তাঁদের অন্য ভূবন

খাবার খেতে কে না ভালবাসে! আচ্ছা, খেতে পছন্দ করে না এমন কেউ কী আছে এই ব্রহ্মাণ্ডে? সম্ভবত নেই। অন্ততপক্ষে বাংলাদেশে যে এমন কেউ নেই তা জোর দিয়ে বলাই যায়। কারণ হিসেবে বলা যায় ভোজনবিলাসী হিসেবে বিশ্বব্যাপী বাঙালি জাতির সুখ্যাতির কথা।

বাঙালির ভোজনবিলাস কারও অজানা নয়। ভোজনরসিক জাতি হিসেবে তাঁরা পুরো বিশ্বে সমাদৃত। আর এই ভোজনরসিক জাতির একজন ভোজনপ্রিয় মানুষ মোহাম্মদ আশরাফুল। খাবারের প্রতি এই বাংলাদেশি ক্রিকেটারের দুর্বলতা বরাবরই একটু বেশি। তাই বেশকয়েকবছর আগে মাঠে খেলা চালিয়ে যাবার পাশাপাশি অনেকটা শখের বশে রেস্তোরাঁ খুলে বসেন তিনি।

ক্রিকেটার হিসেবে রেস্তোরাঁ কিংবা খাবারের ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়া বিরল কিছু নয়।আশরাফুলের মত আরো বেশকিছু দেশি-বিদেশি ক্রিকেটার রয়েছেন যারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার সময় রেস্তোরাঁ ব্যবসায় নিজেদের জড়িয়েছেন। তবে খেলা চালানো অবস্থায় বা খেলা থেকে অবসরে যাওয়ার পর রেস্তোরাঁ খুলে বসা ক্রিকেটারদের মধ্যে এশিয়ার ক্রিকেটারদেরই আধিক্য বেশি দেখা গেছে। এশিয়ার মধ্যে এরূপ ক্রিকেটারদের সংখ্যাটা আবার ভারতে বেশি।

উদাহরণ শুরু করা যাক ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কপিল দেবের নাম নিয়ে যিনি ১৯৮০ সালে চন্ডিগড়ে ‘হোটেল কপিল’ নামে একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন। তাঁরই স্বদেশী ও ভারতের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকার মুম্বাইয়ে ‘টেন্ডুলকার’স’ নামের একটি রেস্তোরাঁ খুলেন ২০০২ সালে। এরপর তাদের পথ একে একে অনুসরণ করেন অজয় জাদেজা, সৌরভ গাঙ্গুলি, জহির খান, শান্তকুমারন শ্রীশান্ত, বিরেন্দর শেবাগ, রবিন উথাপ্পা ও রবীন্দ্র জাদেজা।

বাংলাদেশেও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় জড়ানো ক্রিকেটারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। আশরাফুল, সাকিব, তাসকিন, কায়েসসহ বেশকয়েকজন ক্রিকেটার খেলার পাশাপাশি নিজ নিজ রেস্তোরাঁ খুলে বসেছেন। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে ‘মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাব’ নামে সামুদ্রিক খাদ্যের রেস্তোরাঁ খুলেন ২০১২ সালে কলম্বোতে যা ইতোমধ্যে পর্যটকদের সবচেয়ে পছন্দের রেস্তোরাঁর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। তাছাড়া এশিয়ার বাইরে উইন্ডিজের ক্রিস গেইল ও কোর্টনি ওয়ালসের একটি করে রেস্তোরাঁ আছে।

বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে সবার আগে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় নাম লেখান মোহাম্মদ আশরাফুল। ২০১১ সালের ১০ জুন কয়েকজন বন্ধু নিয়ে ‘সিচুয়ান চায়নিজ অ্যান্ড ফাস্ট ফুড’ নামে একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন তিনি। নামেই বুঝা যায় এটি একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁ। এমনকি এটি নামাঙ্কিতও হয়েছে একটি চীনা মশলার নাম অনুসারে। চাইনিজ ও থাই খাবার নিয়েই কারবার রেস্তোরাঁটির। পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় সব খাবারের দেখা মেলে এখানে।

