তাসকিনকে গালি দেওয়ার আগে একটু ভাবুন

পরিষ্কার হিসাব, তাসকিনকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি বলে আমি মনে করি।

আমাদের এখনো বালতি ভরে ভরে কোয়ালিটি পেসার নাই যে একটা ২২ বছরের ‘সম্ভাবনাময় গতিতারকাকে’ মাত্র এক সিরিজে ৭-৮ করে ইকোনমিতে রান দিয়েছে বলে ছুড়ে ফেলে দিব। আপনারা তাসকিনের লাইন লেংথ এর ঘাটতি দেখছেন, আমি দেখছি ওর অসহায়ত্ব। কেমন?

খেয়াল করেছেন তাসকিনের গতি কি পরিমাণ কমে এসেছে? যে ছেলে ১৪০র নিচে বলই করতো না, এই সিরিজে কয়বার তার ডেলিভারী ১৪০ ছুয়েছে?? এটার কারণ দুটা হতে পারে। এক: ইন্টার্নাল কোন ইনজুরি যেটা একটা স্ট্রং কারণ হতে পারে; দুই: হয়তো বাংলার আপামর জনতার প্রত্যাশার চাপ ও সমালোচনা গালাগালির বোঝা সইতে সইতে ক্লান্ত তাসকিন গতি কমিয়েছে, নজর দিতে চেয়েছে একুরেসীর দিকে। কিন্তু এতে কাজ হচ্ছে না, না হবার কারণ যথেষ্ট!

সবকিছুর সাথে আপোষ করা গেলেও নিজের আদর্শ আর স্পোর্টসম্যানশিপ স্পিরিটের সাথে আপোষ করা চলে না। তাসকিনের কাছে বোলিং মানেই ছিল গতি গতি আর গতি! এটাই ওর স্পেশালিটি আর নেচার, এতোদিন সে যা করেছে গতি দিয়েই করেছে।

হঠাৎ নিজের স্বত্তা চেঞ্জ করলে বা চেঞ্জ করানোনো হলে ডিসঅরিয়েন্টেড হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এটা একদম ফ্যাক্ট যে, এতো বাজে বোলিং তাসকিন তার ক্যারিয়ারে করেনি কিন্তু, একটু চিন্তা করে দেখবেন প্লিজ গালি দেবার আগে।

আর যারা হিরো, নায়ক, চুল, সেলফি নিয়ে টিপ্পনী কাটছেন তারা হলেন স্রেফ তৃতীয় শ্রেণীর দর্শক। তারা খেলা শুধু দেখেনই, কোনদিন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেননি। আপনারা তাসকিনের চুল দেখবেন, সেলফি দেখে গালি দেবেন, কিন্তু এটা জানবেন না যে, মাশরাফির পরে এই বোলারটাই দলে সবচেয়ে বেশি খাটে। লংগার ভার্সনেও সবচে বেশি ডেডিকেটেড তাসকিনই। এটা আমার কথা না, খেলোয়াড়, কোচ আর ক্রীড়া সাংবাদিকরা সবাই এটা একবাক্যেই স্বীকার করবেন।

আমাদের দেশে ফাস্ট বোলারদের ‘খাটো’ করে দেখা হত আজ থেকে চার বছর আগেও। কোন পরিবেশ, পিচ, পারিপার্শ্বিকতা, ট্রেনিং কিছুই কি আমরা দিতে পেরেছি কোনদিন? পারিনি। পারলে ১৮ বছর পরেও বিশ্বমানের পেসারদের তালিকায় হাতে গুনে হাফ ডজন নাম থাকতো না! এই ৫-৬ জন সম্পূর্ণ প্রকৃতির দান, আমাদের সিস্টেম বা জাতিগত ক্রিকেট মানসিকতার এদের উঠে আসার পিছনে যতটুকু অবদান তার চেয়ে দশগুন তারা আমাদের ফেরত দিয়েছে।

যাদেরই একজন কিন্তু তাসকিন! ২২ বছর বয়সী তাসকিন! মাথায় রাখা উচিত কথাগুলো। এই সিরিজের আগেও তাসকিন পারফর্ম করেছে, এই সিরিজের পরেও না করার কোন কারণ দেখিনা।

২০১৫ থেকে টানা পারফর্ম করে আসা ফাস্ট বোলারকে মাত্র একটা সিরিজে পাকা রাস্তা টাইপ পিচে বাজে বোলিং করতে দেখে যারা বাতিল করে দিচ্ছেন ঘিলুহীন বলছেন তাদের মধ্যে কয়জন নিয়মিত অন্য দেশগুলির আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখেন জানিনা। ইংল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার ৩০০ থেকে ৪০০ পর্যন্ত ছাড়ানো ম্যাচগুলিতে রান ব্যাটসম্যানরা বল করে দেয় না।

চাইলেই তাসকিনের অবদান আর উপরের এই ফ্যাক্টগুলি মাথায় রাখা যায়, আবার চাইলেই বেমালুম ভুলে গিয়ে তাসকিনের চুল, স্টাইল নিয়া নিম্নশ্রেণীর রসিকতা আর গালিগালাজ করা যায়। কোনটা করবেন সেটা আপনার ব্যাপার, তবে গালি দেওয়ার আগে একটু ভাবুন। এই দুই-এর পার্থক্যটাই কিন্তু জাতি হিসেবে, সমর্থক হিসেবে আমাদের ক্রিকেটবোধের পরিচায়ক।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।