ঢালিউডে অভিষেক, বলিউডে বিকাশ

আশির দশকের মধ্যভাগ, বাংলাদেশি ছবিতে গান গাওয়ার জন্য জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন একজন অপরিচিত নবীন গায়ক। পরবর্তীতে জানা যায় তিনি ভারতীয়, তাই জাতীয় পুরস্কার বাতিল করা হয়।

এরপর কেটে গেছে বেশ সময়, নব্বইয়ের দশক সবে শুরু হলো, হিন্দি সিনেমাপ্রেমীরা এক নতুন কন্ঠের সাথে পরিচিত হলেন, ‘নাজার কে সামনে জিগার কে পাস’ কিংবা ‘ধীরে ধীরে সে’, ‘আব তেরে বিন’ গানের শ্রোতাদের মুগ্ধ করে বাজিমাৎ করেছেন, পরবর্তীতে পুরো নব্বই দশক তিনি সংগীত জগত কাঁপিয়েছেন, একের পর এক শ্রুতিমধুর গান উপহার দিয়ে দর্শকদের মনে স্থায়ী আসন গড়ে পেয়েছেন ‘মেলোডি কিং’ এর খেতাব। তিনি ভারতীয় সংগীত জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পীর একজন, তিনি বিখ্যাত গায়ক কুমার শানু।

আসল নাম কেদারনাথ ভট্টাচার্য, সত্তরের শেষভাগে পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে কলকাতায় বিভিন্ন অনুষ্টানে গান গাইতেন,সেইখানে তিনি নজরে পড়েছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আলম খানের, তার সুরারোপে ‘তিন কন্যা’ ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করেন। তাঁর কিছু সময় পর বিখ্যাত গায়ক ‘জগজিৎ সিং’ তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে বলিউডে কাজ করার প্রস্তাব দেন।

নিজের ক্যারিয়ারের ভিত করার লক্ষ্যে পাড়ি দিলেন মুম্বাইয়ে, আন্ধিয়া, যাদুকর ছবিতে প্লেব্যাক করেন,তবে আলোচিত হননি। এরপর এলো সেই সুবর্ণ সময়, নাদিম-শ্রাবণ জুটির সুরে প্লেব্যাক করলেন ১৯৯০ সালে ‘আশিকি’ ছবিতে। একই ছবিতে পাঁচটি গান,দারুন জনপ্রিয় হলো। এরপর শুরু হলো প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জয়যাত্রা।

আশিকির পর ১৯৯১ সাল ছিল নিজেকে আরো পরিক্ষীত করার বছর। ‘সাজান’ ছবিতে মেরি দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায়, ‘সড়ক’ ছবিতে তুমে আপনা বানানে কি কসম কিংবা ‘দিল হে কি মানতা নেহি’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হবার কারনে নিজেকে প্লেব্যাকে একজন প্রতিশ্রুতিশীল গায়ক হিসেবে প্রতিষ্টিত করেন,বেড়ে যায় ব্যস্ততা। ১৯৯৪ সালে বিখ্যাত সুরকার রাহুল দেব বর্মনের সুরে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’ ছবিতে ‘এক লাড়কি কো দেখা’, ‘রিমঝিম রিমঝিম’ ও ‘কুছ না কাহো’ গানে কন্ঠ দেন, গান গুলি আজো সমান জনপ্রিয়।

এছাড়া নব্বইয়ের দশকে ‘ইয়ে কালি কালি আঁখে’, ‘বাজিগর মে বাজিগর’, ‘ইয়ে বন্ধন কো’, ‘যাতি হু ম্যায়’ থেকে ‘তুঝে দেখা তু’, ‘লাড়কি বারি আনজানি হ্যায়’, ‘পরদেশী পরদেশী’, ‘মেরি মেহবুবা’, ‘নিন্দ চুড়ায়ী মেরি’, ‘আঁখো কি গুস্তাকিয়া’ সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান কন্ঠে ধারণ করেছেন।

সেই সময় তিনি একদিনে ২৮ টা গান প্লেব্যাক করে গিনেজ বুকে নাম লিখান। এর পরবর্তী সময়ে ‘ক্যাহি পেয়ার না হো যায়’, ‘দিল কা রিশতা’, ‘দিল হ্যায় তুমহারা’ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গানে কন্ঠ দেন। ধীরে ধীরে তিনি অনিয়মিত হয়ে পড়েন, সর্বশেষ তিনি বিশেষ অনুরোধে ‘দাম লাগাকে হেইসা’ ছবিতে কন্ঠ দেন।

হিন্দি গানের পাশাপাশি বাংলা গানেও প্রতিভা ছড়িয়েছেন। ভারতীয় বাংলা সিনেমায় গেয়েছেন নও তুমি একা নও, কত যে সাগর নদী, তোমার সুরে সুর বেঁধেছি, ভক্তিমূলক গান আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে, আমার সাধ না মিঠিল, প্রভাত সময় কালে কিংবা আধুনিক গান জীবনের নাম যদি রাখা হয় কূল সহ আরো অনেক জনপ্রিয় গানে কন্ঠ দিয়েছেন।

যে বাংলাদেশের গানে তাঁর হাতেখড়ি, এইখানে এসেও দারুন কিছু গান গেয়েছেন। এর মধ্যে আমার মনের আকাশে আজ,এই জীবন তোমাকে দিলাম, ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয় অন্যতম। প্লেব্যাকের বাইরে হিন্দি ও বাংলা গানের এলব্যাম বের করেছেন, বাংলাদেশেও অ্যালব্যাম বের হয়েছিল উনার।

সংগীত জীবনে কাজ করেছেন নাদিম-শ্রাবন, আনু মালিক, যতিন-ললিত, রাজেশ রোশান, এ আর রহমান সহ স্বনামধন্য সংগীতজ্ঞদের, সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, সাধনা সারগম থেকে গায়ক উদিত নারায়ন, সনু নিগম সহ আরো বহু কন্ঠশিল্পী। তবে অলকা ইয়াগনিকের সাথে গড়ে তুলেছিলেন জুটি, যা তাদের ক্যারিয়ারে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল, এই সঙ্গীত জুটি শ্রোতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

বর্ণিল ক্যারিয়ারে পদ্মশ্রী পেয়েছেন, ফিল্মফেয়ারের ইতিহাসে পরপর পাঁচবার পুরস্কার পেয়েছেন, যা আর কেউ পাননি। তবে অধরা থেকে গেছে জাতীয় পুরস্কার। এত সমধুর গান কন্ঠে ধারণ করেও জাতীয় পুরস্কার পেলেন না, এটা বেশ হতাশাজনক। এছাড়া দেশীয় বা আর্ন্তজাতিক বহু পুরস্কার পেয়েছেন। প্রতিভা অন্বেষণ মূলক টিভি শো গুলিতে বিচারক হয়েছেন, রাজনীতিতেও যূক্ত হয়েছেন, সমাজ সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করেছেন।

১৯৫৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তি গায়ক  রুপালি জগতের আলো থেকে দূরে আছেন। তবে, ভক্তদের অন্তরের জায়গাটা তিনি আজো ধরে রেখেছেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।