ছয় বছর আগে রাজধানীর বাসাবোতে রেস্তোরাঁটি চালু করা হয়। বাসাবোর বৌদ্ধ মন্দিরের ঠিক উল্টোদিকে এর অবস্থান। চমৎকার ও মনোরম পরিবেশে সাজানো এ রেস্তোরাঁটিকে পড়ন্ত বিকেলে বা সন্ধ্যায় বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দেয়া কিংবা সময় কাটানোর জন্য উত্তম জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এখানকার খাবারের দামও হাতের নাগালে। ৩০০ টাকার মধ্যে পেটভরে চাইনিজ খাবার খাওয়া যায় এখানে। রেস্তোরাঁটি ভাল জনপ্রিয়তা পাওয়ায় ইতোমধ্যে রাজধানীর ওয়ারিতে এর একটি শাখাও খুলে ফেলেছেন মোহাম্মদ আশরাফুল। তাছাড়া একই জায়গায় গেল ডিসেম্বরে ‘সিচুয়ান গার্ডেন ক্যাফে’ নামের একটি ক্যাফে খুলেন টেস্ট ক্রিকেটের সর্বকনিষ্ঠ এই সেঞ্চুরিয়ান।

আশরাফুলের পর ২০১৫ সালের পহেলা এপ্রিল রেস্তোরাঁ ব্যবসায় ইনিংস শুরু করেন বাংলাদেশ দলের একসময়কার ওপেনিং ব্যাটসম্যান নাফিস ইকবাল খান। চট্টগ্রামের লালখান বাজারের ইস্পাহানি চত্বরে অবস্থান নাফিসের রেস্তোরাঁ ‘দম ফুঁক’ এর। নাফিস ইকবাল ও তাঁর পাঁচজন বন্ধু মিলে এ রেস্তোরাঁটি গড়ে তুলেন যেটি মূলত চট্টগ্রামের মেজবানি খাবারের জন্য বিখ্যাত। দেশীয় খাবারের পাশাপাশি উত্তর ভারতীয় খাবার পাওয়া যায় এখানে।

দেশের খেলোয়াড়দের নিকট রেস্তোরাঁটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। জাতীয় ক্রিকেট লিগ অথবা বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ খেলতে প্রায়ই চট্টগ্রামে যাওয়া ক্রিকেটারদের অধিকাংশই খাবারের কাজটা সারেন দম ফুঁকে। তাছাড়া তামিমের বড় ভাইয়ের রেস্তোরাঁ হওয়ায় মানুষজনের মধ্যেও এর প্রতি আলাদা আকর্ষণ কাজ করে। সে আকর্ষণ আরো বহুগুণে বেড়ে যায় যখন তামিমের সেঞ্চুরির দিনে ক্রেতাদের জন্য সুইট ডিশ ফ্রি করে দেন অগ্রজ নাফিস ইকবাল খান।

এদিকে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় পিছিয়ে নেই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানও। ২০১৫ সালের আগস্টে ‘সাকিব’স ডাইন’ নামে একটি রেস্তোরাঁ খুলেন তিনি যার নাম পরবর্তীতে পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সাকিব’স’। বনানীর ১১ নম্বর রোডে, ৪৮ নম্বর প্লটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ফ্লোরে সাকিব আল হাসানের এই রেস্টুরেন্টটি অবস্থিত। সাকিব’স এর ভেতরটা অত্যন্ত গোছানো, পরিপাটি ও অন্যান্য রেস্তোরাঁ থেকে ক্ষানিকটা ভিন্ন ধাচের।

রেস্তোরাঁটির সাজসজ্জা খেতে আসা মানুষজনকে খুব বেশি আকর্ষণ করে থাকে। এর দেয়াল মাঠের সবুজ ঘাসের মত টার্ফে তৈরি। দশটি টেস্ট খেলুড়ে দেশের পতাকা ও জার্সি সেখানে টানিয়ে রাখা হয়েছে। আরো রয়েছে বিশ্বের প্রখ্যাত সব ক্রিকেটারদের অটোগ্রাফসম্বলিত ব্যাট, বিখ্যাত ক্রিকেট ভেন্যুগুলোর নাম, সাকিবের ক্রিকেট মাঠের ছবি, ব্যাট, গ্লাভস, হেলমেট ও তাঁর কলকাতা নাইট রাইডার্সের জার্সি। খেলা দেখার সুব্যবস্থার জন্য এখানে রয়েছে দুটি প্রজেক্টর ও একটি টেলিভিশন।

