দায়ভার কার!

অভিজ্ঞতা তো আর কম হয়নি। এখনকার সময়ে টেস্ট ক্রিকেট মাতানো জো রুট, রবীন্দ্র জাদেজাদের টেস্ট অভিষেকেরও আগে থেকে তিনি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে যাচ্ছেন।

২০১১-২০১৭, মুশফিকুর রহিম। ৬ বছর ধরে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার খেলা মোট ৫৬ টেস্টের ৩২ টিতেই ছিলেন অধিনায়কের বেশে। অধিনায়ক হিসেবে ২০০০+ রানও করে ফেলেছেন ইতিমধ্যে। ক্যারিয়ার সেরা ২০০ রান, ক্যারিয়ারের ৫ টেস্ট সেঞ্চুরির ৪টি ই এই অধিনায়ক হিসেবেই। টেস্টে যেখানে ৩৫.৭০ গড়ে রান করেছেন সেখানে অধিনায়ক হিসেবে ৪৩.০৭ গড়ে রান করেছেন তিনি। অথচ অধিনায়ক হওয়ার আগে তার ব্যাটিং গড় ছিল ২৭.১৫!

এতো বললাম মুশফিকুর রহিমের ব্যাক্তিগত পারফরমেন্সের পরিসংখ্যান। এখন একটু দলীয় পরিসংখ্যানের দিকে চোখ বুলানো যাক।

টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের জয় মাত্র ১০ টি। অর্থাৎ ১০১ ম্যাচে মাত্র ১০টি! মুশফিকুর রহিম অধিনায়ক হবার আগে বাংলাদেশ কেবলমাত্র ২০০৫ এ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ঐতিহাসিক জয় এবং ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম বিদেশ জয় ছাড়া কোনো জয়ই ছিলনা। অথচ মুশির অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ জিতেছে ৩২ ম্যাচে ৭ টি ম্যাচ। আর মুশফিক অধিনায়ক হবার আগে বাংলাদেশের জয় ছিল ৭৮ ম্যাচে মাত্র ৩ টি!

পরিসংখ্যান সবসময়ই কথা বলে। কখনো সেটা গর্বের, কখনোবা হতাশার। তবে মুশফিকের এই পরিসংখ্যান হতাশার কথা বলেনা, বরং গর্বের কথাই বলে। টেস্ট ক্রিকেটে বারবার ব্যার্থ হওয়া বাংলাদেশ দলকে মাত্র ৩২ ম্যাচেই ৭ টি জয় এনে দিয়েছেন তিনিই। এটা কি কম গর্বের?

কিন্তু সব কিছুরই একটা প্রতিচ্ছবি আছে। আছে মুশফিকুর রহিমের অধিনায়কত্বের প্রতিচ্ছবিও। যে প্রতিচ্ছবিটা দেখতে আদতেও সবার অনুকূলে নয়, বরং বড়ই কিম্ভুতকিমাকার। কিছু খামখেয়ালিপনা, কিছু একঘেয়েমিপনা।

আপনার কাছে মুশি কেমন অধিনায়ক?

যদি এই প্রশ্ন কেউ আমাকে করে তাহলে আমি বলব দুইটা দিক বাদ দিয়ে মুশি ভালো অধিনায়ক।

কোন দুইটা দিক জানেন? জেনে নিন।

প্রথমত: ক্যাপ্টেন হিসেবে মুশি যথেষ্ট ডিফেন্সিভ। আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে যেটা বড্ড বেমানান।

একজন ব্যাটসম্যান যখন নার্ভাস নাইনটিজে গিয়ে পৌঁছায় এবং যখন তার সেঞ্চুরী করতে ২-৩ রানের প্রয়োজন হয় তখন একজন অধিনায়ক ডিফেন্সিভ ফিল্ডিং সাজাইতে পারেনা। আর এটা টেস্ট ক্রিকেট বলে তো ডিফেন্সিভ ফিল্ডিং সাজানোর প্রশ্নই ওঠেনা! আজকের কথাই ধরুন। ওয়ার্নার তখনও ৯৯*, বোলার নাসির। তখন ফিল্ডিং সেটআপ কেমন হওয়া উচিত? নিশ্চয় একটি স্লিপ, একটি লেগ স্লিপ, একটি সিলি পয়েন্ট ও একটি ফরোয়ার্ড শর্ট লেগ। এগুলো অবশ্যই থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আসলে ওয়ার্নারের বেলায় একটি স্লিপ ফিল্ডার ছিল মাত্র! এই দিক দিয়ে আমাদের আরো সজাগ হওয়া আবশ্যক।

