ডেভিড শেফার্ড ও নেলসন নাম্বার ১১১

ভাইস অ্যাডমিরাল হোরাশিও নেলসন ব্যাপারটা জানলে বেশ দুঃখই পেতেন। কর্সিকাতে এক যুদ্ধের সময় একটা চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। আর স্পেনের সান্তাক্রুজ শহরের দখল নিতে গিয়ে মারাত্মক জখম হয়েছিল এক হাত। ১৮০৫ সালে ট্রাফালগারের যুদ্ধে গুলিতে মারা যাওয়া এই ভাইস অ্যাডমিরাল মৃত্যুর আগপর্যন্ত অবশ্য দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই পায়েই।

কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধল তার মৃত্যুর বেশ অনেক বছর পর। নেলসনের এক চোখ আর এক হাত- এই নিয়ে অনেকে সন্তুষ্ট থাকতে পারলো না। খানিকটা ‘মশলা’ যোগ করার অভিপ্রায়ে নেলসনের একটা পা-ও বেমালুম গায়েব করে দেয়া হলো, মুখের কথায়। সেই থেকে নেলসনের এক চোখ, এক হাত, এক পা। নেলসনের নিজ দেশে শুরু এক খেলায় রীতিমতো ‘নেলসন নাম্বার’ বলেই একটা ব্যাপার চালু হয়ে গেল। খেলাটার নাম ক্রিকেট, নেলসন নাম্বার ১১১।

এইটুকুতেও সমস্যা ছিল না হয়তো। কিন্তু এই ১১১ সংখ্যাটাকে অনেকে আবার বেশ ভয়ও পেতেন। এই সংখ্যাটা নাকি দূর্ভাগা! দলের বা নিজের স্কোর ১১১, অতএব একটু সতর্ক থাকো। দূর্ভাগ্য কাটাতে নিজের এক পা মাটি থেকে একটু তুলে রাখো কিছু মুহুর্তের জন্য। বা ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে দুই পা-ই মাটি থেকে তুলে নিলে ক্ষতি নেই। বিপদ কাটানো বলে কথা!

ক্রিকেটাররা এই সংস্কার (বা কুসংস্কার) আগে বেশ মান্যগণ্য করলেও এখন খুব একটা মানেন বলে মনে হয় না। তবে এই সংস্কার (বা কুসংস্কার) মানার ব্যাপারটাকে রীতিমতো নিয়ম বানিয়ে ফেলেছিলেন একজন। ২৮২টি ফার্স্টক্লাস ম্যাচ খেলেছেন, লিস্ট-এ ম্যাচ খেলেছেন ১৮৩টি। কিন্তু তার ক্রিকেটার পরিচয় এরপর স্রেফ হারিয়ে গেছে আম্পায়ার পরিচয়ের কাছে।

খেলোয়াড়ি জীবনে দল বা তিনি নিজে নেলসন নাম্বারে স্কোর থাকার সময় এক পা উঁচু করতে ভুলতেন না। ভোলেননি ক্রিকেটার থেকে আম্পায়ার হবার পরও। খেলায় আম্পায়ারিং করছেন, কোন দলের বা ব্যাটসম্যানের রান হয়তো ১১১। সাথে সাথেই এক পা তুলে ফেলতেন, বা একটা ছোট্ট লাফ দিতেন। শরীরের ওজন বেশ খানিকটা বেশিই ছিল, সামনের দিকে ছিল বেশ বাহারি একখানা ভুঁড়ি।

অতবড় শরীর আর ভুঁড়ি নিয়ে একজন বৃদ্ধ মানুষ লাফ দিচ্ছেন, সেটা শচীনের স্ট্রেইট ড্রাইভ বা ওয়ার্নের ফ্লিপারের চেয়ে কোন অংশে কম উপভোগ্য ছিল না। উপভোগ্য ছিল দাঁড়ানোর ভঙ্গিটাও। সামনের দিকে অনেকটা ঝুঁকে দাঁড়াতেন, চশমাটা নাকের ডগা ছুঁইছুঁই।

বেশ গর্ব করে বলতেন, ‘আম্পায়ার হিসেবে যত সিদ্ধান্ত দিয়েছি, সবগুলোতে আমি সৎ ছিলাম।’

সৎ ছিলেন বলেই নিজের ভুলের জন্য অনুতাপটাও ছিল অন্যদের চেয়ে বেশি। ২০০১ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টে সাকলাইন মুশতাকের করা তিনটি নো-বল খেয়াল করেননি। সেদিন খেলা শেষে এটা জানার পর নাকি মেরুদন্ড বেয়ে শীতল একটা স্রোত বয়ে গিয়েছিল। মানসিকভাবে প্রচণ্ড বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আম্পায়ারিংই ছেড়ে দেবেন।

আমাদের সৌভাগ্য, তিনি শেষপর্যন্ত সেদিন আম্পায়ারিং ছাড়েননি। আর তাই, এরপর আরও চার বছর তার ওই দাঁড়ানোর ভঙ্গি, নেলসন নাম্বারে তার ওই ছোট্ট লাফ বা তার অসাধারণ আম্পায়ারিং দেখার সুযোগ হয়েছিল আমাদের।

আমাদের দূর্ভাগ্য, সেই সৌভাগ্যটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০৫ সালের পর বিদায় জানিয়েছেন ক্রিকেটকে, ২০০৯ সালে বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকেই।

নিজেকে নিয়ে একবার বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, বেশিরভাগ লোক আমাকে ওই মোটা আম্পায়ার হিসেবেই মনে রাখবে, যে কিনা খেলার একটা নির্দিষ্ট সময়ে মাঠের মধ্যে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, আর মাঝে মাঝে লাফাতো।’

বেশিরভাগ লোক তাকে সেভাবেই মনে রেখেছে, সাথে মনে রেখেছে সর্বকালের অন্যতম সেরা এক আম্পায়ার হিসেবেও।

শুভ জন্মদিন ডেভিড শেফার্ড। ওপারে ভাইস অ্যাডমিরাল নেলসনের সাথে দেখা হলে একটা ছোট লাফ দিতে ভুলবেন না যেন!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।