এই হলো রেস্তোরাঁটির স্পোর্টস লাউঞ্জ। সাকিব’স এর দুই ফ্লোরের একটি স্পোর্টস লাউঞ্জ ও একটি ফাইন ডাইনিং। দু’টিতেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন খাবারের আয়োজন। স্পোর্টস লাউঞ্জে সাধারণত পাওয়া যায় বার্গার, রোল, স্যান্ডুইচ, সাব-স্যান্ডুইচ, সুপ, কাবাব, নান, পিৎজা, কফি ইত্যাদি খাবার আইটেম। আর ফাইন ডাইনিংয়ে রয়েছে ইতালিয়ান, থাই, কন্টিনেন্টাল ও ইন্ডিয়ান খাবারের ব্যবস্থা। শুক্রবার বাদে সপ্তাহের প্রতিদিন বুফে পাওয়া যায় বনানীতে অবস্থিত সাকিব আল হাসানের এই রেস্তোরাঁয়।

জাতীয় দলের বাইরে থাকা চার ক্রিকেটার শামসুর রহমান শুভ, ডলার মাহমুদ, মার্শাল আইয়ুব ও সোহরাওয়ার্দী শুভর রেস্তোরাঁ ব্যবসায় যোগ দেয়ার দেড় বছর হতে চললো। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে তাদের চারজনের রেস্তোরাঁ ‘কাবাব হাট রেস্টুরেন্ট’টি। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ১ নাম্বার গেটের একটু সামনেই এর অবস্থান। এরই মধ্যে রেস্তোরাঁটি মিরপুরের ভোজনরসিকদের মনে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ম্যাচের দিন লোকজনের আগমনে বেশ জমজমাট পরিবেশ বিরাজ করে কাবাব হাট রেস্টুরেন্টটিতে।

বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদও ইতোমধ্যে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় আত্মপ্রকাশ করে ফেলেছেন।

গত বছরের জানুয়ারিতে উদ্বোধন করা তাঁর রেস্তোরাঁটির নাম ‘তাসকিন’স টেরিটরি’। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রিং রোডে শিয়া মসজিদের সামনে অবস্থিত নূরানী টাওয়ার ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় তাসকিনের এই রেস্টুরেন্টের অবস্থান। খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি বিনোদনের জন্য বিলিয়ার্ড খেলার বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে তাসকিন’স টেরিটোরিতে।

বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় জড়ানো সবশেষ ক্রিকেটারের নাম ইমরুল কায়েস। জাতীয় দলের সতীর্থ সাকিব আল হাসানের সাথে যৌথ মালিকানায় গড়ে তোলা তাঁর রেস্তোরাঁ ও কনভেনশন হলের নাম ‘সাকিব’স ৭৫’। গত জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় রেস্তোরাঁটির। মিরপুর মাজার রোডে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে গ্রামীণফোন সেন্টারের ওপরে এর অবস্থান। এতে মূলত বাংলাদেশি, ভারতীয় ও থাই খাবার পাওয়া যায়। সকল শ্রেণি পেশার মানুষ যেন খেতে আসতে পারে সেজন্য খাবারের দাম নাগালের মধ্যেই রাখা হয়েছে রেস্তোরাঁটিতে। সেইসাথে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও রয়েছে সাকিব’স ৭৫ এ।

তাছাড়া ক্রিকেটারদের মত এবার রেস্তোরাঁ ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন দেশের সাবেক স্ট্রাইকার ওয়াহেদ আহমেদ। সিলেট শহরের শিবগঞ্জে ‘ওয়াহেদ’স ডাইনার’ নামের রেস্তোরাঁটি সম্প্রতি চালু করেছেন গত বছর হঠাৎ করে অবসরে যাওয়া এই ফুটবলার।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।