ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ভয় হয় খুব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবার জন্য চারটা ফার্স্ট ক্লাস থাকতেই হবে, এই নিয়ম চালু হয়েছে। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ এই নিয়ম’কে সাধুবাদ জানাচ্ছে! চারটা ফার্স্ট ক্লাস থাকা মানে আপনাকে এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স এবং মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস থাকতে হবে।

এখন ধরুন কোন এক ছাত্র এইচএসসি কিংবা এসএসসি’তে পারিবারিক কিংবা অন্য যে কোন কারনে সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে। কিন্তু নিজ যোগ্যতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে ভালো একটা সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করেছে এবং অনার্স এবং মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস’ও পেয়েছে। তাহলে সেই ছাত্র কেন শিক্ষক হবার জন্য আবেদন করতে পারবে না?

জগতের কোথাও কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার জন্য তাদের স্কুলের রেজাল্ট দেখা হয়? এই যে ছেলেপেলেরা এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষায় একটু খারাপ রেজাল্ট করলেই আত্মহত্যা করার চিন্তা ভাবনা করে কিংবা ভেবে বসে- জীবনে তো আর কিছুই করার নেই! এইসব ভাবনা তো এই ধরনের অদ্ভুত সিস্টেমের কারনেই আসে!

শুনেছি আজকাল ব্যাংক গুলোতেও নাকি চারটা ফার্স্ট ক্লাস চায়! ব্যাংক গুলো যদি চায়, সেখানে আমার কিছু বলার নেই। কারন ব্যাংক তো আর শিক্ষা কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করার জায়গা না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা দেশের প্রায় বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কেন এমন অদ্ভুত নিয়ম চালু করে রেখেছে, আমার ঠিক জানা নেই।

দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সাথে কথা হচ্ছিলো, তিনি বলছিলেন ‘আসলে অনার্স- মাস্টার্সের রেজাল্টে অনেক সময় মেনিপুলেশন হয়, তাই এসএসসি এবং এইএসএসসির রেজাল্টকেই আসলে একটা স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়।’

এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা!

আমি অবশ্য এই শিক্ষকের সঙ্গে মোটেই দ্বিমত করছি না। অনার্স কিংবা মাস্টার্সে যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ফার্স্ট- সেকেন্ড হয়; তারা কিভাবে সেই রেজাল্ট অর্জন করে, সেটা বোধকরি যারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়াশুনা করেছেন সবারই জানা আছে। বলছি না সবাই এভাবেই ফার্স্ট হয়। অনেকেই নিজ যোগ্যতাতেই হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সাথে একটু বেশি সম্পর্ক, বাজার করে দেয়া, রাজনীতি ইত্যাদি আরো কতো কি!

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা সত্যি’ই প্রচণ্ড রকমের খারাপ। আমারা স্কুল পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের মেসেজ দিচ্ছি- তোমরা যদি স্কুল কিংবা কলেজ পর্যায়ে খারাপ করো, তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ নেই, কিংবা অনেক জায়গায় চাকরির আর সুযোগ নেই! একটা ছেলে কিংবা মেয়ে অনার্স কিংবা মাস্টার্সে ডাবল ফার্স্ট হয়েও স্রেফ এসএসসি কিংবা এইচএসসির রেজাল্টের জন্য শিক্ষক হতে পারবে না; এরপরও আমরা এই নিয়মকে ভালো বলছি!

শুধু কি তাই। আমি নিজে বুয়েটে শিক্ষক হবার জন্য প্রভাষক পদে আবেদন করেছিলাম। বুয়েটে যেহেতু সমাজ বিজ্ঞানের আলাদা করে কোন সাবজেক্ট নেই, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন এক্সপার্ট এসছিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে’ই পড়াশোনা করেন’নি, এখানে আবেদন করেছেন কেন? আপনি যেহেতু সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, সেখানে আবেদন করুন।’

আমার জানা ছিলো না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া আর কেউ আবেদন করতে পারবে না। আমি উল্টো প্রশ্ন করেছিলাম, কেন, কোথাও কি লেখা ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া আবেদন করা যাবে না?

এই হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর অবস্থা। আপনি দেশের জেলা পর্যায়ের কোন ইউনিভার্সিটির থেকে পড়াশুনা করে পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর শিক্ষক হয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু নিজ দেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর কিংবা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে হলে আপনাকে অন্য সব যোগ্যতাও অর্জন করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আমাদের যেই পথ দেখায়, বাদ বাকী বিশ্ববিদ্যালয় গুলো সেই পথেই হাঁটে। দীর্ঘ দিন ধরে আমি এই নিয়ে লেখালেখি করছি। লোকজন হয়তো ভাবতে পারে আমার ব্যাক্তিগত ক্ষোভ থেকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লিখি। আমার পরিবারেরে বেশিরভাগ সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে কিংবা পড়ায়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেকটা আমাদের শেষ আশ্রয় স্থল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা তো দূরে থাক, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যেভাবে এগুচ্ছে, আমার ভয় হয় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে।

– ফেসবুক থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।