‘দুইটা গ্রেনেড দিয়া এই পোস্ট উড়ায়া দিমু! বেশিক্ষণ লাগব না…’

একটা গল্প বলি। হলিউডের মারমার কাটকাট সিনেমার একশনকে হার মানানো এক বীরের গল্প…

২৮ অক্টোবর, ১৯৭১। ভোর রাত। ১২৫ জনের মুক্তিযোদ্ধাদের দলটা লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে নিঃশব্দে এগোচ্ছে শ্রীমঙ্গলের ধলই বর্ডারের পাকি ঘাঁটির দিকে। যেভাবেই হোক আজ এই ঘাঁটি দখল করতে হবে। হঠাৎ করেই সামনে পায়ের তলায় একটা মাইন বিস্ফোরণ, শহীদ হলেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। আহত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লাগলেন।

রক্তে রক্তে লাল হয়ে গেল মাটি। কিন্তু এত মৃত্যুর পরও পেছনে হটার কোনো সুযোগ নেই। ঘাঁটি দখল করতেই হবে। এক পর্যায়ে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধারা আরও অগ্রসর হলেন। মুক্তিবাহিনী সীমান্ত ফাঁড়ির খুব কাছে পৌছে যায়। তবে, ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলিবর্ষণের জন্য আর অগ্রসর হতে পারছিলো না।

পাকিস্তানি গানার মুহুর্মুহু ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট ছুঁড়ছে। ঘন গাছগাছালির কারণে মুক্তিযোদ্ধারাও সঠিকভাবে তাঁদের মেশিনগান চালাতে পারছে না। সামনের এগোতে হলে অবশ্যই সেই এলএমজিটা থামিয়ে দিতে হবে। লে. কাইয়ুম সিদ্ধান্ত নিলেন, যেভাবেই হোক ওই এলএমজিটা থামাতেই হবে । কিন্তু এই অবিরাম গুলিবৃষ্টির মধ্যে সামনে যাওয়া অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাবে কে?

দলের কমান্ডার লেফট্যানেন্ট কাইয়ুমের পাশে এসে দাঁড়াল হামিদুর। ‘স্যার, আমি যাই? দুইটা গ্রেনেড দিয়া এই পোস্ট উড়ায়া দিমু। বেশিক্ষণ লাগব না।’

কাইয়ুম তার দিকে ভালোভাবে তাকালেন। চেহারা থেকে এখনো কৈশোরের ছাপ যায় নাই, একেবারে বাচ্চা বয়স। কি সুন্দর হাসিমুখে বলতেছে, স্যার আমি যাই… হামিদুরের তাগাদা, যাই না স্যার… অনুমতি দিলেন কাইয়ুম, অশ্রুসিক্ত নয়নে ভাবতে থাকলেন, এই জীবনে হয়তো এই হাসিখুশি সাহসী ছেলেটার সাথে আর দেখা হল না!

পাহাড়ি খালের ভেতর দিয়ে ক্রল করতে করতে প্রায় ১৮০ ফুট দূরত্ব পার হয়ে গেল হামিদুর, মাথার উপর দিয়ে, শরীরের আশপাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গুলি ছুটছে, একটা মুহূর্তের বিরাম নাই। এই তো আরেকটু…তারপরেই ঘটলো এক বিচিত্র ঘটনা, মেশিনগান পোস্টের গানাররা মরার আগে একটা বিচিত্র দৃশ্য দেখলো। একটা মানুষ মুহুর্মুহু গুলির মাঝখানে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, বাঘের মত গর্জনে জয় বাঙলা চিৎকার দিয়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারলো পাকিস্তানী মেশিনগান পোস্টে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মেশিনগানটা অকেজো হয়ে গেল, ছিটকে গেল সব কিছু।

হামিদুর হঠাৎ টের পেলো, তার শরীর দিয়ে রক্ত পড়ছে। এদিকে মেশিনগান বন্ধ হলেও মেশিনগান পোস্টের ভিতরে বেঁচে যাওয়া দুইটা পাকি বরাহ শাবক তাদের অস্ত্র দিয়ে আবার গুলিবর্ষণ শুরু করেছে। ওদের থামাতে না পারলে তো মুক্তিযোদ্ধারা এগোতে পারবে না। বাপে গর্ব করে বলতো, হামিদুররে যেকোনো কাজে ভরসা করা যায়, যেমনে হোক সে কাজটা শেষ করবেই। বাপকে হামিদুর সারাজীবন সঠিক প্রমাণ করে আসছে, আজকেও তার ব্যতিক্রম হল না।

সাথে থাকা ছুরি দুটো দু’হাতে নিয়ে শরীরের সবটুকু শক্তি এক করে ঝাঁপিয়ে পড়লো হামিদুর মেশিনগান পোস্টের ভেতর, সঙ্গে সঙ্গে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করল এক সৈন্য, আর আরেক সেনা বেয়নেটটা ঢুকিয়ে দিল পেটের ভেতর। অজস্র গুলি খাওয়ার পরেও হামিদুর থামে নাই, পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে বুকের হাড় উড়িয়ে দেবার পরেও কিংবা এতো বড় একটা বেয়নেট ঢুকিয়ে দেবার পরেও হামিদুর থামে নাই, ঠিকই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে ওদের হার্টে ছুড়িটা ঢুকিয়ে দিল। কি অকুতোভয় সাহস, কি অসামান্য বীরত্ব।

কিছুক্ষণ পরের কথা। মেশিনগান স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রবল প্রতাপে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ধলই ঘাঁটি দখল করেছে মুক্তিযোদ্ধারা। পূর্ব দিগন্তে ভোর হচ্ছে, একটা টকটকে লাল সূর্য উঠছে। গুলিতে আর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হামিদুরের মুখে ওই লাল সূর্যের সোনালি আভা এসে পড়ছে। স্বাধীনতার লাল সূর্যটা আনতে হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করা হামিদুরের চোখ দুটো তখনও খোলা। বারুদ মেশানো দুটো চোখ তখনও যেন চিৎকার করে বলছে- জয় বাংলা!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।