দাম্ভিকতার ভিত নড়লো অবশেষে

ভদ্রলোকের নাম ডেভিড হুকস। নাক উঁচু এ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট খেলে যতটা সুনাম কুড়িয়েছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি খ্যাতি পেয়েছিলেন ২০০৩ সালে এক মন্তব্য করে। ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ যখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার রোমাঞ্চ খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায়, মাঠের বাইরে থেকে ভদ্রলোক সে রোমাঞ্চে জল ঢেলে দিয়েছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে একদিনেই হারাতে পারে’ – এমন তাচ্ছিল্যভরা মন্তব্য করে। সেবার হাবিবুল বাশারেরা জবাব দিতে পারেননি।

অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট বললে যেখানে চোখে ভাসে এমসিজি, এসসিজি, কোথাকার কোন ডারউইন আর কেয়ার্ন্স শহরে সেবার টেস্ট খেলেছিলো বাংলাদেশ। পাঁচ বছর পরে ওডিআই খেলতে গেলে, দৃশ্যপট বদলায়নি একটুও, ভেন্যু আবারও সেই ডারউইন। মাশরাফিরা জবাব দিতে পারেননি ওইবারও। সফরের তিন ওয়ানডে হেরেই ঢাকাগামী ফ্লাইটে চড়েছিলো বাংলাদেশ।

জবাব দেবার জন্য এক মওকা দরকার ছিলো। স্নায়ুক্ষয়ী এক ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়ে সে জবাব দেয়া হয়েও গেলো। হাতের ব্যাট-বলই যখন কথা বলে, মুখের ব্যবহার সেখানে বাহুল্য বৈ কিছুই নয়।

ছোটবেলায় তিনি চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট হতে চেয়েছিলেন বলে শোনা যায়। যেভাবে একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে নিজেকে যুক্ত করছেন, তাতে খেলা ছাড়ার পর পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হিসেবে তাকে দেখা গেলে, অবাক হবার কিছু নেই। তবে জ্যোতিষী হতে চেয়েছেন কিংবা এখন পর্যন্ত কারো হাত দেখেছেন, এমনটা শোনা যায়নি কখনোই। এখন দেখা যাচ্ছে, ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে সাকিব আল হাসান যথেষ্টই সফল।

এর আগে পাকিস্তানের সাথে সিরিজের আগে তিনি এভাবেই বলেছিলেন, পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করতে চান। তামিম ইকবালের ব্যাটে তেমনটাই হয়েছিলো, যেমনটা তিনি বলেছিলেন।

এবার সিরিজ শুরুর আগে, ঘোষণার সুরে আবারও তিনি বলে বসলেন, অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হোয়াইটওয়াশ করতে চাই।

নাহ, সিরিজ এখনও শেষ হয়নি। অজিদের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ী বাংলাদেশ, তা এখনও চর্মচক্ষে দেখা হয়নি। তবে, অজিদের বিপক্ষে ১ম টেস্ট শেষে বাংলাদেশ এগিয়ে ১-০ ব্যবধানে, যেন ঈশপের কোনো রূপকথার গল্প।

তা এই রূপকথার গল্পের রচয়িতা কে? কে আবার, যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন অজিদের ২-০ তে সিরিজ হারাবো, তিনিই।

১ম ইনিংসে তিনি যখন ব্যাট হাতে নামছেন, বাংলাদেশ দল তখন ‘প্যাট কামিন্স’ ঝড়ে লণ্ডভণ্ড। ১০ রানে কোনো দল ৩ উইকেট হারালে তো তা-ই বলতে হচ্ছে। ব্যাট হাতে সেদিন করেছিলেন ৮৪ রান। তবে, এই ৮৪ রান যে কেবল ৮৪ রানে সীমাবদ্ধ না থেকে এ দেশের ক্রিকেট আর্কাইভেরই এক ইনিংস হয়ে যাবে, কে জানতো! স্টিভ স্মিথের কথা শুনলে অবশ্য তাঁর ইনিংসকেই পার্থক্য বলে মনে হচ্ছে। স্মিথের মতে, ১ম ইনিংসে তার দল বড় একটা রান করতে না পারাই তাদের ম্যাচ হারের একমাত্র কারণ।

