দু:স্বপ্ন || রম্যগল্প

‘আমি যে তোমাকে পছন্দ করিনা, এই সিম্পল জিনিসটা কি বুঝো না তুমি?’

ক্যাটরিনা চুপ করে আছে। কথা বলছে না। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হলো, কিছু তো বলো। আমার আর ভাল্লাগেনা। তোমাকে এতোভাবে বুঝানোর চেষ্টা করি যে আমি তোমাকে চাইনা। বুঝো না সেটা?’

এবার কথা বললো ক্যাটরিনা। আস্তে করে বললো, ‘বুঝবো না কেন। বুঝি তো।’

– তাহলে বিরক্ত করো ক্যান এতো?

– কারণ আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারিনা। ভীষণ ভালোবাসি তোমায়। ক্যাটরিনার চোখ দিয়ে ফোটা ফোটা জল গড়ালো।

আমি বললাম, ‘দেখ ক্যাটরিনা। ভালো লাগার ওপর হাত নাই মানুষের। আমার কোনো আগ্রহ আসেনা তোমার প্রতি। আমি কি করব? তাছাড়া যাকে চাওয়া যায় তাকে পাওয়া যায় না সবসময়। তাহলে এটা দুনিয়া না হয়ে স্বর্গ হয়ে যেত। তুমি আমাকে ভালোবাসো কিন্তু আমি বাসিনা। এই জিনিসটা তুমি যত দ্রুত বুঝবা ততই তোমার মঙ্গল৷ কষ্ট কম হবে। এখন আমি উঠলাম।’

ক্যাটরিনা কোনো কথা বললো না। ওয়েটারকে ডেকে বিল দিতে গেল। আমি ইশারা করলাম। ওয়েটার বললো, ‘ইটস ওকে ম্যাম। বিল স্যার পে করে দিয়েছেন। হ্যাভ এ নাইস ডে।’

আমি আর দাড়ালাম না৷ একটা অটো নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা হলাম। ক্যাটরিনার সাথে গাড়ি আছে। সে গাড়িতে যাবে।

বাসায় এসে শুনি এক বিদেশি লোক বসে আছে আমার বসার ঘরে। বিরক্ত হলাম। কে আসতে পারে এইসময়? এখন আমার গোসল সেরে লাঞ্চ করার টাইম ছিলো। কারো সাথে বকবক করার মুড নাই একদম। তাও বিদেশি বলেই শুধুমাত্র গেলাম। যত দ্রুত সম্ভব বিদায় করতে হবে।

আমাকে দেখে মাঝবয়েসী লোকটা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বললো, ‘স্যার আমাকে চিনবেন বোধহয়। আমার নাম বিল গেটস। মাইক্রোসফট নামে একটা কোম্পানি আছে আমার। কম্পিউটারের উইন্ডোজ বানায়।’

‘হ্যা চিনেছি, বসেন বসেন। বসলাম আমিও। তো কি মনে করে?’

‘ইয়ে মানে, ইতস্তত করে বিলগেটস বললো, কিছু টাকাপয়সা ধার চাইতে আসছি। হাত টান যাচ্ছে খুব। কয়দিন আগেই এমাজনের জেফ বেজোস এক নাম্বারে উঠে গেছিলো ধনীর তালিকায়। অত্যন্ত বাজে অবস্থায় আছি। আপনার কিছু সাহায্য পেলে ভালো হতো। আমি দুই মাসের মধ্যে শোধ করে দিব। চোখ ছুয়ে বলতেছি। কসম। বলেই চোখের ওপর হাত দিলো বিল গেটস।’

আমি হাত নেড়ে মানা করলাম, ‘আরে কি করেন। এসব লাগবে না। টাকা লাগলে দিব, সমস্যা নাই। আমি চেক বের করলাম পকেট থেকে। আপনি যেদিন পারবেন শোধ করবেন।’

– আপনার অসীম কৃতজ্ঞতা। আমি কোনোদিন ভুলবো না।

– আচ্ছা ঠিক আছে। কত লাগবে?

– দেন যা ভালো মনে হয় আপনার।

– আচ্ছা ঠিক আছে। আমি চেক লিখে হাতে দিলাম। দেখেন, চলবে?

