তাহসান-মিথিলার ডিভোর্স ও ভালবাসার সংজ্ঞা

বিষয়টা অবশ্যই দু:খজনক। জনপ্রিয় জুটি তাহসান-মিথিলা তাদের ১১ বছরের সম্পর্কের ইতি টেনেছেন। যুবসমাজের অনেকের কাছেই তারা আইডলের মত ছিলেন। কিন্তু, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেটা দেখি, কোন ইস্যুতে আমাদের জনগনের আবেগটা যেখানে খাটার কথা বিচিত্র কোনো কারণে তার সম্পূর্ণ অন্যদিক দিয়ে খাটে!

কুরুচিপূর্ণ ট্রল তো আছেই, তার পাশাপাশি স্যোশাল অসংখ্য মানুষকে আমি দেখছি হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন। ‘তাহসান মিথিলার মতো ‘আইকনিক কাপল’ ডিভোর্স নিল, আমি আর প্রেমে বিশ্বাস কিভাবে করবো?’ ‘আজ বুঝলাম প্রেম ভালোবাসা বলে আসলে কিছু নেই’ ‘love is just a word nothing else’ ইত্যাদি ইত্যাদি স্ট্যাটাসে ভরপুর ফেসবুক। এসব দেখে আমার আসলে জানতে খুব ইচ্ছা করছে আমাদের এই জেনারেশন টার কাছে প্রেম ভালোবাসার ডেফিনিশন বা ‘আদর্শ’টা আসলে কি?

ভালোবাসা কি শুধুই মাথায় একটা ‘রিলেশনে আছি’ এই ট্যাগ গায়ে লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবার বস্তু? ভালোবাসা কি দূর থেকে কোন হিটহট জুটিকে দেখে কল্পনা করার জিনিস যে ‘আমার প্রেম ওদের মতো এরকম হবে’! আর ওই জুটিরে বিচ্ছেদের পর ভালোবাসার ধারণা মিথ্যে হয়ে যাবে? আমাদের ভালোবাসার দেওয়াল এতো ঠুনকো হবে কেন! আমরা কি ভালোবাসার সংজ্ঞা বুঝি না? গভীরতা বুঝি না? আমাদের কী এখনো নিজ যোগ্যতায় একেবারে মরণ পর্যন্ত ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার পরিপূর্ণ মানসিক পরিপক্কতা আসে নাই?

সঠিক উত্তর হচ্ছে না আসে নাই। অধিকাংশের প্রেম ভালোবাসার অবসান ঘটে আমাদের নিজেদেরই ভুলে! তাহসান-মিথিলার মতো সো কলড ‘আইকনিক কাপল’ রা কখনো ভালোবাসার স্ট্যান্ডার্ড ছিল না। আমাদের প্রেমের স্ট্যান্ডার্ড আমরা নিজেরা কতটা চেষ্টা করি তার ওপর নির্ভরশীল!

সিরিয়াসলি বলেন তো, আপনারা কি তাহসান-মিথিলাকে ভিনগ্রহের কেউ ভেবে বসেছিলেন?

সুবর্ণা মস্তফা হুমায়ূন ফরীদীর ডিভোর্স হয়েছে, হুমায়ূন আহমেদ-গুলতেকিনের ডিভোর্স হয়েছে, ঋত্বিক রোশন-সুজ্যানের ডিভোর্স হয়েছে, শাহরুখ গৌরীরটা ভাঙতে যাচ্ছি প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে কেন্দ্র করে, টম-ক্যাট জুটি ব্র্যাঞ্জেলিনা জুটি কেউই একসাথে নাই! এরা তাহসানের চেয়ে বহুগুন বেশী ‘আইকনিক কাপল’ ছিল! ওদের চেয়ে ডাবল দিন সংসারও করছে অনেকে! তাও এদের সংসার ভেঙ্গেছে, একাধিক সন্তান থাকার পরও।

ঠিক সেরকমভাবেই, যেরকম ভাবে আমাদের প্রেম হয়, প্রেম ভাঙে, বিয়ে হয়, বিয়ে ভাঙে… ২০-২১ বছরের পুরনো বিয়েও টেকে না। এইসব কাপলকে আইকনিক বানাই আসলে আমরাই। সাথে থাকে মিডিয়া।

মিডিয়া তারকাদের শাশ্বত-অমর জুটি হিসেবে আমাদের দেখতে শেখায়। আমরাও তাদের দেখতে পছন্দ করি! তাহসান মিথিলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে! জুই নারিকের তেলের ‘সূর্য ডাকে আমার রোদে…’ জাতীয় টিভিসি, এরপর নাটক, গান এবং মিডিয়ার অসংখ্য নিউজ পড়লে যে কেউ এদের কে রোমিও জুলিয়েট, বীর-জারা ধরে নিতে বাধ্য।

কিন্তু আসলে আমরা ভুলে যাই সেলিব্রেটিরাও আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ। তাদেরও আমাদের মত আবেগ আছে। কখনো তারা আমাদের মতই স্বার্থপর হয়। আমাদের মতই সন্দেহপ্রবন হন কখনো। ছোট ছোট বিষয়ে তাদের মধ্যে খুনসুটি হয়, ঝগড়া হয়, বিচ্ছেদ হয়, আমাদের মতই এরা ভুল করে, কখনো কখনো অপরিপক্কতা দেখায়।

সুতরাং চারপাশের অসংখ্য বিচ্ছেদকাহিনীর মতই এটাও জাস্ট আরেকটা বিচ্ছেদ কাহিনী! এটার জন্য ভালবাসার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

ভালবাসার সম্পর্ক কখনো নিজে থেকে টিকে থাকে না। দু’পক্ষকেই অবদান রাখতে হয়, ছাড় দিতে হয়, একে অপরকে বুঝতে হয়। যখন একদিকে হেলে পড়তে থাকে তখন শক্ত করে ধরে ফেলতে হয়। ভালোবাসা মানে ‘একই বাধনে বাঁধা দুজনে ছেড়ে যাবো না’ মোটেই না, ভালোবাসার মানে হলো ‘যখন বাঁধন আলগা হতে শুরু করবে তখন দুজন দুদিক থেকে টেনে ধরে ফেলবো, দুজনে মিলে সর্বোচ্চ চেষ্টা জোড়া লাগাব, তাও ছেড়ে যাবো না’।

আমরা কখনো ভালবাসায় ব্যর্থ হলে তাই সেই দায় তাহসান-মিথিলার নয়। তাই, অনুপ্রেরণা খুঁজতেও আমাদের রুপালী পর্দার তারকার দিকে তাকানোর দরকার নেই। অনুপ্রেরণা খুঁজুন নিজের পরিবারে, নিজের আগের প্রজন্মে, নিজের বাবা-মার মধ্যে।

আপনারাও নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজেদের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে যান। অল উই ক্যান ডু ইন লাভ ইজ ‘ট্রাই’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।