দুই কাপ চা || ছোটগল্প

– একটু উঁচু কণ্ঠে ডাক দিল সামনে দিয়ে চলে যাওয়া একটা তিন চাকার যান – কোমরে গামছা বাঁধা আর এই রোদে ঘেমে গাল দিয়ে চুয়ে পড়া বৃষ্টির মতো ঘামের পানি!

– দাদা ভাই, যাইবেন?

ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি, আহা! এই নির্যাস নির্মল হাসি আজকাল দেখা যায় না বললে চলে। তার সব ক্লান্ত যেন নিমিষে হারিয়ে হীমালয়ের শীতল বাতাসে শিউরে উঠেছে। একটু তড়িঘড়ি করেই দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার প্রশ্নের জবাব দিল, ‘যাব দাদা ভাই।’

‘চলেন’ তারপর উঠে গেল তিন চাকার সেই রিক্সায়।তারপর ছুটছে পেশি চালিত প্রিয় বাহনটি।

– থামেন দাদাভাই, থামেন…থামেন

রিকশাওয়ালার মুখ কালো হয়ে গেল। একটুখানি পথ রিকশা এসে ভাড়া দিবে তো? নাকি গলির গুন্ডা মাস্তান! আল্লাহ ভালো জানে। সেই ভাড়া না পাওয়ার অতৃপ্ততা নিয়ে করুণ দৃষ্টিতে ছেলেটার নেমে যাওয়া দেখছে আর গামছা দিয়ে মুখটা মুছে নিল।

– তালা আছে দাদাভাই? তালা?

বিরক্তিকর গলায় রিকশাওয়ালা বলল, তালা দিয়ে কি করবেন?’

– রিকশায় তালা মারেন আর এদিকে আসে আমার সাথে।

ভীতু রিকশাওয়ালা ঠিক ছেলেটার কথামতো রিকশায় তালা মেরে ছেলেটার পিছুপিছু গেল এবং ছেলেটা একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে টেবিলের পাশে চেয়ারে বসেছে আরেকটা চেয়ার হালকা ফাঁক করে দিয়েছে রিকশাওয়ালাকে হাতের ইশারায় ডাক দিল, ‘আসেন দাদাভাই, এদিকে আসেন।’

চালক রেস্টুরেন্টের পরিবেশ দেখে অস্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে। যেহেতু তার সাথে মানানসই না। নতুন পোশাকে চেয়ারে বসে থাকা লোকের ভীড়ে তার ছেঁড়া জামা? মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই আছে চালক। কিন্তু চেয়ারে আগে বসে পড়া ছেলেটা বসে রইল না। সে এগিয়ে গিয়ে রিকশাওয়ালার কাঁধে হাত দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে হাসিমুখে বললো, ‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন দাদাভাই? আসেন আমার সাথে। কি খাবেন অর্ডার করেন।

পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারছে না। অন্যদিকে ছেলেটা রিক্সাচালকের মন বুঝতে পেরে নিজেই অর্ডার করেছে, ‘দুটো চা আর সিঙ্গারা..তবে আগে একটা ঠান্ডা পানির বোতল দাও… তারপর ওসব।’

পানির ঠান্ডা বোতল এগিয়ে দিল চালকের দিকে, ‘দাদাভাই খেয়ে নেন’। রিকশাওয়াল ডগডগ করে খেয়ে নিল, ‘তারপর?’

– এই নেন চা…

অর্ধেক চা খেয়ে চেয়ার থেকে উঠে বিল দিয়ে চলে যাচ্ছে ছেলেটা রিকশাওয়ালাকে কিছু না বলে। চেয়ার থেকে ওঠে গামছা কাঁধে নিয়ে একপ্রকার দৌড়ে ছেলেটাকে পাকড়াও করেছে, ‘এত কিছু খাওয়ালেন দাদা ভাই?’

ছেলেটার ঠোঁটে তৃপ্তমাখা হাসি দিয়ে বললো, ‘অনেকদিন হলো দুজনে চা খাই না। এই শহরে আমি একজন যাযাবর!’ তারপর চলে গেল হেঁটে, হেঁটে।

ওদিকে যতদূর দেখা যায় সেই মানুষরূপী ফেরেশতাকে ততদূর তাকিয়ে ছিল রিকশাওয়ালা। তারপর অদৃশ্য সেই একাকী মানুষটা। গামছা বেঁধে ফের সিটে বসতে যাবে অমনি টাকা দেখতে পেল। হাতে নিয়ে গুণে গু দেখল এখানে পাঁচ টাকার চারটে নোট অর্থাৎ বিশ টাকা। ছেলেটা যেখান থেকে রিকশায় উঠেছে সেখান থেকে এই রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত বিশ টাকাই ভাড়া ছিল।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।