দ্বিতীয়ত: টেস্ট ক্রিকেট পার্টনারশিপের খেলা। শুধু টেস্ট ক্রিকেটই নয় বরং ক্রিকেটের সব ফরম্যাটই পার্টনারশিপের খেলা। প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের পার্টনারশিপ গড়তে দেবার আগেই তাদের ঘায়েল করে দিতে হবে। তার ভিতর দিয়েও পার্টনারশিপ গড়ে ওঠবে। আর ওই পার্টনারশিপ ভাঙতে দুই দিক হইতে বারবার একই বোলারদের দিয়ে আক্রমন করলে উইকেট নাও পড়তে পারে। তারপরেও মুশফিক ওই একই বোলার বারবার ব্যাবহার করেন। কখনো সাকিব, কখনো মিরাজ কিংবা কখনো তাইজুল। অথচ মুশি খুব কম সময়েই অকেশনাল কোনো বোলারদের হাতে বল তুলে দেন। এই দিকে নজর দেওয়া খুবই জরুরি। প্রতিপক্ষের পার্টনারশিপ ৫০ থেকে ১০০, ১০০ থেকে ১৫০ হয়ে গেলেও নাসির/মমিনুলদের ব্যবহার করা হয়না। আর ব্যবহার করলেও খুব কম।

এই দুটো দিক দিয়ে আমি মুশফিককে ভালো অধিনায়ক হিসেবে আখ্যা দিতে পারব না।

এটা আমার একান্ত মতামত। তবে কেউ এর দ্বিমত দিতে পারেন। যারা দ্বিমত দেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, দয়া করে ক্রিকেট কে একটু গভীরভাবে দেখুন। জাতী হিসেবে আমরা বড্ড আবেগী। কিন্তু ক্রিকেটে সবসময় আবেগ চলেনা। বাস্তবতারও আশ্রয় নিতে হয়। যদি কথাগুলো বুঝতে না পারেন তাহলে ‘ট্রল ক্রিকেট’ এর পোস্ট গুলো ফলো করেন। একই ম্যাচে আপনি বোলিংয়ে খারাপ করলে আপনাকে ধুয়ে দিবে আর ব্যাটিংয়ে নেমে ভালো করলে প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিবে। এটাই ক্রিকেট, এটা আবেগ নয়। মুশফকিকের ক্যাপ্টেন্সীর ব্যাপারটাও আপনাকে বুঝতে হবে।

এতো গেল মুশির ব্যাপার। এখন আসি আমাদের ফিল্ডিং নিয়ে।

অস্ট্রেলিয়া সিরিজে আমাদের ফিল্ডিং দেখে বারবার হিমশিম খেতে হচ্ছে দর্শকদের। এ কেমন ফিল্ডিং? একই ফিল্ডার একই ইনিংসে বারবার ক্যাচ মিস করছেন! তবুও শুধরে যাচ্ছেন না। এটা তো আমাদের বুঝতে হবে যে এটা পাড়ার ক্রিকেট টিমের সঙ্গে আপনি খেলছেন না। আপনি খেলছেন টেস্টের পরাশক্তির বিপক্ষে। ওয়ার্নার, স্মিথ, ম্যাক্সওয়েলদের ক্যাচ কিংবা স্ট্যাম্পিং আপনি একবার মিস করলে সেটা কতদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে সেটা আপনি নিজেই দেখেছেন এই সিরিজে। প্রথম ম্যাচে ওয়ার্নার জীবন পেয়ে সেঞ্চুরি করলেন, দ্বিতীয় ম্যাচেও একই হাল; ওয়ার্নার ১২৩!

সৌম্য, ইমরুল, মিরাজ, মুশিরাদের নিকট হইতে আমরা এই সিরিজে একাধিক ক্যাচ মিসের মহড়া দেখেছি। এটা যদি আমরা বারবার করি তাহলে আমরা কবে শুধরাবো? এমন ভুল করার পরে প্রতিপক্ষ যখন চালাকের আসনে চলে যায়, তখন এই ভুলগুলোর মাসুল দেবে কে? কে নিবে এটার দায়ভার? আবেগ দুরে সরিয়ে আপনার দৃষ্টিকোণ হইতে এই প্রশ্নটা একবার করুন তো! তখনই আপনার টনক নড়বে। আপনাকে এটা বুঝতে হবে। ক্রিকেটারেরা একই ভুল বারবার করলে সেটা নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা আমরা রাখি। আবার যখন জয় এনে দেয় তখনও তাদের নিয়ে মাতামাতি ও উল্লাস করা দায়টা আমাদেরই।

অনেক লিখলাম। হয়তো কারো কাছে এটি পছন্দ হবে, অথবা কারো কাছ নয়। তাই পরিশেষে সবাইকে জাগ্রত হবার আহবান জানাই। আমরা আমাদের ক্রিকেটারদের প্রতি উগ্র না হই। সুখে দুঃখে তাদের পাশেই থাকি। আর ভুল করলে প্রয়োজনে প্রশ্ন ছুড়ে দিই, ‘এগুলোর দায়ভার কার?’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।