– জ্বি অবশ্যই চলবে। কিভাবে যে ধন্যবাদ দিব আপনাকে।

– সেটা পরে দিয়েন৷ এখন আমি ব্যস্ত একটু৷ আপনি আসেন।

– আচ্ছা আচ্ছা, খুব বিরক্ত করলাম। স্যরি স্যার। আসি তাহলে। চেকটা হাতে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেল বিল গেটস।

আমি গোসলে ঢুকলাম। গোসল শেষে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমুতে যাবো এমন সময় মনে হলো একটু ইন্সটাগ্রাম থেকে ঘুরে আসি। গিয়ে দেখি অনেকগুলো মেসেজ রিকুয়েষ্ট আসছে। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও নামের একজন লিখেছে, ‘ওস্তাদ, আপনার কাছে অভিনয়ের কিছু টিপস চাই। রিপ্লাই দিবেন প্লিজ।’

শাহরুখ খান নামের এক ভক্ত মেসেজ দিয়েছে, ‘ভাই আপনার বিশাল ফ্যান। আমার মেসেজ পড়লে কৃতজ্ঞ থাকবো।’

এমা ওয়াটসন আইডি থেকে মেসেজ এসেছে, ‘আপনাকে খুব ভালো লাগে৷ খুব বেশি। কথা বলা যাবে প্লিজ?’

এইসব মেসেজ এখন সিন করে রিপ্লাই দিতে গেলেই ঘুমের দেরি হয়ে যাবে৷ যাদেরটা সিন করেছি গত সপ্তাহে এখনো তাদের রিপ্লাই ই দিতে পারিনি। বিরাট কোহলি ছয় সাতবার একই মেসেজ দিয়ে রাখছে, ‘ভাই নতুন একটা শট শেখাবেন বলেছিলেন, তার কি হলো। রিপ্লাই-ই দেন না আর।’

জাস্টিন বিবার একটা লিংক দিছিলো ইনবক্সে, ‘বস আমার নিউ গান৷ দেখে জানাবেন কেমন লাগলো। আপনার মন্তব্যের অপেক্ষায় আছি।’

এসবের রিপ্লাই রাতে দেয়া যাবে৷ এখন আপাতত ঘুমাই। ডাটা কানেকশন অফ করে ফোনটা রেখে দিলাম বালিশের পাশে৷

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি আমি খুব সাধারণ কেউ। আমার বাসা বাংলাদেশের ছোটো একটা জেলার এক মফস্বল এলাকায়। বাসাতে এসি পর্যন্ত নাই৷ এমনকি পকেটও ফাকা। মাত্র ত্রিশ টাকা আছে। ইন্টারনেট চালাবো কিন্তু এমবি নাই ফোনে। চুয়াল্লিশ টাকায় দুই জিবি কিনতে আরো চৌদ্দ টাকা লাগবে। সেই টাকাটা কোথায় পাবো টেনশনে আছি৷ ফ্রি মেসেঞ্জার চালাই আপাতত৷ ফেসবুকে এক মেয়েকে ভাল্লাগে কিন্তু সে পাত্তা দেয় না। মেসেজ সিন করে রেখে দেয়, রিপ্লাই দেয় না। মাঝে মাঝে তো সিনই করে না। সেই ক্রাশ নতুন ছবি আপ্লোড দিছে কিন্তু ফ্রি ফেসবুকে ছবিটাও দেখতে পারিনা। নেট কেনার জন্য একজনকে বললাম, ‘ভাই ফোনে ১৪ টাকা লোড দিয়ে দেন।’

সে মেসেজ সিন করে আর রিপ্লাই দিলো না। নিজেকে অনেক ছোটো মনে হতে লাগলো। রাগে দুঃখে আর অপমানে একটা চিৎকার দিলাম। সাথে সাথে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘেমে নেয়ে পুরো একাকার অবস্থা। উফ কি ছিলো এইটা। এখনো গা কাপছে। পাশে রাখা ফোন বাজতেছে৷ রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে ভারী কণ্ঠ ভেসে আসলো, ‘ভাই আমি ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোরিয়া ইস্যুতে কি ডিসিশন নিব সে ব্যাপারে আপনার পরামর্শ জানতে কল দিছি।’

আমি বললাম, ‘আচ্ছা আমি রাতে জানাচ্ছি। এখন রাখেন।’

– ওকে ভাই। ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করব।

ফোন রেখে দিয়ে ঢকঢক করে পানি খেলাম এক গ্লাস৷ ঘাম মুছলাম রুমাল দিয়ে। হাফ ছাড়লাম৷ যাক, এতোক্ষণ তবে দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম!

টিভি ছাড়লাম রিমোট দিয়ে। সবগুলো চ্যানেলে একযোগে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে, ‘কিছুক্ষণ আগে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেছে বিশ্ববিখ্যাত সেলিব্রেটি, বিলিয়নিয়ার, মাল্টি ট্যালেন্টেড সোহাইল রহমানের!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।