ঢাকা অ্যাটাক: যত গর্জে ততটাই বর্ষে

রাজধানীর একটি কেমিক্যাল কোম্পানির চিফ সায়েন্টিস্ট–সহ একে একে রহস্যজনকভাবে খুন হয়ে যায় প্রায় সব ক’জন কর্মী। সিসিটিভি রেকর্ড ঘেটে দেখা যায়, খুনিদের লিডার আসলে খুবই ধূর্ত এবং পেশাদার কিলার। তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় পুলিশের হাই রিস্ক ইউনিটের চৌকস কর্মকর্তা আবিদ অর্থাৎ আরেফিন শুভর হাতে। তিনি বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিটের চিফ ইনচার্জ। সহযোগী হিসেবে ডাকা হয় অকুতোভয় সোয়াট টিম লিডার আশফাককে, তার পুরো টিম-সহ। তদন্তে নেমে একের পর এক ঘটনার ঘনঘটায় পুলিশ আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

এরই মধ্যে অপরাধ জগতের সাথে জড়িত দু’ তিনজনকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। তাদের শরীরে কিছু অক্ষর এবং সংখ্যা মেশানো অদ্ভুত কোড দেখতে পাওয়া যায়। ঠিক ওই সংকটময় সময়ে লোটাস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল বাসে ভয়াবহ বোম ব্লাস্টের খবর আসে পুলিশের কাছে। এসব পরিকল্পিত হামলার সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ খুঁজে পায় সেই কেমিক্যাল কোম্পানির খুন ও ডাকাতির যোগসূত্র!

ব্যস, এবার নাটেরগুরুদের ধরবার পালা। শুরু হয় পুলিশের গোয়েন্দা, হাই রিস্ক ইউনিট এবং সোয়াটের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান। একের পর এক ধরা পড়তে থাকে শহরের ছোট বড় সব অপরাধীরা। কিন্তু পর্দার আড়ালে থাকা আসল ‘মাথা’ থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরেই। সারা দেশ আতঙ্কে দিশেহারা। চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশের উল্লেখযোগ্য সব স্থাপনা। মোটেও কোন কূল কিনারা করতে পারছে না পুলিশ। রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।

মাঝখানে আবার পুরনো জেদের বেশে পুলিশ কর্মকর্তা আবিদকে হেনস্তা করতে চায় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্রাইম রিপোর্টার চৈতি, অর্থাৎ মাহি। সুতরাং এ রহস্যের মোটিভ উদ্ধারে চুপিচুপি সেও ঢুকে পড়ে ইনভেস্টিগেটিং টিমে।

একদিকে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আসা বোমা সদৃশ বস্তুর খবর পুলিশের যৌথ বাহিনীকে কিছুটা নাজেহাল করে ছাড়ে। যাই হোক, গল্পে মূলত টুইস্ট শুরু হয় এক চিহ্নিত অপরাধীকে ধরার মধ্য দিয়ে। তার তথ্যমতে, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরেও তদন্ত করে পুলিশ। ধীরে ধীরে রহস্যে উদঘাটনে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সেই তথ্য মোতাবেক পুলিশ আবার নতুন করে পরিকল্পনা সাজায়। নাহ, আর বলব না! বাকিটা সিনেমাহলে গিয়েই জেনে নিবেন।

প্রথমেই বলব ছবির কাহিনীর কথা। ছবির কাহিনী খুবই চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয়। পুলিশের লাইফস্টাইল ও অপারেশন নিয়ে এরকম কপ থ্রিলার বাংলাদেশে এর আগে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বাংলা সিনেমায় পুলিশ বলতেই চোখে সামনে ভেসে ওঠে ভুড়িমোটা, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ কিংবা শেষের দিকে এসে ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’ বলে হাঁকানো জড়বুদ্ধির প্রাণি। কিন্তু পুলিশও যে এখন আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রযুক্তি সম্পন্ন একটি ‘এলিট ফোর্স’ তা এই সিনেমা দেখলে বুঝতে পারবেন। পুরো ছবিজুড়ে ছিল পুলিশের দুঃসাহসী অভিযান। এ সিনেমা নিঃসন্দেহ বাংলাদেশ পুলিশকে বিশ্বের দরবারে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে সহায়তা করবে।

দীপঙ্কর দীপন খুব যত্ন নিয়ে পুলিশের ভেতর-বাহির ও স্যাক্রিফাইসের গল্প তুলে ধরেছেন। ধৃত অপরাধীর তথ্যমতে কুয়ালালামপুরে অভিযান এবং চাঞ্চল্যকর সব তথ্য নিয়ে আবার নতুন করে পরিকল্পনা সাজানো—ছবির কাহিনীকে আরও পাকাপোক্ত করে, এবং নিশ্চিত করে যেন একদম শেষ মিনিট পর্যন্ত দর্শকেরা আগ্রহ ধরে রাখতে পারে।