সেই বড় রান যে হয়নি, তার পেছনেও তো তার অবদান। ইনিংসে পাঁচ উইকেট, কোনো কোনো বোলারের জন্য পরম আকাঙ্ক্ষিত হলেও সাকিব বলতে পারেন, এ আর এমন কি! ৫০ তম টেস্টে ১৬ তম বারের মতো পাঁচ উইকেট পেলে, তা তিনি বলতেই পারেন। তবে এবারের পাঁচ উইকেট একটু বিশেষত্ব দাবি করছে। ৯ টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট, ১৩৭ বছরের টেস্ট ক্রিকেট এমন রেকর্ড দেখেছে এর আগে তিনজনের হাতে। সাকিব আল হাসান সে লিস্টে চতুর্থ।

দ্বিতীয় ইনিংসে আরও একবার পাঁচ উইকেট শিকার। একা সাকিব আল হাসানই তো অজিদের হারিয়ে দিলেন।

তা অবশ্য পুরোপুরি বলা যাচ্ছে না। কেন? প্রশ্নটা স্টিভেন স্মিথের কাছে রাখলেই উত্তর পেয়ে যাবেন। স্পিন বল এর আগে কোন অস্ট্রেলিয়ান এত সাবলীলভাবে খেলছেন, রীতিমতো গবেষণার দাবি রাখে। স্পিন বলের বিপক্ষে ব্যাটিং গড় ৪৪.১৬, যেকোনো অস্ট্রেলিয়ানের জন্যই ঈর্ষণীয়। সেই স্মিথি যখন কোনো উইকেটে ৫০ পেরোতে ব্যর্থ হন, বুঝতে আর বাকি থাকে না, উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য মোটেই আদর্শ নয়। টেস্টের ১ম দিন থেকেই বল তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছে, সাধারণ স্পিনার হঠাৎই রূপ নিচ্ছেন মুরালিধরনে, এমন উইকেটে দুই ইনিংসে ফিফটি, তামিম ইকবালের জন্য বেশ বড় এক অর্জনই। ‘টু মিনিট নুডলসে’র ব্যাটিং পেরিয়ে এখন তামিম ইকবাল যথেষ্ট পরিণত, তার প্রমাণই রাখলেন আরেকবার।

যদি বলা হয় পরিণতিবোধের কথা, বাংলাদেশ দলের সেই ব্যাটসম্যান হলেন মুশফিকুর রহিম। টেকনিক্যালি সলিড মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিং যেকোনো সময়ই দৃষ্টিসুখকর। তবে কার্যকারীতা বিচারে তার ২য় ইনিংসের ৪১ রান, দেশের ক্রিকেটের জন্য বয়ে আনলো সবচেয়ে সুখকর এক মুহূর্ত। ক্যাঙারু বধ বলে কথা।

বলা যেতে পারে, তাইজুলের কথা। প্রথমম ইনিংসে পিটার হ্যান্ডসকম্বকে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের মেরুদণ্ড ভেঙেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে আবার হ্যান্ডসকম্ব এবং এগারকে ফিরিয়েছেন, আর জশ হ্যাজলউডকে আউট করার স্মৃতি তো পাকাপাকিভাবে জায়গাই করে নিয়েছে।

গতকাল ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যাচ মুঠোয় পুরতে না পারায় সৌম্য সরকারের হয়তোবা হঠাৎই দম বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিলো। পিটার হ্যান্ডসকম্ব আর হঠাৎই ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠা নাথান লায়নের দারুণ দুটি ক্যাচ লুফে, সৌম্য সরকার এখন নিঃশ্বাস ছাড়তেই পারেন।

দুই ইনিংসেই বাজে ব্যাটিংয়ের জন্য সমর্থকেরা কাঠগড়ায় তুলেছেন ইমরুল কায়েস আর সাব্বির রহমানকে। সমর্থকদের আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি নাসিরও। মিরাজের বোলিংয়ে হরহামেশাই চোখে পড়ে অনভিজ্ঞতার ছাপ। তবে দিনশেষে দেখা যাচ্ছে, তাদের ছোটছোট অবদানগুলো ম্যাচে এনে দিয়েছে নাটকীয় মোচড়।

শেষমেশ তো দেখা যাচ্ছে, এ মোচড়গুলোই মুচড়ে দিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার দাম্ভিকতা, নাড়িয়ে দিয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব। শাবাশ বাংলাদেশ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।