দুর্বল চিত্রনাট্য, দুর্বল নির্মান

চাঁদের পাহাড়’‌-‌এর পর একটা রব উঠেছিল, ‘চাঁদের পাহাড়-‌টু‌’‌ হোক হোক। সেই থেকেই হয়তো পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ‘আমাজন অভিযান’ করবেন ভাবেন। ২০১৩-‌তে থিওডর রুসভেল্ট এবং ক্যানডিডো রনডনের নেতৃত্বে একটি বৈজ্ঞানিক অভিযানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। একটা নদীতে গিয়ে অভিযাত্রীরা হারিয়ে যায়, আর এগোতে পারেনি।

ওই নদীটার নাম তারা দিয়েছিল ‘রিভার অফ ডাউট‌’‌। এছাড়াও ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড‌’‌ । এইসব মিলিয়ে জুলিয়ে বিভূতিভূষণের লেখা থেকেও ভাবনা নিয়ে চাঁদের পাহাড়ের দ্বিতীয় ভাগ বানিয়ে ফেললেন ‘আমাজন অভিযান’। এই ছবিটা যতই প্রচার করা হোক ‘চাঁদের পাহাড়’-এর পরবর্তী ভাগ নয় কিন্তু ছবির স্টোরি লাইন সম্পূর্ন এক শুধু কিছু বিষয় রদবদল একই প্লটে।

বুনিপের জায়গায় আনাকোন্ডা। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বাঙালি তাই তাদের বড়দিন নতুন বছরে অ্যাডভেঞ্চার-এর ছবি উপহার দেওয়ার চেষ্টাটা ভালো। কিন্তু যে ছবি নিয়ে এত হুজুগ এত বড় পোস্টার সত্যি হয় দেশপ্রিয় পার্ক-র বড়মা দুর্গার মতো এগুলো করে দর্শককে না উস্কিয়ে যদি গল্প বলায় একটু মন দিতেন কমলেশ্বর বাবু ছবিটা অনেক মনোগ্রাহী হত।

ছবির গল্প অত্যন্ত দুর্বল। যা একবারের বেশি দেখতে ইচ্ছে করবেনা। অত্যন্ত নিম্নমানের ভি এফ এক্সের ব্যবহার ছবির মান নিচু করে দেয় বারবার। কালো বাঘ,চিতা আর আনাকোন্ডা দেখে ভয় পাওয়া রোমাঞ্চ হওয়া তো দূর একটা শিশুও হাসবে। কার্টুন দেখা ভালো তার চেয়ে।

গল্পের শুরুতেই দেখা যায় মার্কো’র সিটি অফ গোল্ড-এর অসমাপ্ত অভিযান শেষ করার লক্ষ্যে শঙ্করকে পাশে চায় মার্কো-কন্যা অ্যানা। অজানাকে জানার সন্ধানে শঙ্কর সামিল হয় সেই অভিযানে। তিনজন মিলে ছুটে চলে আমাজনের গহন অন্ধকারে ঢাকা মৃত্যুপুরীর গভীরে অন্তরালে থাকা স্বর্ণ শহরের উদ্দ্যেশ্যে।

সেই নিয়েই গল্প। সৌমিক হালদার-এর ক্যামেরায় আমাজনের দৃশ্য দর্শকের মন ভরিয়ে দেবে। কিন্তু সেখানেও নতুনত্ব দৃশ্য কিছু নেই। একই জলা জঙ্গলের পাখি কুমীর-এর বারবার পুনরাবৃত্তি।

দেব-র ছবি বলে এটাকে সবাই বলছেন কিন্তু দেব তো পুতুল আসল তো পরিচালক তিনি যদি দুর্বল চিত্রনাট্য বানান ছবির মান কি হতে পারে!

দেব তাঁর একশো শতাংশ দিয়ে অভিনয় করেছেন। প্রাণপাত করে অভিনয় করেছেন দেব। একটা কিছু না পারা ছেলে, যাকে সবাই সবসময় খারাপ বলে, তোতলা বলে, হেন গালাগাল নেই তাকে দেয়না, সব ট্রলে যে সেই খারাপ ছেলেটা কিছু না করতে পারা ছেলেটা অনেক কিছু করে দেখিয়ে দিয়েছে। যেটার জন্য বিভূতিভূষণ বাবু তাঁর শংকরকে দেখে খুশি হবেন।

অন্য এখনকার আর কোনো অভিনেতাই এই চরিত্র পারতেননা। জিৎ প্রসেনজিৎ-এরর সঙ্গে দেব-এর অহেতুক তুলনা করা হচ্ছে, কিন্তু শংকর রূপে আবীর ঋত্বিক কেও মানাতনা, দেব সঠিক চয়ন। ছবিটা সবকিছু করে উঠতে না পারলেও অনেক কিছু করেওছে।