ছবির গল্পটাই লিখেছেন পুলিশের লোক! ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা অফিসার সানি সানোয়ার। সুতরাং গল্পে মনগড়া কিংবা অতিরঞ্জিত কিছু চোখে পড়েনি। যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই রাখা হয়েছে। কাহিনীকার হিসেবে অবশ্যই তিনি অজস্র প্রশংসার দাবী রাখেন। চিত্রনাট্য লিখেছেন সানি সানোয়ার, অভিমন্যু মুখার্জি এবং দীপঙ্কর দীপন নিজেই। সিনেমার প্লট ঢাকা থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবান হয়ে সুদূর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর পর্যন্ত বিস্তৃত! চিত্রনাট্যের নিখুঁত গাঁথুনি আপনাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখবে।

দীপঙ্কর সেনগুপ্ত দীপন—যতদূর শোনা যায় তিনি খ্যাতনামা বলিউড ডিরেক্টর অনুরাগ ক্যশপের সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন। তাই নির্মাণে তাকে মোটেও নতুন মনে হয়নি। এরকম আরও কয়েকজন ডিরেক্টর এ দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আসলে বাংলা সিনেমা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে খুব বেশি একটা সময় লাগবে বলে মনে হয় না।

অভিনয়ের কথা বললে প্রথমেই বলতে হয় বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিটের চীফ ইনচার্জ আরিফিন শুভর কথা। তাকে নিয়ে একটা অভিযোগ শোনা যেত, তিনি নাকি অতি-মাত্রায় অভিনয় করেন। কিন্তু এই সিনেমার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তার অভিনয় আপনাকে পুরোপুরি মুগ্ধ করেই ছাড়বে। একজন অভিজ্ঞ বোমা বিশেষজ্ঞের মধ্যে যতটুকু দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস আর সাহসিকতার প্রয়োজন, ঠিক তার সবটাই দেখা যায় আরিফিন শুভর মধ্যে। তার অসাধারণ অভিনয়, বডি ল্যাংগুয়েজ ও ডায়লগ শুনে মনে হবে যে বাস্তবেই পুলিশের কোন এ.এস.পি অভিনয় করছেন! শেষেদিকে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দৃশ্যে শুভর এক্সপ্রেশন এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল যে, নিশ্চিত দর্শকদের হার্টবিটও কিছুক্ষণের জন্য বেড়ে গিয়েছিল। নিঃসন্দেহে এখন পর্যন্ত শুভর ক্যারিয়ারের সেরা কাজ এটি।

‘অগ্নি’তে মাহিয়া মাহি অ্যাকশন গার্ল হিসেবে বেশ প্রশংসা পেলেও তার অভিনয়ে মোটামুটি ন্যাকামোটা থেকেই যায়। এই ছবিতে তিনি ক্রাইম জার্নালিস্ট। ন্যাকামো করার কোনো সুযোগ নাই। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, অন্তত আগের ছবিগুলোর চেয়ে ন্যাকামো কমই ছিল। সাংবাদিক হিসেবে তাকে ভালই মানিয়েছে। শুভর সাথে তার কেমিস্ট্রিটাও খারাপ ছিল না।

দুর্বার অকুতোভয় সোয়াট টিমলিডার আশফাক অর্থাৎ এবিএম সুমনের কথা বিশেষভাবে বলতেই হবে। আরিফিন শুভর চেয়ে তিনিও কোনো অংশে কম ছিলেন না। সোয়াট টিম কমান্ডার হিসেবে জাস্ট অসাধারণ! তার শরীরী ভাষা, সাবলীল ইংলিশ বলা, কিংবা রাফ এন্ড টাফ লুকে আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। দেশের স্বার্থ রক্ষায় সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে দেখা যায় তাকে। আশফাকের স্ত্রী চরিত্রে কাজী নওশাবা অভিনয় অভিনয় ছিল একেবারেই দুর্দান্ত।

শতাব্দী ওয়াদুদকে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি জাত অভিনেতা এটা সবারই জানা। এই সিনেমায় যৌথ টাস্কফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি—জাস্ট অনবদ্য।

যার কথা না বললেই লেখাটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে, তিনি হচ্ছেন—হাসনাত করিম জিসান। ছোটবেলা থেকেই যিনি ছিলেন নির্দয় নিষ্প্রাণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ানক এক সাইকো কিলারে রূপ নেন। পুরো সিনেমার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল এই জিসান চরিত্রে অভিনয় করা খলনায়ক—তাসকিন রহমান। এটাই সম্ভবত তার প্রথম সিনেমা। ছবির ট্রেলার কিংবা টিজারে তাকে দেখা যায়নি, তার কারিশমা দেখতে হলে আপনাকে হলে যেতেই হবে। পর্দায় উপস্থিতি কম হলেও তার স্বল্প সময়ে অভিনয়, কথা বলার স্টাইল আর লুকিংয়ে যা দেখিয়েছেন, আপনি প্রশংসা করতে বাধ্য। শক্তিমান অভিনেতা হাসান ইমাম, আফজাল আহমেদ আর আলমগীরকে ছোট ছোট চরিত্রে দেখা গেলেও যার যার জায়গা থেকে অসাধারণ ছিলেন।

