দিব্যা ভারতী নামের অমিমাংসিত রহস্য

কলকাতার এক অনুষ্ঠানে শাহরুখ খানের সাথে দেখা হয়েছিল বাংলাদেশের নায়ক ফেরদৌসের। সেদিন শাহরুখ বলেছিলেন, ‘আমাদের দিব্যা চলে গেল, তোমাদের গেল সালমান!’ হ্যা, বাংলাদেশে সালমান শাহ যতটা জনপ্রিয় ছিলেন নব্বই দশকের শুরুতে বলিউডে ঠিক ততটাই জনপ্রিয় ছিলেন দিব্যা ভারতী।

তিনি চলে গেছেন দুই যুগেরও বেশি সময় আগে। আজো যেমন তাঁর স্টারডম টিকে আছে, তেমনি টিকে আছে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে জন্ম নেওয়া রহস্যের জাল। আত্মহত্যা করেছিলেন দিব্যা ওম প্রকাশ ভারতী? মাত্র ১৯ বছর বয়সে, কেন? নাকি খুন হয়েছিলেন? জানালার ধার থেকে কেউ ধাক্কা দিয়েছিল? কেন? কোন স্বার্থে? খুনই যদি হয়ে থাকেন, তাহলে কেন আজো সেই রহস্যের সমাধান হচ্ছে না? কোনে প্রভাবশালী মহল জড়িয়ে আছে এর পেছনে? কারা? আন্ডারওয়ার্ল্ডের কেউ নয় তো? নাকি এটা স্রেফ একটা দুর্ঘটনা?

  • কে এই দিব্যা ভারতী?

নব্বই দশকের একদম গোড়ায় তেলেগু সিনেমা ‘ববিলি রাজা’ দিয়ে তাঁর রুপালি পর্দায় আগমন। তামিল-তেলেগু মিলিয়ে মোট ছয়টা ছবি করার পর তাঁর আগমণ হয় বলিউডে। ১৯৯২ সালে ‘বিশ্বআত্মা’ সিনেমায় সানি দেওলের বিপরীতে তাঁর অভিষেক হয় বলিউডে। এরপর অল্প সময়ের আরো ১৩ টি হিন্দি ও দু’টি তেলেগু সিনেমায় কাজ করেন দিব্যা।

শাহরুখ খান কিংবা গোবিন্দদের সাথে তাঁর জুটি বেশ জমে ওঠে। মিষ্টি হাসির দিব্যা ছিলেন অভিনয় দক্ষতা আর নাচে সমান পারদর্শী। ১৯৯২ সালের ১০ মে তিনি বিয়ে করেন পরিচালক ও প্রযোজক সাজিদ নাদিদওয়ালাকে। তখন দিব্যার নাম হয় সানা নাদিদওয়ালা। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। এর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মৃত্যু হয় দিব্যার।

  • কি হয়েছিল সেই রাতে?

মুম্বাই শহর। পাঁচ এপ্রিল, ১৯৯৩। পশ্চিম আন্দেরির ভারসোভার তুলসি অ্যাপার্টমেন্ট। ফিফথ ফ্লোর। রাত তখন নয়টা।

কিছুক্ষণ আগেই দিব্যা পশ্চিম বান্দ্রার নেপচুন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ফিরেছেন। অনেকদিন ধরে মুম্বাইয়ে ভাল একটা ফ্ল্যাট খুঁজছিলেন। আজ সেটা বুকিং দিয়ে দিলেন। খুব এক্সাইটেড ছিলেন। ভাই কুনাল এসেছিল। তাকে খুব উত্তেজনা নিয়ে চার বেডরুমের ফ্ল্যাটের গল্প বলছিলেন।

