বাংলাদেশের তৃণমূল ক্রিকেটের সংকট

কোনো বল মাঠে না গড়াতেই গত ১১ জুলাই শেষ হয়ে গেলো বাংলাদেশের তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেটের বাছাইপর্ব, যেখানে অংশ নিয়েছিলো মাত্র দুইটি দল। ফলে দৃশ্যত টুর্নামেন্টটা হয়ে গিয়েছিলো এক ম্যাচের। কিন্তু সেই ম্যাচটাও মাঠে গড়ায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠটি বৃষ্টির কারণে খেলার অনুপযুক্ত থাকার কারণে।

ফলে ম্যাচ অফিসিয়ালদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, টুর্নামেন্টটির বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়েছে টসের মাধ্যমে। পূর্বাচল স্পোর্টিং ক্লাব টসজয়ের মাধ্যমে জয়ী ঘোষিত হয়েছে, অন্যদিকে রানারআপ হয়েছে নবাবগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি। কিন্তু সেটাই ছিলো পরের তৃতীয় বিভাগ টুর্নামেন্টে সুযোগ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এতে করে আরও একবার ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশের দৈন্যদশা স্পষ্টভাবে ধরা পড়লো।

ক্লাবভিত্তিক ক্রিকেটের দায়িত্বে থাকা ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিসের (সিসিডিএম) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই টুর্নামেন্টের এন্ট্রি ফি গত তিন বছর ধরেই করা হয়েছে পাঁচ লক্ষ টাকা। আর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে প্রতি বছরই শুধু দুইটি দল ছাড়া কেউ টুর্নামেন্টে নাম লেখায়নি, কিংবা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহও দেখায়নি।

সিসিডিএম কো-অর্ডিনেটর আমিন খান বলেন, ‘যেহেতু দুইটি দল ছাড়া অন্য কেউ এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেনি, তাই টসের ভিত্তিতেই দুইটি দলকে আমরা চ্যাম্পিয়ন এবং রানারআপ হিসেবে ঘোষণা করেছি।’

বাংলাদেশ ক্রিকেটের তৃণমূল পর্যায়ে এই পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও খারাপ দিকে এগিয়ে চলেছে। সিসিডিএম যখন ২০১৫ সাল থেকে এই টুর্নামেন্টের এন্ট্রি ফি পাঁচ লক্ষ টাকা বলে ধার্য করলো, নিম্নযাত্রার শুরুটা হয়েছিলো সেদিনই। হঠাৎই এই টুর্নামেন্টের উপর থেকে যেন সবার আগ্রহ রাতারাতি উবে গেলো। আর যাবে না কেন? এর আগে এন্ট্রি ফি যে ছিলো বর্তমান পরিমাণের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ!

এন্ট্রি ফি বাড়ানোর পর প্রথম সিজনে অংশগ্রহণকারী দুই দল ঢাকা ক্রিকেট একাডেমি এবং অ্যাক্সিওম ক্রিকেটার্স কোনও ম্যাচ না খেলেই সরাসরি চলে যায় মূল পর্বে। পরেরবার তিন দল অংশগ্রহণ করলেও শেষ মুহূর্তে পূর্বাচল নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিলে সেবারও টুর্নামেন্টে থাকে দু’টি দলই। একমাত্র কোয়ালিফাইং ম্যাচ হিসেবে গতবার অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে খেলা মাঠে গড়িয়েছে অবশেষে, সেই ম্যাচে মোহাম্মদপুর ক্রিকেট ক্লাবকে পরাজিত করে শান্তিনগর ক্রিকেট ক্লাব।

ক্রিকেট সংগঠকেরা অবশ্য এহেন গলাকাটা হারে এন্ট্রি ফি বাড়ার পিছনে দোষ দিচ্ছেন তৃতীয় বিভাগ বাছাইপর্বের প্রতি সকলের বিমুখতাকে। অধিকাংশ তরুণ প্রতিভার প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের সাথে পরিচয় হওয়ার কথা যে টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে, সেটাই যেন এখানে অস্পৃশ্য হয়ে রয়েছে! কিন্তু কেন?

প্রথমত, একটা বড় কারণ অবশ্যই অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। বর্তমানে চলমান ক্রিকেট ক্লাবগুলোর অধিকাংশেরই এই বিশাল পরিমাণ এন্ট্রি ফি দিয়ে খেলাটা সম্ভব নয়, সত্যি বলতে, বাস্তবসম্মতও নয়। আর মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে এসেছে বিসিবি কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া কিছু অদ্ভুত নিয়ম। টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী দলগুলো অবশ্যই বাণিজ্যিক কোনও সংস্থার নাম অনুযায়ী রাখা চলবে না, অবশ্যই একটি পরিপূর্ণ গঠনতন্ত্র থাকতে হবে, স্থায়ী একটি ঠিকানা থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে।

এ বিষয়ে প্রাক্তন ক্রিকেট খেলোয়াড় তারেক আজিজ বলেন, ‘বাছাইপর্ব খেলতে চাওয়া কোনও একটি দলের পক্ষে এই সবগুলো নিয়ম মানাটা খুবই কঠিন।’ তিনি এক দফা চেষ্টা করেও একটি দলের দায়িত্ব নিয়ে এই টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট হতে পারেননি বিসিবি’র এই নিয়মগুলোর গণ্ডিতে আটকে গিয়ে। আপাতত তিনি ঢাকায় একটি ক্রিকেট একাডেমির দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি আরও জানান, অদূর ভবিষ্যতে যদি এই নিয়মের বেড়াজাল তুলে নেওয়া না হয়, আগামী ছয়-সাত বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে একটি বড়সড় ক্রিকেটার-সংকট সৃষ্টি হতে চলেছে।

তিনি আরো বলেন, ‘উদীয়মান ক্রিকেটারদের প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টের স্বাদ নেওয়ার প্রথম সুযোগ হতে পারে এই টুর্নামেন্টটাই। সুতরাং, এখনই তাঁদেরকে যদি নিরুৎসাহিত করা হতে থাকে এভাবে, আসন্ন দিনগুলোতে তার জন্য আমাদের ভুগতেই হবে।’

– ক্রিকবাজ অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।