ছবির শুরুর দিকে রোমাঞ্চ অনেক বেশি। যখন একটি ভাঙা সেতুর উপর দিয়ে মার্কো অ্যানা শংকর ও তাঁদের ওতগুলি ঘোড়া সেতু পার করবে সেই দৃশ্য দুরন্ত বানিয়েছেন কমলেশ্বর ও ক্যামেরায় সৌমিক। ছবির সেরা দৃশ্য।

কিন্তু তারপরই আজগুবি চিত্রনাট্য শুরু হয় সমুদ্রের তলা থেকে মানচিত্র খুঁজে আনা কিংবা প্রতিশোধ পরায়ন শঙ্করের আনাকোণডা নিধনের দৃশ্যায়ন, সূর্যকন্যার বেশে সুন্দরী রমণীদের আগমন রীতিমতো হাস্যকর। আবহে কমলেশ্বর সেই ‘চাঁদের পাহাড়’-এর মতো বকবক করে গেছেন যা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে গাছপালা দেখার মতো।

জন্তু জানোয়ার গুলোতো কার্টুন। আনাকোন্ডা নিধন বুনিপ নিধনের চেয়েও হাস্যকর। যা ছবিটির মান তলানিতে নামিয়েছে। মার্কো এবং আনা- চরিত্র দুটি বেশ উজ্জ্বল। এখানে একটা কথা বলার, আনা আর শংকরের প্রেম দেখাতেই পারতেন পরিচালক কিন্তু অজস্র নির্জন দৃশ্য পেয়েও শংকর ও সাইবেরিয়ার মেয়ে শ্বেতললনা শ্বেতলানা-র কোনো প্রেম উপস্হাপন অহেতুক করেননি কমলেশ্বর।

তবুও বলবো, এই ধরণের ছবি তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া দরকার। নাহলে বাংলা ছবি ঘরবন্দী হয়ে থেকে যাবে। আর এইধরনের ছবি করার উৎসাহ না দিলে ছোটোদের জন্য ছবি করাও বন্ধ হয়ে যাবে।

আমাজনে অভিযান করতে গিয়ে দেব পাশ করে গেছে কিন্তু ডাহা ফেল করেছেন পরিচালক।

আপনি যে তৃতীয় ছবিটি বানাবেন শংকর-কে নিয়ে দোহাই সেটায় গল্পটা ভালো করে বলুন। জুরাসিক পার্ক দেখতে গিয়ে যদি ডায়নোসোরদের কার্টুন দেখানো হত আজ থেকে কুড়ি বছর আগেই সেটা কি লেজেন্ডারি হত। বাজেট একটা বড় বিষয়, কিন্তু আপনি তো কমলেশ্বর প্রচারেও কম অর্থ ব্যয় করেননি। যেটা না করে পশু গুলো একটু বাস্তবসম্মত দেখাতে পারতেন।

দেখুন আমরা ছোটবেলায় কলকাতা দূরদর্শনে আফ্রিকার জঙ্গলে বাঙালির অভিযান ‘আবার যখের ধন’ দেখেছি। সেটাও তো খুব অল্প বাজেটে করা কিন্তু কত রোমাঞ্চকর ছিল সেই ধারাবাহিক যা আজও ভালো লাগে। যেটার একটা পর্ব মিস করলে বিশাল না দেখা থেকে যেত। কিন্তু আমাজন দেখতে দেখতে দর্শক হল ছেড়ে বেরিয়ে যাবে তাই গল্পটা ঠিক করে বলুন।

কমলেশ্বর বাবু নতুন কিছু বাংলা ছবিকে উপহার দিতে চাইছেন, দেব-কে নিয়ে আপনার ছবি ‘ককপিট’ দেখলাম বেশ ভালোই লেগেছে। আমাজন-এর চেয়ে ককপিট অনেক বেশী রোমাঞ্চকর। আমাজন অনেক কিছু করবার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক ভয়ানক জায়গায় শ্যুট করা হয়েছে যেসব জায়গায় কোনদিন যাননি যাবার সাহস হয়নি আমাদের।

শুধু বলার একটাই কথা,কমলেশ্বর বাবু অভিযানের গল্প অভিযানের মতো রোমাঞ্চকর করে বলুন,ঘুরতে যাবার গল্প করে ডিসকভারি আন্যিমাল প্ল্যানেট বানিয়ে দেবেননা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।