কিছু সময় বাদে ‍কুনাল বিদায় নেন।  দিব্যা সেদিনই শুটিং শেষ করে ফিরেছেন চেন্নাই থেকে, শিগগিরই আরেকটি শুটিংয়ের জন্য তাঁর হায়দ্রাবাদ যাওয়ার কথা। সেটা একটু পিছিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন ফ্ল্যাট দেখতে। সেদিন দিব্যার বাঁ-পায়ে চোট লাগে। ‍শুটিংয়ের সময় চোট পাওয়ায় পায়ে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয় বলে পরবর্তীতে জানিয়েছিরেন তার প্রযোজক।

সবাইকে দিব্যা জানিয়েছিলেন পরদিনই হায়দ্রাবাদ যাচ্ছেন। তখনই একটা ফোন আসে। তাঁকে জানানো হয় তার সাথে দেখা করতে নিতা লুলা ও তার স্বামী ফিজিশিয়ান ডাক্তার শ্যাল লুলা এসেছেন। নিতা হলেন কস্টিউম ডিজাইনার। ক’দিন বাদেই স্বামীর ছবি ‘আন্দোলন’-এর শুটিং করতে লম্বা আউটডোর শুটিংয়ে মরিশাস যাওয়ার কথা ছিল দিব্যার। সেই সিনেমার কস্টিউম ডিজাইনার ছিলেন নিতা। সেজন্যই তার আসা। সব কিছু খুব স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল।

অতিথিরা আসেন রাত ১০ টা নাগাদ। লিভিংরুমে বসেন, আলাপ করতে থাকেন। টেলিভিশন চালু ছিল। বসার ঘরের টেবিলে একটা মরিশিয়ান সুগারক্যান ওয়াইন/রাম আর একটা ব্ল্যাক লেবেল স্কচ বোতল ছিল। হুইস্কির বোতলটা খোলা ছিল, কিন্তু, ওয়াইনের বোতল খোলাই হয়নি।

গৃহপরিচারিকা অমৃতাও ওই সময় লিভিং রুমেই ছিলেন। কিছু স্ন্যাকস ভেজে আনতে অমৃতা রান্নাঘরের দিকে যান। তখনও দিব্যার সাথে দুই অতিথির আলাপ চলছিল। দিব্যা আস্তে আস্তে জানালার দিকে যান, আর একটু উঁচু গলায় গৃহপরিচারিকার সাথে কথা বলতে থাকেন। ওই সময় নিতা আর তাঁর স্বামী ওই আমালের ভিসিআর টেলিভিশনে লাগিয়ে কিছু একটা দেখছিলেন। অমৃতা ও দিব্যার মধ্যে কি কথা হচ্ছিল, সেসব তাঁরা খেয়াল করেননি।

  • শেষ যাত্রা

লিভিংরুমের সাথে লাগোয়া কোনো ব্যালকনি ছিল না। ছিল জানালা, যদিও তাতে গ্রিল লাগানো ছিল। তবে, জানালা খেলা ছিল। জানালার ঠিক নিচ বরাবর একটা গাড়ি রাখার জন্য কনক্রিটে বাঁধাই করা জায়গা ছিল। যদিও, সেদিন ওখানে কোনো গাড়ি ছিল না। গ্রিলের ফোঁকর ১২ ইঞ্চির কম ছিল। জানালার ফ্রেম না ধরে থাকলে ওখানে নিজের নিয়ন্ত্রন রাখা শক্ত।

কখন দিব্যা জানালার ওপর গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, কেউ লক্ষ্য করেনি। মদ্যপ অবস্থায় খানিকটা মাতালও ছিলেন। ফোঁকরের ভেতর দাঁড়িয়ে যান। জানালার ফ্রেম ধরার আগেই তাঁর পা পিছলে যায়। ব্যাস, দিব্যা মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরের পেছনটা গিয়ে পড়ে জানালার ঠিক নিচে কনক্রিটে বাঁধাই করা জায়গায়। কারণ, লিভিং রুমের দিকে মুখ করে ওই জানালার ফোঁকরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

স্বামীর সাথে

মাত্র মিনিট তিনেকের মধ্যে এত কিছু হল। সবাই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসলো। নিচে এসে দেখা গেল রীতিমত রক্ত গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল দিব্যা তখনও বেঁচেই ছিলেন। কিন্তু, খানিক বাদেই সব শেষ!

