দুর্জন ঢাবিয়ান হলেও পরিত্যাজ্য

নটর ডেমে প্রথম বর্ষে পড়ি তখন, পাঁচ বছর আগে।

নিউমার্কেট এসেছিলাম শার্ট কিনতে, গলায় ঝুলানো ছিল কলেজের আইডি কার্ড। যেখানেই যাই মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করি। সেদিন এক দোকান থেকে শার্ট দামাদামি করার পরে দোকানী একদাম বলার পরেও ১০০/- টাকা কম রেখেছিলেন ।

আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘১০০/- কেন কম রাখলাম জানেন?’

আমি বললাম, না।

তিনি বললেন, ‘আপনার গলার ঐ কার্ডটার জন্যে।’

অবাক হলাম! শার্ট নিয়ে চলে গেলাম।

__________

একদিন বাসে করে যাচ্ছি, ধামরাইয়ের ডি-লিঙ্ক বাস।

হেলপার ভাড়া নেবার সময় জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনি নটর ডেমে পড়েন?’

আমি বললাম, হ্যাঁ ।পরে উনি বললেন, ওনার ছোট ভাইও নটর ডেমে পড়তো। পরে আমার কাছ থেকে আর ভাড়া নিলেন না। দিতেই পারলাম না ভাড়া।

রাস্তায় অনেক গল্প করলাম হেলপারের সাথে।

__________

একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ কি পায়? বিশেষ করে বাংলাদেশের?

মানুষ কেন পড়ালেখা করে? শুধুই কি চাকরী, টাকা এসবের জন্য?

না। মানুষ, মানুষ হবার জন্যই পড়ালেখা করে। মানুষের বিবেকবোধ স্ট্যান্ডার্ড লেভেলে নেবার জন্যই এতো পড়ালেখার আয়োজন।

রিক্ত ভাইয়ের মুখে শুনেছিলাম, ভাই বলেছিলেন, ‘আগে গ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র বাড়িতে গেলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে জানাতো সবাইকে, যে সে আজ অমুক সময়ে অমুক স্থানে বসবে । কারো কোন প্রয়োজন হলে দেখা করতে পারেন ।’

সেই দিন কি এখন আছে?

মিডিয়া বা ফেসবুকের কল্যাণে মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বুয়েটের পজিটিভ দিক না জানলেও নেগেটিভ দিকগুলো কিন্তু ঠিকই জেনে যায়। মারামারি, ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক, এখানকার পড়ালেখা, অন্যান্য পরিবেশ সম্পর্কে সবাই সব জানে কম বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। রাজনৈতিক ইতিহাস, একাডেমিক ইতিহাস সব কিছুই আমরা কম হলেও জানি।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে চলতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যুগের সাথে কতটা মানিয়ে যাচ্ছে এটাও একটা ব্যাপার।

আবারও কলেজের উদাহরণ দিতে হচ্ছে, ৫৬ বছর আগে যখন নটর ডেমের হ্যারিংটন ভবন নির্মাণ করা হয়, তখন চিন্তা করা হয়েছিল ৫০/১০০ বছর পরের কথা। সে সময়ে শিক্ষার্থী অল্প থাকলেও ক্লাস রুম অনেক বড় করে বানানো হয়েছিল। যেখানে আজ ৮০-১০০ জন ছাত্র অনায়াসে ক্লাস করতে পারে। তখন যদি ৩০-৩৫ জনের মাপে ক্লাসরুম বানাতো তাহলে এখন এই ভবনে ক্লাস করতে পারতো না এতো ছাত্র। দূরদর্শিতার একটা বড় উদাহরণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পশ্চাৎমুখী, কিছু হলেই ইতিহাস টেনে আনার একটা অভ্যাস দেখি অনেকের মাঝে।

ইতিহাস টানা অন্যায় কিছু না, অনেকের দাদা এককালে চেয়ারম্যান ছিল, জমিদার ছিল ইত্যাদি বলে অনেকেই ইজ্জত বাঁচিয়ে চলেন। এরকমটা হচ্ছে ইতিহাস টেনে এনে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা ।

একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিখাবে আজ থেকে ২০-৩০-৫০ বছর পরে পৃথিবীতে কি হতে পারে, সে অনুযায়ী আমরা কতটা প্রস্তুত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাডেট কলেজ না, এখানে সবাইকে আগলে রাখাও সম্ভব না। ৩০ হাজার শিক্ষার্থী, বহিরাগত ও অন্যান্যদের মাঝে অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটতে পারে এবং ঘটবেই ।

এর জন্য আমাদের প্রশাসন রয়েছে, ছাত্র নেতা রয়েছে।

এর সমাধান ছাত্ররা অবশ্যই মারামারি করে করতে পারে না। এটা খুবই অন্যায়।

বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ভিনগ্রহের কেউ না। তারা এদেশেরই সন্তান। বাংলাদেশ গঠনে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ভূমিকা আছে তেমনি অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানের শির্ক্ষার্থীদেরও ভূমিকা রয়েছে।

__________

শেষে একটা কথাই বলতে চাই, বিশেষ করে আমার জুনিয়র যারা যাছে তাদেরকে।

যে তোমরা এমন ভাবে গড়ে ওঠো যেন তোমাদের দেখলে লোকজন শ্রদ্ধায় তাঁদের মাথা নত করে। বাড়িতে গেলে যেন মাইকে ঘোষনা দেয় – আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিকুল ইসলাম দুপুর ১২ টায় বাজারের গণি মিয়ার চায়ের দোকানে বসবে, আপনারা চাইলে আসতে পারেন। যেন বাসে চড়লে কোন না কোন হেলপার তোমার পরিচয় জানার পরে ভালোবেসে ভাড়াটি যেন তোমার পকেটে গুজে দিয়ে বলে – ‘আমার ছোট ভাইও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল, আপনার ভাড়া লাগবে না।’

নিউমার্কেটের দোকানদার যেন তোমার টি-শার্টে বুকের বাম পাশের লোগো টা দেখে ১০০ টাকা কম রাখে ।

শ্রদ্ধায়, সম্মানে, ভালোবাসায়!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।