সিনেমার চিত্রনাট্য এতটাই স্ট্রং যে, এক মিনিটও আপনাকে সিট থেকে ওঠতে দিবে না। কাহিনী কোথা থেকে কোথায় মোড় নিচ্ছে কল্পনাও করতে পারবেন না। পুরো মুভিতে একের পর এক টুইস্ট আর সাসপেন্সে গা শিউরে ওঠার মত অবস্থা। পুরো পর্দাজুড়ে একটা টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। অযথা বিরক্তিকর কোন দৃশ্য নেই। অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও পুরো কাহিনীতে ঢিসুম-ঢিসুম মারপিট নেই। তবে, এন্ডিংটায় এত তাড়াহুড়া না করলেও পারত।

স্পেশাল ইফেক্ট নিয়ে আক্ষেপ রেখে লাভ নেই। বাংলা সিনেমার বাজেটে হলিউডি ইফেক্ট আশা করাটাও বোকামী। দোয়েল চত্বর আর বান্দরবনের একটা ব্লাস্ট সিন কিছুটা খারাপ থাকলেও,‌ বাকি ব্লাস্ট সিনগুলো নিঃসন্দেহে উৎরে গেছে।

সিনেমায় কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া পাবেন না নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সোয়াট, বোম্ব ডিস্পোজাল টিমে ব্যবহৃত যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জামগুলো খুবই প্রাণবন্ত মনে হবে। পরিচালক অতিমানবীয় কিছু দেখানোর চেষ্টা করেননি। সব কিছুর পরিমিতবোধ সিনেমাটিকে এক অন্যন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।

বাংলা সিনেমায় সাধারণত ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের দিকে অতটা নজর দেয়া হয় না। কিন্তু এই সিনেমার স্কোর আর দশটা বাংলা সিনেমার মত গতানুগতিক নয়। এক কথায় অসাধারণ! তবে  হাসপাতালের সামনে বোমা উদ্ধারে পুলিশ যখন ব্যতিব্যস্ত, তখন রোমান্টিক ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর না হলেও হত।

এবার সঙ্গীতের কথা বলি, সিনেমার গানগুলো মার্জিত ও শ্রুতিমধুর। ‘টিকাটুলির মোড়’ আইটেম গানে লামিয়া মিমো তার সাবলিল পারফর্মেন্সে দর্শকদের খানিক সময়ের জন্য হলেও ঘোরের ভিতরে বুঁদ করে রেখেছিলেন। আর অরিজিৎ সিংয়ের গাওয়া রোমান্টিক গান ‘টুপটাপ’ অসাধারণ! কালার গ্রেডিং চোখ জুড়ানো। অদিতের ‘পথ চেয়ে থাকি’ গানটি খুবই টাচি।

‘ঢাকা অ্যাটাক’ এর সিনেমাটোগ্রাফির কাজ সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। এত সুন্দর সিনেমাটোগ্রাফি অন্য কোন বাংলাদেশী সিনেমায় দেখেছি বলে মনে হয় না। বান্দরবানের পার্বত্যাঞ্চলে ক্যামেরার মুভমেন্ট ছিল অতুলনীয়।

সিনেমাটি ভাল—সত্যিই ভাল। তবে কিছু ছোট খাটো খুঁত সব ছবিতেই থাকে। এ ছবিতেও কিছু অসংলগ্নতা দেখা গেছে, যা চাইলে সহজেই এড়ানো যেত। আরিফিন চুল কিছু দৃশ্যে বড়, কিছু দৃশ্যে ছোট। সুমনের ক্ষেত্রে একই সমস্যা দেখা গেলেও মাথা হেলমেট থাকায় বোঝা যায়নি। মাহি তার বসকে একই দৃশ্যে কয়েকবার ভাইয়া ও স্যার বলতে শোনা যায়। গল্পের ক্ষেত্রে বললে, পরিচালক খুব দ্রুত এক প্লট থেকে আরেক প্লটে চলে যাচ্ছিলেন। একটু সময় দিলে হয়ত দর্শকদের মনে রাখতে সুবিধা হত। তাছাড়া মালয়েশিয়ার কাহিনীতে এক টানা লম্বা ইংরেজি কনভারসেশনে সাধারণ দর্শকের মনে বিরক্তির উদ্রেক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যাই হোক, কমার্শিয়াল ফিল্মে এই খুঁতগুলো আপনার চোখ এড়িয়ে যাবে সহজেই।

শেষ কথা, বাংলাদেশের প্রথম পুলিশ অ্যাকশন থ্রিলার—‘ঢাকা অ্যাটাক’ দেখে আপনি হতাশ হবেন না নিশ্চিন্ত থাকুন। আরিফিন শুভর আগের সিনেমা ‘কিস্তিমাত’ ‘মুসাফির’ কিংবা কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া অনিমেষ আইচের ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’র ট্রেলার নিয়ে চারদিকে মাতামাতি কম হয়নি। অথচ, দর্শক হলে গিয়ে কিছুটা হতাশই হয়েছিল। সিনেমাগুলো আদতে অতটা ভাল ছিল না। কিন্তু ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর বেলায় ‘যত গর্জে ততটাই বর্ষে’ কথাটিই প্রযোজ্য। ছবিটি আসলেই ভাল, হয়তো এতটা প্রত্যাশাও নেই আপনার!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।