ্ন, আরো বড় কিছু করে দেখানোর। সামনের গ্যালারিতে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময়। কতটা মানসিক শক্তি ধারণ করে, লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি! দু’হাত না থাকার পরও এই ৫৫ বছর বয়সী বুড়ো স্বপ্ন দেখেন এখনো!

– ব্রাইটসাইড ও নিউজওকে অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।