  • ডাক্তার ও পুলিশের ভাষ্য

কপার হাসপাতালের জরুরী বিভাগে দিব্যার মৃত্যু হয়। মাথার পেছনের দিকে আঘাত লাগার ফলে প্রচুর অভ্যন্তরীন রক্তক্ষয় হয়, মাথার খুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে বলা হয়, মৃত্যুটা ছিল অস্বাভাবিক। পুলিশ অনেকদিন তদন্ত করেছিল। কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি, বাধ্য হয়ে তারা কেস বন্ধ করে দেয়।

  • মৃত্যুকে ঘিরে যত রহস্য

প্রথমত, যে বাড়িতে থাকাকালে দিব্যার মৃত্যু হয় সেটা তাঁর নিজের নয়। রেজিস্ট্রেশন করা ছিল অন্য করা নামে। এই ‘অন্য কেউ’টা কে, ওই সময়ের পত্রপত্রিকার খবরে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বলা হয়, বাড়িটি দিব্যার জন্য ভাড়া করেছিলেন স্বামী সাজিদ নাদিদওয়ালা। এর এক বছরেও কম সময়ের আগে অনেকটা গোপনেই দু’জন বিয়ে করেছিলেন।

পায়ে ব্যান্ডেজ ছিল কেন? শুটিংয়ের সময় চোট পেয়েছিলেন বলে বলা হয়। ওই পায়ে তিনি জানালার ওপরে উঠতে গেলেনই বা কেন? ভাই কুনালের, বয়ানে এটা স্পষ্ট যে ওই সময়ে ফ্ল্যাট বুকিং দেওয়ায় দিব্যা খুব আনন্দিত ছিলেন। আত্মহত্যাই যদি হয়, তাহলে কেউ এতটা আনন্দিত থাকতে পারেন কি?

ঘটনার সময় আরো তিনজন মানুষ ওখানে উপস্থিত ছিলেন। দিব্যা মদ্যপ হওয়ার পরও জানালা বেয়ে উঠলেন। কেউ একটি বারের জন্যও দেখলেন না।

দিব্যার গৃহপরিচারিকা অমৃতা তাঁর সাথে সেই জন্মের সময় থেকে ছিলেন। দিব্যার মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিনি। এক মাসের মাথায় তিনিও মারা যান।

দিব্যার কাছের মানুষ ও বন্ধুরা দাবী করেছিল ভয়ানক সব স্টান্ট করার নেশা ছিল দিব্যার। মৃত্যুর সাথে মজা করতে তিনি ভালবাসতেন। আউটডোর শুটিংয়ে গিয়েও করতেন।  যদিও, ওই সময় বাবা-মা সাথেও সময়টা ভাল যাচ্ছিল না তাঁর, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত থাকাটা তাই খুব অস্বাভাবিক নয়। যদিও, সেটা নিশ্চিত করা যায়নি।

  • নীরব বাবা-মা

দিব্যার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন তাঁর বাবা-মাও। তবে, সম্প্রতি ওম প্রকাশ ভারতী ও মিতা ভারতী এক ইউটিউব ভিডিও’র মাধ্যমে নীরবতা ভেঙেছেন। তাঁরা ঘটনাটিকে কোনো ষড়যন্ত্র বা আত্মহত্যা হিসেবে না দেখে স্রেফ দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে রহস্যের আগুন কিছুটা স্তিমিত হলেও, পুরোপুরি নিভে যায়নি।

আসল সত্যটা কি? – এই প্রশ্নের জবাবে হলফ করে কেউ কিছুই বলতে পারে না!

– মাসালা.কম ও দ্য কুইন্ট অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।